এসব শুনে ভাল রকমের ফাঁপরে পড়ে গেল হেকমত। মুখটা আগেই ভয়ার্ত হয়েছিল, এখন শুকিয়ে চুন হল। গলাটাও শুকিয়েছে। ইচ্ছা হল আলী আমজাদের সামনে থেকে পানি ভরতি গেলাসটা নিয়ে ঢক ঢক করে পুরা পানিটা খেয়ে ফেলে।
আলী আমজাদ তখন খাওয়া রেখে ক্রুর চোখে তাকিয়ে আছে হেকমতের দিকে। কী রে কচ না কী অইছে?
হেকমত অসহায় গলায় বলল, কেমতে যে কই!
এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিখিল সাধারণত কথা বলে না। তয় এখন বলল। মনে অয়। গোপন কথা। কনটেকদার সাব, আপনে বাইরে গিয়া হুইন্নাহেন।
আলী আমজাদ নিখিলের দিকে তাকাল। না আমি এহেনেঐ হুনুম। এহেনেঐ অর কওন লাগব। অর লাহান মাইনষের লগে আমার এমুন কোনও কথা থাকতে পারে না যেইডা তোমগো সামনে ও কইতে পারব না।
আতাহার তখন নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের মতো করে খেয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে হাসছে। ভাল ফাঁপরেই কনটেকদার আর তার মাইট্টাল সর্দার আইজ পড়ছে। যত গোপন কথাঐ অউক আতাহারগো সামনে অহন হেইডা কওনঐ লাগবো হেকমতের।
হেকমতও ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছে কথাটা সে বলেই ফেলবে। তার কী! কনটেকদার সাবে যহন অন্যের সামনে হোনতে চাইতাছে, জবরদস্তি করতাছে তার লগে, না কইয়া। উপায় কী হেকমতের!
হেকমত বলল, কাইল রাইত্রে যেইমিহি মাড়ি পড়ছে ওইমিহির ভাঙ্গনে মাড়ির তল থিকা একজন মাইনষের তিন-চাইরহান লউং (আঙুল) বাইর অইয়া রইছে।
শুনে আলী আমজাদের গায়ে যেন আগুনের ছ্যাকা লাগল। কী? কী কইলি?
হ।
আতাহার-নিখিলও আলী আমজাদের মতন চমকেছে। খাওয়া ভুলে দুইজনেই তাকিয়ে আছে হেকমতের দিকে। খানিক আগের কথাবার্তা সবই ভুলে গেছে।
যেরকম দিশাহারা ভঙ্গিতে ছুটে আসছিল হেকমত বসে থেকেও আলী আমজাদের ভঙ্গি এখন সেইরকম দিশাহারা। কোনওরকমে বলল, কার লউং বাইর অইয়া রইছে মাডির তল থিকা? কেডা চাপা পইড়া মরছে? কেমতে মরছে? কেমতে অইলো কামডা?
এদিক ওদিক তাকিয়ে হেকমত খুবই সাবধানি গলায় বলল, ওই যে বুড়া একহান মাইট্রাল আছিল আদিলদ্দি, হেই বেডা।
তুই বুজলি কেমতে? লউং দেইক্কা?
আরে না। লউং দেইক্কা মানুষ চিনন যায়নি?
তয়?
রাইত্রে কাম কইরা গেছে যেই মাইট্টালরা তাগো খোঁজখবর লইয়া বুজছি বেবাকতে ফিরত গেছে খালি আদিলদ্দি ফিরে নাই। ওই বেডারে ফিরতে দেহে নাই কেঐ। কামের ফাঁকে, এশার নমজের সময় থিকা বলে অরে আর দেহে নাই কেঐ। আমার মনে অয় বেড়া তো নমজি মানুষ আছিলো, নমজের সমায় ভাঙ্গনের মিহি গিয়া নমজ পড়তে বইছে আর মাইট্টালরা অর উপরেঐ মাডি হালাইছে।
আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই আতাহার বলল, হেইডা কেমতে অয়? একজন মাইনষের উপরে মাডি পড়বো আর হেয় চিক্কইর দিবো না?
