শাশুড়িকে বসতে দিয়ে আবার বঁটি ধরেছে পারু। তহুরা বেগম বললেন, শিরিন ইসকুলে গেছে?
পারু বলল, হ। লেখাপড়ায় বেদম উৎসাহ মাইয়াডার। খাইগোবাড়ির পেরাইমারি ইসকুলে পড়তে চাইলো না। এই বচ্ছর কেলাস ফোরে উটছে। আগে আমারে কইয়া রাকছিলো কাজির পাগলা হাই ইসকুলে যেন ভরতি কইরা দেই।
দিছো না?
হ। অহন কাজির পাগলা ইসকুলে পড়ে।
আর নসু?
ও খাইগোবাড়ির ইসকুলে পড়ে। টু-তে। দুইজনেঐ আউজকা ইসকুলে গেছে।
আর নূরি, নূরি কো?
মনে অয় গণি কাকাগো ওই মিহি গেছে। মতিমাস্টারের পোলামাইয়ার লগে বহুত খাতির। হারাদিন অগো লগে খেলে।
হেইডা খেলুক। তয় পোলাপানের মিহি খ্যাল রাইখো। বাড়ির চাইর মিহি এত পুকঐর। খেলতে খেলতে ঘাট ঘঘাটে যেন না যায়, পাইনতে পুইনতে যেন না পইড়া যায়! একবার যুদি একজন যায় তয় কইলাম কাইন্দাও কূল পাইবা না! এই যে বুকহান দেহ এই বুকের ভিতরে এহেকজন পোলাপানের লেইগা এহেকখান ঘর, একজন গেলে একহান ঘর খালি অইয়া যায়। হেই ঘর আর কোনওদিন ভরে না। আমার মোতাহার গেছে আমি বুজি পোলাপান যাওনের দুঃখড়া কেমুন!
পারু কথা বলল না। গোলালু কোটা শেষ করে পিঁয়াজ কুটতে শুরু করেছে সে।
মোতাহারের কথা মনে করে একটু ভারাক্রান্ত হয়েছেন তহুরা বেগম। কিছুটা সময় নিয়া সেই ভাব সামাল দিলেন তিনি। আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী রান্দ, বউ?
পারু বলল, মুরগির ডিম সিদ্দ দিছি ভাতের লগে।
ডিমের তরকারি রানবা?
হ। গোলালু আর পিয়াইজ দিয়া ডিম ভুনা করুম। কাইল রাইত্রে নসু কইছে আইজ দুইফইরা ভাত ডিম দিয়া খাইবো। এর লেইগা বেবাকতের লেইগাঐ ডিম রানতাছি। চাইরখান ডিম সিদ্দ দিছি ভাতের লগে। সিদ্দ অওনের পর খোসা ছাড়াইয়া কড়াইয়ের তেলে ইট্টু ভাজা ভাজা করুম। তারপর আলু পিয়াইজ তেল মেশলা দিয়া বাগার দিমু।
ভালঐ অইবো। খাইতে সাদ লাগবো। তয় পোলাপানের মিহি খ্যাল রাইখো। বাপ মরা পোলাপান, অহন তুমিঐ অগো বাপ তুমিঐ মা। পোলাপানে যা খাইতে চায় খাওয়াইয়ো। নাইলে পোলাপানের আত্মা ছোড অইয়া যাইবো।
শাড়ির আঁচলে গিঁট দিয়ে বাঁধা একখিলি পান বের করলেন তহুরা বেগম। জরুরি প্রয়োজনে এভাবে পানের একখান খিলি আঁচলে বেঁধে রাখেন তিনি। বেশিক্ষণ পান না খেয়ে থাকতে পারেন না বলে এই ব্যবস্থা।
পানের খিলিটা মুখে দিয়া একটু যেন চিন্তিত হলেন তিনি। কিছু যেন ভাবছেন, কিছু যেন বলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আড়চোখে শাশুড়ির মুখটা একবার দেখল পারু তারপর নারকেলের আইচায় তৈরি হাতা দিয়া বলক পাড়া ভাতের তলা থেকে একখান ডিম তুলল। তুলে বোঝার চেষ্টা করল। পুরাপুরি সিদ্দ হয়েছে কি না!
