বুজছি। আমি য্যান কেরে না কই। নূরজাহানির লেইগাও এমুন কথাঐ কইছিলি তুই। তয় তুই নিচ্চিন্তে কইতে পারচ। আমি কেঐরে কমু না।
কথা দিলেন পিসি?
হ।
তয় কই।
সড়কের কাজে মাটিচাপা পড়া মানুষটার কথা যতটুকু যা সে শুনেছে সবই খুলে বলল মরনিকে। নামাজ পড়তে বসে কীভাবে জ্যান্ত কবর হল মানুষটির, কীভাবে সব সামাল দিল হেকমত, কীভাবে বেঁচে গেল কন্ট্রাক্টর সাহেব, সব। শুনে মরনি মাটির মতন স্থির হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে নিখিলের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও রকমে শুধু বলল, কচ কী?
হ পিসি। সত্যকথা।
মাইট্রালডার নাম কী? কোন গেরামের মানুষ?
বুড়া বেডা। কামারগাঁওয়ের ওইমিহি বাড়ি। নাম বলে আদিলদ্দি।
শুনে দিশহারা ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল মরনি। কী, কী কইলি? আদিলদ্দি? কামারগাঁওয়ের আদিলদ্দি?
মরনির অবস্থা দেখে নিখিল অবাক হল। সেও উঠে দাঁড়াল। হ। কামারগাঁওয়ের আদিলদ্দি।
একটু থেমে তীক্ষ্ণচোখে মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মাইট্রালডার নাম হুইন্না আপনে এমুন চইমকা উটলেন ক্যা পিসি? চিনেন নি?
ততক্ষণে প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়েছে মরনি। একটু স্থির হয়েছে। ভিতরে ভিতরে গুছিয়ে ফেলেছে নিজেকে। না না কোনও ভাবেই নিখিলকে বলা ঠিক হবে না, মানুষটা শুধু তার চিনাই না, তার বোনজামাই, তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার বাপ। এই বাড়িতেই মানুষটা থাকত! তার মাটিয়াল হওয়ার পিছনে আছে এক দুঃখময় করুণ কাহিনি। নিখিলের কানে এসব কথা গেলে হয়তো বা কথাটা চলে যাবে আতাহারের কানে, হয়তো বা চলে যাবে অন্য কারও কানে। তাতে গ্রামের মানুষের কাছে ছোট হয়ে যাবে মজনু। মজনুর বাপ হয়েছিল মাটিয়াল, কেন হয়েছিল সে কথা বুঝতে চাইবে না কেউ, মজনুকে বলবে মাইট্টালের পোলা, আগে পরে টিটকারি দিবো। গ্রামে মুখ দেখানোই দায় হবে ছেলের। না না মজনুর এই ক্ষতি মরনি কিছুতেই হতে দেবে না। যদিও মানুষটার জন্য বুক ফেটে যেতে চাইছে, চোখ ফেটে যেতে চাইছে কান্নায়, তবু নিজেকে সামলে নিখিলের দিকে তাকাল সে। শুকনা ফ্যাকাশে মুখে হাসার চেষ্টা করল। চইমকা উটলাম কামারগাঁওয়ের কথা হুইন্না। ওই গেরামে আমগো আততিয় স্বজন আছে। আর কিছু না।
নিখিল সন্দেহের গলায় বলল, ও আইচ্ছা।
আদিলদ্দি নামেও আমগো এক আত্মীয় আছে। হেরা বিরাট গিরস্ত। হেগো বাড়ির গোমস্তারাও মাইট্টালের কাম করবো না।
নিখিলের মন থেকে সন্দেহটা গেল না। ভুরু কুঁচকে মরনির দিকে তাকিয়ে রইল।
মরনি আবার যেন একই কথা বলল, কামারগাও আর আদিলদ্দি দুইহান নাম একলগে হুনছি তো, এর লেইগাঐ চইমকা উটছি। আর কিছু না। বোজছচ না?
