আরেকটা কথা ভেবে চিন্তা কেটে গেল হাসুর। সে তো এখন প্রায় পুরুষ। হুজুরের পা টিপতে অসুবিধাই বা কী?
পালঙ্কের কোণে মান্নান মাওলানার পায়ের কাছে বসল হাসু। বসে দুইহাতে তার পায়ে প্রথম চাপটা দিল। মান্নান মাওলানা একটু হকচকিয়ে গেলেন। হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে এই অবস্থা ক্যা তর?
হাসু বলল, কী অবস্থা?
তর হাত দিহি লোহার লাহান। বেডাগো হাতও তো এত শক্ত অয় না। মাইয়ামানুষ অইয়া এমুন হাত ক্যা তর?
হাসু লাজুক গলায় বলল, মাইনষের বাইত্তে কাম কইরা খাই, আমগো লাহান মাইয়াগো হাত কি আর মাইয়াগো হাত থাকে! বেড়াগো ছাড়াইয়া যায়।
শুনে মান্নান মাওলানা বদ হাসি হাসলেন। কথাডা ঠিক কইলি না। কেমুন?
তর বয়েসে তর ফুবু আমার বাইত্তেঐ কাম করতো। অর হাত তর লাহান আছিলো না। খুবঐ মুলাম হাত পাও শইল আছিলো তর ফুবুর।
সত্যঐ?
তয় মিছানি? কামেলদার মানুষ অইয়া তর লগে আমি মিছাকথা কমু?
না হেইডা কইবেন ক্যা?
তয়?
হাসু কথা বলল না। মন দিয়া মান্নান মাওলানার টিপতে লাগল।
মান্নান মাওলানা বললেন, রহি তর কথা আমারে কইছে।
কী কইছে?
তুই এই বাইত্তে থাকতে চাস।
একটু থেমে বললেন, সত্যঐ তুই থাকতে চাস?
হ।
ক্যা?
যেই বাইত্তে থাকি হেই বাইত্তে থাকতে ভাল্লাগে না।
ক্যা হেই বাইত্তে অসুবিধা কী?
ফুবু আপনেরে কয় নাই?
কইছে। তাও তর মোক থিকা হুনি।
হাসু মাথা নিচা করে বলল, শরমের কথা। ওই হগল হুইন্না আপনে কী করবেন?
মান্নান মাওলানা আবার সেই বদ হাসিটা হাসলেন। হুনি। ওই হগল কথা হোনতে ভাল লাগে।
হাসু বুঝে গেল হুজুরে খুবঐ কায়দা কইরা আউগগাইতাছে। এই হগল প্যাচাইল পাড়তে পাড়তে অন্যকামের কথা কইবো।
ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল হাসু। হুজুর যত চেষ্টাই করুক, কায়দা করে তাঁকে সে ফিরাবে। সেদিন যেমন করে ফিরিয়েছিল আতাহারকে আজ তার বাপকেও তেমন। করেই ফিরাবে।
অন্যমানুষ হয়ে গেল হাসু। রঙ্গিনী, ঢঙ্গি ধরনের মেয়েমানুষ। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত মাদকতাময় এক হাসি হেসে বলল, হেই বাইত্তে পুরুষপোলার আকাল নাই। বেবাকতেঐ আপনের লাহান পাও টিপতে ডাকে।
একবার আবজানো দরজার দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। তারপর গলা নিচু করলেন। খালি পাও টিপতেঐ ডাকে?
না। আরও মতলব থাকে।
কী মতলব?
বোজেন না আপনে?
বুজি। তাও তর মোক থিকা হোনতে চাই।
ওই হগল কথা কইতে আমার শরম করে।
আবার একটু ঢঙ্গিভাব করল হাসু। জোরে জোরে পা টিপতে লাগল মান্নান মাওলানার।
মান্নান মাওলানার শরীরে তখন জুয়ান বয়সের উন্মাদনা তৈরি হচ্ছিল। গাঢ় গলায় তিনি বললেন, আমি বুজছি। তয় এই বাইত্তে থাকলেও তো অমুন অইতে পারে।
সব জেনে বুঝেও অবাক হওয়ার ভান করল হাসু। কন কী? এই বাইত্তে অমুন অইবো ক্যা? এই বাইত্তে পুরুষপোলা খালি আপনে আর আতাহার দাদায়।
আতাহারের নাম শুনে থতমত খেলেন মান্নান মাওলানা। আইচ্ছা, একহান কথা জিগামু তরে?