হয়েছে। একেবারেই ঠিকমতন সেটা হয়েছে। এখনই ডিমগুলি তুলে ফেলা উচিত।
তারপর বাকি ডিমগুলি তুলল পারু। একটা মাটির সরা চিত করে তাতে রাখল। বঁটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, আমি আম্মা পোলাপানডিরে বোজতে দেই না যে অগো বাপ নাই, অগো বাপ মইরা গেছে। যহন যা চায় পোলাপানডিরে আমি দেই, ভালভালাই খাওয়াই। খাজুইরা মিডাই দিয়া দুধভাত, চিনিচাম্পা কেলা, মাস-দেড়মাসে একদিন ইট্টু পোলাও রান্দি, মোরগ জবো করি। আপনের পোলায় মইরা যাওনের পর থিকা আব্বায় মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়, জমিনডি বর্গা দেওয়া আছে, গোরু তিনডা আপনেগো গোরুর লগেঐ থাকে, এক দেসসের দুধও পাই রোজ, আব্বায় বাজারে গেলে আমগোও মাচ তরকারি দেয়, মাঝে মাঝে পিডাও বানাইয়া দেই পোলাপানরে, বেবাক মিলা আমি অগ খারাপ রাখি নাই আম্মা।
তহুরা বেগম পান চিবাতে চিবাতে মাথা নাড়লেন। হ হেইডা আমি জানি। তুমি যে বহুত দায়িত্বশীল মাইয়া হেইডা আমি জানি। আমার মোতাহারের লেইগাও অনেক করছো তুমি। আল্লায় অর হায়াত রাখে নাই দেইখা মরছে। অর মরনের লগে তোমার কোনও সমন্দ নাই।
তয় আপনে আম্মা আমারে দোয়া করবেন, আমি যেন আমার পোলাপানডিরে মানুষ করতে পারি।
দোয়া করি না মা, অনেক দোয়া করি। আল্লায় দিলে তুমি পারবা।
পারু তখন ডিমের খোসা ছাড়াতে লেগেছে। পান চিবাতে চিবাতে পারুর ডিমের খোসা ছাড়ানোটা কিছুক্ষণ দেখলেন তহুরা বেগম তারপর বললেন, আইজ তোমার কাছে আমি
একহান আরজি লইয়া আইছি মা।
পারু বুঝল কী বলবেন তিনি। বুঝেও না বোঝার ভান করল। ডিমের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, কীয়ের আরজি আম্মা?
পায়ের কাছে চিড়িক করে পানের পিক ফেললেন তহুরা বেগম। তারপর বললেন, কইতাছি। তার আগে অন্য একহান কথা কইয়া লই। কয়দিন আগে মোতাহাররে আমি স্বপ্নে দেকলাম। দেহি মোতাহার যেন আমারে কইতাছে আমি তোমারে ছাড়া আর থাকতে পারি না মা। তুমি আমার কাছে আইয়া পড়। তারপর থিকা আমার মনডা বহুত খারাপ মা। খালি মরণের কথা মনে অয়। মনে অয় যে-কোনওদিন মইরা যামু আমি। তয় কাম তো দুইহান শেষ অয় নাই। মাইয়াডির বিয়া দিছি, বড় পোলাডার বিয়া করাইছি। বাকি আছে খালি দুইডা পোলা। এই দুইডার বিয়া করাইয়া যাইতে পারলে দায়িত্ব শেষ অইতো। তুমি তো বেবাকঐ জানো। আজাহার খালি চিঠি লেখে, আতাহার দাদারে বিয়া করাও না ক্যা? হেরে বিয়া না করাইলে আমি দেশে আহুম না। হেরে বিয়া না করাইলে আমি বিয়া করুম না।
আতাহারের কথা ওঠার পরই গম্ভীর হয়ে গেছে পারু। মুখটা শক্ত হয়ে উঠেছে। সেই মুখেই চারটা ডিমেরই খোসা ছাড়াল সে। হাতায় করে একহাতা ফেনভাত তুলে সেই ভাত থেকে কায়দা করে কয়েকটা ভাত আঙুলের আগায় নিয়া টিপে টিপে দেখতে লাগল ভাত ফুটছে কি না!