হেকমত বলল, দেওনের মনে অয় সমায় পায় নাই। একলগে শয়ে শয়ে মাইনষে মাডি হালায়। চোক্কের নিমিষে এহেকটা জাগা ভইরা যায়।
আলী আমজাদ ভয়ার্ত গলায় বলল, যেমতেঐ মরুক, আমার কামে মাড়ি চাপা পইড়া মরছে একজন মানুষ, এইডা লইয়া তো বহুত বড় বিপাকে পইড়া যামু। কেস অইয়া যাইব আমার নামে। কাম বন্দ অইয়া যাইবো। আমি সাবকনটাকে কাম করি। বেবাক যাইবোগা আমার। হায় হায়, সব্বনাশ অইয়া গেছে।
আবার হেকমতের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। মাইট্টালরা বেবাকতে দেকছে লউং? বেবাকতে জাইন্না গেছে ঘটনা?
না, কেঐ দেহে নাই? কেঐ জানে নাই?
শুনে বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল আলী আমজাদ। খানিক আগে ভয়ে আতঙ্কে যে অন্ধকারে একেবারেই ডুবে গিয়েছিল সেই অন্ধকারে যেন মৃদু একটা আলোর রেখা দেখতে পেল। একটা আলোকিত পথ যেন বেরিয়ে এল গভীর অন্ধকার থেকে। খুবই উৎসাহের গলায় বলল, সত্যঐ কেঐ দেহে নাই? কেঐ জানে নাই?
হ। রাইত্রেঐত্তো কাম অনেক আউয়াইয়া গেছে। আদিলদ্দির লউং যেহেনে বাইর অইয়া রইছে তার থিকা বহুতদূর আউগ্নাইয়া গিয়া অহন মাডি হালাইতাছে মাইট্টালরা। ওইমিহি আর আহে নাই কেঐ।
আতাহার বলল, খালি তুমি একলা দেখছো?
হ।
আলী আমজাদ বলল, তুই দেকলি কেমতে? কামে আইয়া পয়লাঐত্তো আগের দিনের কামডা ঠিকঠাক লাহান অইছে কি না দেহি আমি। কোনওহানে মাডি কম পড়ল কি না, দুই-চাইর গোড়া মাডি হালান লাগব কি না, দেহি। কাইল রাইত্রের কাম ঠিক লাহান অইছে কি না হেইডা দেকতে গিয়া দেহি মাডির তল থিকা মাইনষের তিন-চাইরহান লউং বাইর অইয়া রইছে।
তারবাদে কী করলি?
পয়লা তো এক্কেরে ডরাইয়া গেছি। পেরায় চিক্কইর দিয়া হালাইছিলাম। তয় চিক্কইরডা দেই নাই। আর ভাগ্যিডা ভাল যে লগে কেঐ আছিলো না, আর কেঐ দেহে নাই। তয় কারবার কী অইছে লগে লগেঐ আমি বুইজ্জা গেছি। বুইজ্জা নিজের হাতে কহেক খাবলা। মাড়ি দিয়া লউংডি ঢাইক্কা দিছি। তারবাদে মাইট্টালগো কাছ থিকা এমুনভাবে কাইল রাইত্রে কারা কারা কাম করছে বেবাক খবর লইছি, কেঐ চিন্তাঐ করতে পারবো না খবরডা আমি ক্যান লইতাছি। ওই খবর লইয়াঐ বোজলাম, মরছে আদিলদ্দি।
হেকমতের কথা শুনে হারিয়ে যাওয়া সাহস সবটুকুই ফিরত পেল আলী আমজাদ। মুগ্ধ গলায় বলল, তুই তো বাপের বেড়ারে হেকমইত্তা! বাঘের বাচ্চা তুই! নিজেঐত্তো বেবাক কিছু ম্যানেজ কইরা হালাইছস। আমারে তো বড় বাঁচান বাঁচায় দিছস তুই।
আতাহার রহস্যের গলায় বলল, হ। ঠিকঐ কইছেন। অহন আর কেঐ চিন্তাও করতে পারবো না যে রাস্তার মাডির তলে একজন মানুষ চাপা পইড়া মরছে। লাচটা অহনও ওহেনেঐ আছে। কেঐ যুদি, আদিলদ্দি না কী জানি নাম কইলো হেকমত, ওই বেডারে বিচড়াইতে আহে, কইলেঐ অইবো, কাম হালাইয়া রাইত্রের আন্দারে বেডা জানি কই গেছে গা।
