এই বিলে এক সময় আমন আউশের ব্যাপক চাষ হতো। বর্ষার পানিতে প্রান্তরব্যাপী মাথা তুলে থাকত ধানডগা। ঋতুর সঙ্গে বদলাত বিলের চেহারা, রঙ। এই সময়, শেষ হেমন্তের বিকালে বিল ঝকমক ঝকমক করত ছড়ার ভারে নত হওয়া সোনালি ধানে। ধানকাটা শুরু হতো। ভোরবেলা, সূর্য ওঠার আগে কিষাণরা কাচি (কাস্তে) হাতে নামত বিলে। দিনভর ধানকাটা চলত। বিকালে দেখা যেত কাটা ধানের বোঝা বাঁধছে কিষাণরা। এখন ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরার সময়। বাড়ির উঠানে নিয়ে ভুর (টাল) দিয়ে রাখবে ধান। বিয়ানরাতে উঠে পাড়াতে (মলন দেয়া। বিক্রমপুর অঞ্চলে সাধারণত গরু দিয়ে ধান মলন দেওয়া হয় না। কিষাণরা পা দিয়ে ডলে ডলে ডগা থেকে ধান ছাড়ায়। এই ব্যাপারটাকে বলে ‘ধান পাড়ানো’) শুরু করবে। গতদিনের কাটাধান সূর্য ওঠার আগে আগে পাড়িয়ে শেষ করে কাচি হাতে আবার যাবে বিলে। আবার ধান কাটবে। দেশ গ্রাম ম ম করবে ধানের গন্ধে। চারদিকে ভা র একটা উৎসব আনন্দের ভাব।
বেশ কয়েক বছর হল এই চেহারাটা আর নাই বিলের। সেই দিনও আর নাই দেশ গ্রামের। এখন বিক্রমপুরে শুধু ইরির চাষ। কোথাও কোথাও বোরো হয়, তবে এই দিকটায় না। শ্রীনগর থেকে ষোলঘর হয়ে আলমপুর যাওয়ার পথে পড়ে আড়িয়ল বিল। বোরোর চাষটা আড়িয়ল বিলে ভাল হয়। এই বিলে শুধু ইরি। শীতকালে বোনা শুরু হয়। বর্ষার আগে আগে, বৃষ্টি বাদলার আগে আগে ধান উঠে যায়। তারপর সারাবর্ষা ফাঁকা বিল। অঞ্চলটা নিচু বলে বর্ষায় এই বিলে পানি হয় অগাধ। দশ বারো হাতি (হাত) লজ্ঞিও ঠাই (থই) পায় না ভরাবর্ষায়। এখন ধান নাই বিলে, পুরা বিল বর্ষার পানিতে টইটুম্বর, মজনুদের বাড়ি থেকে বিলের দিকে তাকালে মনে হয় এটা বোনও বিল না, এটা আরেক পদ্মা, এপার ওপার দেখা যায় না তার। অথবা এ এক অচেনা অকূল দরিয়া। ‘অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে’।
আজ বিকালে নূরজাহানের সামনা সামনি দাঁড়িয়ে কোন ফাঁকে যেন মজনুর চোখ চলে গেছে বিলের দিকে। ফাঁকা বিলে এখন হা হা করছে উত্তরের হাওয়া আর ডুবতে বসা সূর্যের বিপন্ন রোদ। দূরে, বিলেরবাড়ির শিমুল গাছ বরাবর উড়ে যাচ্ছে সারধরা তিনটা পাখি। সেই পাখির দিকে তাকিয়ে গভীর এক আনন্দে মন ভরে গেল মজনুর। এতক্ষণ নূরজাহানের সঙ্গে কী কথা বলছিল ভুলে গেল। নূরজাহান যে চোরাচোখে তাকে দেখছে একবারও সে তা দেখতে পেল না। আনন্দভরা গলায় বলল, ঐ যে তিনডা পইখ উইড়া যাইতাছে, দেক নূরজাহান, কী সোন্দর!
খুবই তাচ্ছিল্যের চোখে বিলেরবাড়ির দিকে তাকাল নূরজাহান। যেন দয়া করে পাখি তিনটা দেখল কিন্তু একদমই পাত্তা দিল না। বলল, এই হগল জিনিস আপনে দেহেন। থাকেন টাউনে, এই হগল টাউনে পাইবেন কই, দেকবেন কই থিকা!
