না এখনও পুরাপুরি ফোটে নাই। আর একটু ফুটবে।
ভাতের হাঁড়ির ওপর সরা চাপিয়ে কোটা গোলালু ধুতে লাগল পারু।
তহুরা বেগম বললেন, এর লেইগা আইজ আমি তোমার কাছে আইছি মা।
তহুরা বেগমের দিকে তাকাল না পারু। গম্ভীর গলায় বলল, আমি কী করুম?
তুমি আতাহাররে ইট্টু বুজাইবা।
কী বুজামু?
আমরা ঘটক লাগামু। ও যেন বিয়া করতে রাজি অয়।
চোখ তুলে তহুরা বেগমের দিকে তাকাল পারু। আপনের কি মনে হয় আমি কইলেঐ হেয় বিয়া করতে রাজি অইব?
হ হইবো।
তার অর্থ কী? হের বিয়া আমি আটকাইয়া রাখছি?
তহুরা বেগম নরম গলায় বললেন, আমি তোমার লগে কাইজ্জাকিত্তন, তক্কাতক্কি এই হগল করতে আহি নাই মা। তোমারে অনুরুদ করতে আইছি। তুমিও জানো আমি কী কইতে চাই, আমিও জানি তুমি কী কইতে চাও।
হ আপনে কী কইতে চান হেইডা আমি জানি, তয় আমি কী কইতে চাই হেইডা মনে অয় আপনে জানেন না।
তোমার মনে অয় জানি না?
হ।
তয় তুমি আইজ আমারে কও, আমি হুনি।
কইলে বহুত কথা কওন লাগে।
কও। বেবাক কথাই আইজ কও। মনের মইদ্যে আর কিছু চাইপ্পা রাইখো না। কবে মইরা যামু! তোমার কথা আর হোননঐ হইবো না।
ভাত পুরাপুরি ফুটে গেছে। লুছনি দিয়া নিয়ম মতন হাঁড়িটা ধরে চুলার একপাশে রাখা খাদায় ভাত ঠিকনা দিল পারু। তারপর তহুরা বেগমের দিকে তাকাল, আচমকা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। আপনের বড়পোলার কথা আপনে জানতেন না?
কথাটা বুঝতে পারলেন না তহুরা বেগম। থতমত খেয়ে পারুর মুখের দিকে তাকালেন। কোন কথা?
হের যে বাপ অওনের ক্ষমতা আছিলো না, হেই কথা?
তহুরা বেগম একটু চুপ করে রইলেন। মুখের পান গালের একপাশে নিয়া উদাস গলায় বললেন, আগে পুরাপুরি জানতাম না। ইট্টু ইট্টু সন্দহ আমার আছিলো। তোমার বিয়ার আগে অর বাপরে দুই-একবার কইছি, পোলাডার শইল্যের দশা ভাল দেহা যায় না। বয়স। অইয়া গেছে তাও বিয়া করতে চায় না। বিয়ার কথা হোনলে চুপ কইরা থাকে। খালি ঘুরায়। কয় অহন না, পরে বিয়া করুম। যেই বয়েসে পোলারা বিয়ার লেইগা পাগল অয় হেই বয়েস পার অইয়া যাওনের পরও মোতাহারে বিয়া করতে চায় না ক্যা, এইডা লইয়া তোমার হউরের লগে কথা অইছে আমার। অন্য মানুষজন দিয়া কায়দা কোয়দা কইরা তোমার হউরে জানতেও চেষ্টা করছে অর শইল্যে কোনও সমস্যা আছেনি! সমস্যা আছে। দেইক্কাঐ বিয়া করতে চায় না, নাকি! বিয়ার পর বউর কাছে নিজের শইল্যের লেইগা শরম পাইবো দেইক্কাঐ মনে অয় বিয়া করতে চায় না। তহন কইলাম মোতাহার অস্বীকার করছে। কইছে, না, আমার কোনও সমস্যা নাই। তয় আমি তো মা, আমি