আপনে আমারে কন তো, আতাহারের লগে যা অইছে হেইডা কি আমার কোনও অন্যায় অইছেনি?
তহুরা বেগম কথা বললেন না। চুপ করে রইলেন।
পারু বলল, আমার কাঁচা বয়স, স্বামী অক্ষম, স্বামীর ভাইর লগে খাতির না কইরা আমি যুদি অন্য বেগ লগে করতাম, ভাইগ্যা ভুইগ্যা যাইতাম আপনেগো বাড়ি থিকা তাইলে কি আপনেগো মানইজ্জত থাকতো? থাকতো না। আল্লার কাছে শুকুর করেন যে আমি হেই কাম করি নাই। যা করছি দেওরের লগে করছি। তার পোলাপান পেডে ধরছি তয় মাইনষেরে বুজাইছি আসল স্বামীর পোলাপানঐ অইতাছে আমার। আপনের পোলারেও মাইনষের কাছে ছোড করি নাই, আপনেগও করি নাই। এই বাড়ির মানইজ্জত আমি রক্ষা করছি।
তহুরা বেগম কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, হ মা হেইডা তুমি করছো। মিছাকথা কমু না, সত্যঐ তুমি আমগো মানইজ্জত রাখছে।
তয় আপনেরা আমার কথা কোনওদিনও চিন্তা করেন নাই।
তোমার কথা আর কী চিন্তা করনের আছে, কও?
আছে, চিন্তা করেন নাই দেইখাঐ বোজেন নাই। আউজকা আমার কাছে আইছেন নিজেগো স্বার্থে। আমি কইলে আতাহারে বিয়া করবো, আতাহারে বিয়া করলে আজাহার ফিরত আইবো দেশে। হেয়ও বিয়া করবো। বাইত্তে দুইহান নতুন বউ আইলে আপনের দায়িত্ব শেষ অয়। সবঐ আপনে ভাবলেন, খালি আমার কথাডাঐ ভাবলেন না। এতডু এতড়ু তিনডা পোলাপান আমার, নকল বাপ মরছে, আসল বাপ থাকতেও হেই বাপরে বাপ ডাকতে পারবো না, তার উপরে হেই বাপও আরেকজনরে বিয়া কইরা পর অইয়া যাইতাছে। নতুন একজন মানুষ এই সংসারে আইয়াঐ কোনও না কোনওভাবে এই কেলেঙ্কারির কথা। হোনবো। হের কাছ থিকা হোনবো আরও দশজনে। কোনও অন্যায় না কইরাও বদলামের ভাগী অমু আমি। মাইনষে আমারে খারাপ মাইয়াছেইলা মনে করবো। কিন্তু আপনের বড়পোলায় যুদি আতাহারের লাহান অইতো তাইলে তো তারে ছাইড়া আতাহারের কাছে আমি যাইতাম না! আতাহারের পোলাপান পেডে লওনের দরকার পড়তো না আমার।
হ কথা ঠিক। বেবাক কথা ঠিক। তোমারে আমি কোনও দোষ দেই না।
তয় আমার দুঃখডা অইলো এত কিছুর পরও, অহনও আমার কথাডা আপনে চিন্তা করেন না। আব্বার কথা বাদ দিলাম, আপনেও তো চিন্তা করতে পারতেন আমার কথা।
তহুরা বেগম বললেন, আর কেমতে চিন্তা করুম মা? কিছু তো বোজতাছি না।
ভাবেন নাই দেইখা বোজেন নাই। ভাবলে বোজতেন। দুনিয়াতে এমুন ঘটনা অনেক আছে, বড়ভাই মইরা গেছে, পোলাপানসহ তার বিধবা বউরে বিয়া করছে ছোড় ভাইয়ে। নতুন বউ সংসারে না আইন্না আগের বউরেঐ বাইত্তে রাকছে। আমার বেলায় এইডা তো আরও জায়েজ অইতো, যার পোলাপান আমি পালতাছি, জামাই মরনের পর তার লগেঐ আমার বিয়া অইতাছে। আপনেরা এইভাবে ভাবেন নাই ক্যান? আতাহারের লগে কি আমার বিয়া অইতে পারে না? হেয় তো আমারে পছন্দ করে!