মজনু মুগ্ধ গলায় বলল, টাউন থিকা গেরাম অনেক সোন্দর রে!
তাইলে টাউনে থাকেন ক্যা?
থাকি ঠেইক্কা। গেরামে থাকলে খামু কী! আর আমার খালায় চায় না আমি গেরামে থাকি।
আমিও চাই না।
কথাটা বলেই লজ্জা পেয়ে গেল নূরজাহান। লগে লগে অন্যদিকে ঘুরাল কথা। পুরুষপোলারা গেরামে পইড়া থাকব কী করতে? গেরামে কোনও ভাল কাম আছেনি! মাইয়া না অইলে কবে আমি টাউনে যাইতাম গা! এহেনে থাকতামনি? সড়কটা অউক, বাস চালু অউক, পলাইয়া অইলেও একদিন টাউনে যামু গা।
তারপরই ছটফট করে উঠল নূরজাহান। যাইগা, হাজ অইয়াইলো।
মজনু খুবই অবাক হল। কীয়ের হাজ অইয়াইলো! আমগো বাইত্তে বলে যাবি? ল।
না, আইজ আর যামু না।
ক্যা?
আপনেরে দেহনের লেইগা যাইতে চাইছিলাম। দেহা তো আপনের লগে অইলো। ও মজনু দাদা, কয়দিন বাইত্তে থাকবেন আপনে?
আছি আর দুই তিনদিন।
তাইলে যাওনের আগে আর একদিন আমুনে।
চোখ সরু করে নূরজাহানের দিকে তাকাল মজনু। অহন কি তুই সত্যঐ বাইত্তে যাইতাছস?
নূরজাহান হাসল। কী মনে অয় আপনের?
আমার মনে হয় না। মনে অয় অন্য কোনহানে যাবি তুই।
হ সড়কে যামু। দেইক্কাহি কতাহানি আউজ্ঞাইলো সড়ক। আপনে যাইতাছেন কই?
খাইগো বাড়ির মাডে যামু। মাডে বলে আইজ ফুডবল নামবো। পিডাইয়াহি (পিটিয়ে আসি)।
কাম নাই ঐ মিহি যাওনের। আমার লগে লন, সড়ক দেইক্কাহি।
ল তাইলে।
ওরা দুইজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে ফাঁকে আনমনা হয়ে গেল নূরজাহান। ভুলেই গেল লগে মজনু আছে।
ব্যাপারটা খেয়াল করল মজনু। করে পিছন থেকে নূরজাহানের বেণী ধরে টান দিল। কীরে নূরজাহান, কী অইলো?
চমকে মজনুর দিকে তাকাল নূরজাহান। ডর করতাছে আমার।
কীয়ের ডর?
মন্নান মাওলানারে বকছি।
কুনসুম?
আইজঐ। আপনেগো বাইত্তে আহনের আগে।
ক্যা?
আমার বাপেরে কয় দউবরা। আমার বাপের নাম কি দউবরা কন? ক্যা, দবির কইতে পারে না? কইছি আরেকদিন দউবরা কইলে দাঁড়ি টাইনা ছিড়া হালামু। আপনে একটা পচা মলবি। আপনে একটা রাজাকার।
মজনু চিন্তিত গলায় বলল, ভাল করচ নাই। মন্নান মাওলানা বহুত খারাপ মানুষ। এইডা লইয়া দেকবি তর বাপের কাছে বিচার দিব। মাইর খাওয়াইবো তরে।
নূরজাহান ঝাঁঝাল গলায় বলল, খাওয়াইলে খাওয়াইবো। আমার বাপের নাম পচা কইরা কইবো, আমি তারে ছাইড়া দিমুনি? আপনের বাপের নাম কেঐ অমুন কইরা কইলে আপনে তারে ছাইড়া দিবেন?
বাপের কথায় মন খারাপ হয়ে গেল মজনুর। বাপ বলতে কোনও মানুষের কথা মনেই পড়ে না তার। কেমন দেখতে মানুষটা, সে যখন জন্মায় তখন কেমন ছিল দেখতে, এই এতকাল পর আজ কেমন হয়েছে এসব কিছুই সে জানে না। বেঁচে যে আছে তা জানে। নামও যে একটা আছে, তা জানে। আদিলদ্দি।