জিগান।
আতাহার নজর দিছেনি তর মিহি?
কেমুন নজর?
এইত্তো এই হগল আর কী? বোজচ নাই?
হ বুজছি। না হেয় অমুন না। একদিন খালি নাড়ার পালার সামনে….
কথাটা শেষ করল না হাসু।
মান্নান মাওলানা বললেন, নাড়ার পালার সামনে কী করছে?
কিছু না। খালি কথা কইছে আমার লগে।
কী কথা?
ওইত্তো ভাবিছাবের কথা, ফিরির কথা। হেগো দুইজনের লগেঐত্তো হের খাতির। দুইজন খাতিরের মানুষ থাকতে আমার লগে হেয় আর কী কথা কইবো? তার উপরে আমি অইলাম বেডাগো লাহান শক্তপোক্ত মাইয়া। আমারে হের পছন্দ করনেরঐ কথা না। পছন্দ হেয় আমারে করেও নাই।
হাসুর এসব কথা শুনে যেন বেশ একটা স্বস্তি হল মান্নান মাওলানার। বললেন, তয় ঠিক আছে। ক এইবার।
কী কমু?
ওই যে আমি কইলাম এই বাইত্তেও তো পুরুষপোলা আছে, আতাহাররে বাদ দিলে থাকি আমি। আমারে তর পুরুষপোলা মনে অয় না? তুই যেই বাইত্তে কাম করচ ওই বাড়ির বেড়াগো লাহান আমিও যুদি তরে জ্বালাই?
ধুৎ হেইডা আপনে ক্যান জ্বালাইবেন? আমি একটা মাইয়া অইলাম নি? আমার লগে আপনে অমুন করবেন ক্যা?
না, যত কইতাছস অত মন্দ মাইয়া তুই না। চলনসই আছস। খালি হাত দুইহান ইট্টু বেশি শক্ত।
শইলও শক্ত।
কচ কী?
হ। সত্য। আমি আপনের লগে মিছাকথা কই না।
তয় তো ইট্টু দেহন লাগে।
আবজানো দরজার দিকে তাকাল মান্নান মাওলানা। তারপর শুয়ে থেকেই হাত বাড়িয়ে হাসুর বুক ছোঁয়ার চেষ্টা করলেন। লগে লগে চট করে সরে গেল হাসু। এই দৃশ্য দেখে ফেললেন তহুরা বেগম। ঠিক তখনই আবজানো দরজা ঠেলে এই ঘরে এসে ঢুকেছেন তিনি।
তহুরা বেগমকে দেখেই বুকটা ঘঁাত করে উঠেছে হাসুর। মান্নান মাওলানার মুখটাও চুন হয়েছে। তয় পলকেই ব্যাপারটা সামাল দিয়া ফেললেন তিনি। চটপটা গলায় বললেন, ওই ছেমড়ি, তুই অহন যা। আর পাও টিপন লাগবো না। তর ব্যাপারে আতাহারের মা’র লগে আমি কথা কমু নে। হেয় যুদি রাজি থাকে তয় তরে রাকতে আমার কোনও আপিত্তি নাই।
আইচ্ছা।
ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হাসু। যেন যত দ্রুত সম্ভব তহুরা বেগমের চোখের সামনে থেকে পালাতে পারলেই সে বাঁচে।
তহুরা বেগম গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে পুরা ব্যাপারটা অন্যদিকে ঘুরাবার জন্য মান্নান মাওলানা অমায়িক গলায় বললেন, এমতে খাড়ই রইলা ক্যা? বহো। এতক্ষুন। আছিলা কই? তোমার লেইগাঐ জাগনা রইছি। দুইফইরা ঘুমড়া দিতে পারি নাই। ওই ছেমড়িরে ডাইক্কা পাও টিপাইতাছিলাম।