গভীর দুঃখ বেদনাতেও চোখে সহজে পানি আসে না পারুর। আজ এল। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আঁচলে চোখ মুছল সে। তারপর কড়াইয়ের দিকে তাকাল। ডিমগুলি প্রায় ভাজা। ভাজা হইয়ে আসছে। এখন চুলা থেকে নামাতে হবে। নামায় আলু পিয়াজ আর নুন তেল মশলা কষিয়ে, তাতে সামান্য পানি সরা দিয়া ঢেকে দিতে হবে। আলু সিদ্ধ হয়ে আসার পর ডিমগুলি দিতে হবে। সব মিলিয়ে খুবই স্বাদের তরকারি। ডিমগুলি তেলে ভাজার আগে সামান্য কেচে তাতে আবার হলুদ লবণ মাখানো হয়েছে। খাওয়ার সময় নুনের অভাবটাও মনে হবে না।
তয় পারুর কথা শুনে তহুরা বেগম তখন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে আছেন। কথা বলতে যেন পুরাপুরি ভুলে গেছেন। চিন্তিত চোখে তাকিয়ে আছেন পারুর দিকে।
পারু চোখ মুছতে মুছতে বলল, আপনেও মাইয়ামানুষ আম্মা। একহান কথা আপনে বোজবেন, মাইয়া মাইনষের বুক ফাইট্টা গেলেও মুখ ফোডে না। মইরা গেলেও মনের কথা মনেঐ চাইপ্পা রাখে মাইয়ারা। আমিও রাকতাম যুদি আমার জীবনডা এমুন না অইতো, যুদি পোলাপান তিনহান আমার না থাকতো। বেবাক কিছু চিন্তাভাবনা কইরা, লজ্জাশরমের মাথা খাইয়া মনের কথা আপনেরে আমি আইজ কইয়া দিলাম। এইডা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় আছিলো না।
তহুরা বেগম তবু কোনও কথা বললেন না। আগের মতোই চিন্তিত চোখে পারুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে পান আছে, পান চাবাতে যেন ভুলে গেছেন।
.
বড়ঘরের সামনে দিয়া হাসুকে যেতে দেখেই ডাকলেন মান্নান মাওলানা, ওই ছেমড়ি, এইমিহি আয়।
দুপুরের ভাত খেয়ে গোলাঘরের দিকে যাচ্ছিল হাসু। মান্নান মাওলানার ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল। বড়ঘরের ভিতর উঁকি দিল। ঘরের দরজা আধাআধি আবজানো। সেই ফাঁক দিয়া দেখতে পেল খালি গায়ের লুঙ্গি পরা মান্নান মাওলানা পেট ভাসিয়ে শুয়ে আছেন। ঘরে আর কেউ নাই।
এই অবস্থায় মান্নান মাওলানা ডেকেছেন, ঘরে ঢোকা ঠিক হবে কি না ভাবছিল হাসু। মান্নান মাওলানা খেকুরে গলায় বললেন, কী অইলো? কথা কানে যায় না? ঘরে আয়।
গলায় এমন একখান ভাব ছিল তাঁর, হাসু দিশাহারা ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে গেল। কীর লেইগা ডাক পারেন?
বয়।
হাসু অবাক হল। কই বমু?
পালঙ্কেঐ বয়। আমার পা-র সামনে।
ক্যা?
পাও টিপ্পা দে।
খালিঘরে মান্নান মাওলানা তাকে পা টিপতে ডেকেছে, তার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে সব কিছুই জানে হাসু, এই অবস্থায় পা টিপতে বসা ঠিক হবে কি না ভাবছিল। তয় কিছু করারও নাই। ঝিয়ের আত্মীয় হয়ে এই বাড়িতে সে দিনের পর দিন পড়ে আছে, বাড়িরটা খাচ্ছে রহিমার লগে সম্পর্কের কারণেই, এই নিয়া মান্নান মাওলানা কখনও কিছু বলেন নাই, সেই মানুষ পা টিপতে ডেকেছেন, তাঁর মুখের ওপর না হাসু কেমন করে করবে। তার ওপর সবকিছু জানার পর রহিমা চেষ্টা করছে হাসুকে এই বাড়িতে রাখার। এই অবস্থায় হুজুর যা চাইছেন তা না করলে তিনি রেগে যাবেন। আর মালিককে রাগিয়ে এই বাড়িতে হাসু কেমন করে থাকবে!