নিখিল সন্দেহের গলায় বলল, বুজছি।
তারপর উঠানের দিকে পা বাড়াল। তয় অহন যাই পিসি। পরে আবার একদিন আমুনে।
আইচ্ছা বাজান, আহিচ।
নিখিল চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল মরনি। তারপর ঘর থেকে উঠানে নামল। দক্ষিণের ভিটির দোচালা ঘরটায় গিয়া ঢুকল।
এই ঘরে থাকত মানুষটা।
ঘরের পুবপাশের বেড়া ঘেঁষে কিছু খড়নাড়া ফেলা। সেই খড়নাড়ার উপর ছেঁড়া একখানা হোগলা পাতা আছে। একপাশে ময়লা নোংরা কাঁথার লগে পাচিয়ে রাখা তেল চিটচিটা একটা বালিশ। রাতের আঁধারে নিঃশব্দে এসে এই বিছানায় বসত মানুষটি, নামাজ পড়ে ঘুমাত, উঠে আবার নামাজ পড়ে বেরিয়ে যেত। এই ঘরে, এই বিছানায় আর কখনও ফিরা হবে না তার। মনের ভিতর থেকেই হয়তো বা মরণ তাকে ডাক দিয়েছিল। এজন্যই সেদিন। ওভাবে এসে টাকাগুলি দিয়া গেছিল মজনুর জন্য, মরনির হাত ধরে মাফ চেয়েছিল, শিশুর মতন কেঁদেছিল।
এঘরে ঢোকার পর এসব কথা মনে পড়ল মরনির। বুক তোলপাড় করতে লাগল। খড়নাড়ার উপর পাতা হোগলার বিছানাটার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বিছানাটায় বসল সে। নিজের অজান্তেই হোগলায় আর কথায় প্যাচিয়ে রাখা বালিশটায় হাত বুলাতে লাগল। মনে মনে বলল, আপনের জীবনডা এমুন অইলো ক্যান দুলাভাই! মরনডা এমুন অইলো। ক্যান! এমুন নমজি মানুষ আছিলেন তাও কাফোন পাইলেন না, জানাজা পাইলেন না? আপনের অইলো জেনতা কবর! আহা রে, আহা।
নিজের অজান্তে চোখের পানিতে গাল ভাসতে লাগল মরনির।
.
কী রান্দ, বউ?
দুপুরের ভাত বসিয়ে গোলালু কুটতে বসেছে পারু। একপায়ে চেপে ধরা বঁটি, দুইহাতে বঁটির ধারে ঘষে ঘষে গোলালুর ছাল বাকল ছাড়াচ্ছে। একপাশে অর্ধেক পরিমাণ পানি ভরতি মালশা। ছাল বাকল পরিষ্কার করা গোলালু মালশায় রাখছিল সে। বঁটির পাশে মাটিতে পড়ে আছে আরও কয়েকটা গোলালু, কয়েকটা পিঁয়াজ।
কাজের সময় পারু একটু বেশি মনোযোগী থাকে। এজন্য শাশুড়ির গলা শুনে চমকাল। মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসল। ও আম্মায়!
উঠে গিয়ে ঘর থেকে জলচৌকি এনে দিল তহুরা বেগমকে বসতে। আপনের শইল কেমুন আম্মা?
তহুরা বেগম নরম ভঙ্গিতে জলচৌকিতে বসলেন, ক্লান্তির শ্বাস ফেললেন। সেই শ্বাসে পারু টের পেল, না তার শরীর খুব সুবিধার না।
তহুরা বেগম বললেনও তাই। না গো মা, শইলডা ভাল না। ইট্টহানি হাঁটলেঐ বুকটা ধড়ফড় ধড়ফড় করে। এই যে দেহো এড় জাগা হাইট্টা আইছি, বড়ঘর থিকা তোমার উডান, রানঘরের সামনে, হেতেঐ বুকহান ধড়ফড়াইতাছে।
কথা বলতে বলতে ডানহাত দিয়ে বুকের মাঝখানটা চেপে ধরলেন তহুরা বেগম। আজকাল প্রায়ই এভাবে বুক চেপে ধরে রাখেন। একটু মোটার দিকে শরীর। দুধের মতন ফরসা গায়ের রং। দেখে বুঝা যায় একজীবনে অতি সুন্দরী ছিলেন। চোখ মুখের গড়নে বনেদিপনা আছে। সব সময় সুন্দর পাড়ের সাদা শাড়ি পরেন। মান্নান মাওলানা এত পরহেজগার বান্দা হওয়ার পরও তাঁকে দেখলেই যেমন ধুরন্দর বদমাশ মনে হয়, ঠিক তার উলটাটা মনে হয় তহুরা বেগমকে দেখলে। অত্যন্ত নরম সভ্য বিনয়ী হৃদয়বতী সন্তানবৎসল এক মা আর খুবই ধর্মপ্রাণ, আল্লাহ ভক্ত। কথাও বলেন মায়াবী স্বরে। এই ধরনের মানুষ দেখলেই ভক্তি করতে ইচ্ছা করে।