কইলাম ইট্টু ইট্টু বুজছিলাম। সন্দহ আমার একখান আছিলো। কারণ ছোটকালে পেশাবে অসুবিদা অইতো মোতাহারের। এর লেইগা এক্কেরে ছোড থাকতেঐ অরে মোসলমানি করাই দিতে অইছিলো। মোতাহার বড় অওনের পর অর বাপে হেই কথা ভুইল্যা গেলেও আমি ভুলি নাই। বিয়া করতে চাইতো না দেইক্কা তোমার হউররে আমি কইছিলাম, পোলার শইল লইয়া আমার সন্দহ হয়। আপনে অরে একবার ঢাকা লইয়া যান। বড় ডাক্তার দিয়া পরীক্ষা করান। দেহেন সমস্যা কী? বিয়া করতে চায় না ক্যা? হেয় আমারে কইলো মদিনার জামাইরে দিয়া বলে ইশারায় ইঙ্গিতে কথাডা মোতাহাররে হেয় জিগাইছিলো, মোতাহার কইছে সমস্যা নাই। তারবাদেও চিন্তা আমার যায় নাই। যায় নাই দেইক্কাঐ তোমারে আনলাম মোতাহারের বউ কইরা।
লোহার মাঝারি ধরনের একটা কড়াইতে সামান্য তেল দিয়া খোসা ছাড়ানো সিদ্দ ডিম ভাজতে দিয়েছে পারু। আগুনের তাপে তেল আর ডিমে ছ্যার ছ্যার করে শব্দ হচ্ছে। একবার সেদিকে তাকিয়ে পারু বলল, আমারে বউ কইরা আনলেন এইডা হিসাব কইরা যে পোলার যুদি কোনও সমস্যা থাকেও, আততিয়র মাইয়া হেইডা মোখ বুইজ্জা মাইন্না লইবো। কেঐরে কিছু কইবো না।
হ। মিছাকথা কমু না মা। এইডাঐ চিন্তা করছিলাম। আর বিয়ার কয়দিন বাদে তোমার চেহারা দেইক্কাঐ বেবাক আমি বুইজ্জা গেছিলাম। তোমার হউরের লগেও এই হগল। প্যাচাইল পারছি, হেয় আমারে থামাইয়া রাখছে। কইছে এই হগল অহন আর চিন্তা কইরা লাব নাই। যা অওনের অইয়া গেছে। আমি কইছি, না এই হগলের চিকিচ্ছা আছে। মোতাহাররে আপনে ডাক্তার কবিরাজ দেহানের ব্যবস্থা করেন। মাইয়ার জামাইগো কন তারা মোতাহাররে বুজাউক। হেয় আমার কোনও কথা হোনেঐ নাই।
হোননের মানুষ হেয় না। হেয় খালি নিজেরহান বোজে। অন্যের দুঃখকষ্ট হেয় বোজেনি! নিজের জিদের লেইগা বাড়ির এতদিনের বান্দা গোমস্তা মাকুন্দার লগে যেই কামড়া করলো।
বাদ দেও, ওই হগল প্যাচাইল পাইড়া আর লাব কী!
হ অন্যের প্যাচাইল পাইড়া কী করুম আমি। আমি আইজ আমার প্যাচাইলঐ পাড়ি। আম্মা, সব জাইন্না হুইন্নাও কইলাম আমি মোক বুইজ্জঐ আছিলাম। আমি আপনেগো কেরে কিছু কই নাই। কোনও অশান্তি লাগাই নাই সংসারে। তয় আমিও তো মানুষ। আমার দিকটা আপনেরা ভাবেন নাই ক্যা? আমার জাগায় যুদি আপনের কোনও মাইয়া অইতো, তার জামাই যুদি আপনের পোলার লাহান অইতো তহন কী করতেন আপনে? মাইয়ারে ছাড়াইয়া আইন্না অন্য জাগায় বিয়া দিতেন না?
হ দিতাম।
তয় আমারে লইয়া আপনে ভাবেন নাই ক্যা? ভাবনের আগেঐত্তো আতাহারের লগে তোমার খাতির অইয়া গেল। তোমার পোলাপান হইয়া গেল।
