গভীর আবেগের গলায় আজিজ বলল, সত্য, সত্যঐ তুমি আল্লার কাছে এই হগল কইয়া কানছো?
হ। তুমি আইজ ফিরত আইছো দেইখা আমার খালি মনে অইছে আল্লায় আমার কথা হোনছে। আমারে দয়া করছে আল্লায়।
ঠিক কথাঐ কইছো। আল্লায় না চাইলে কিছু অয় না। পয়সার রফিউদ্দিন মলবি সাহেব আমারে কইছে, বাজান নমজ পইড়া খালি আল্লার কাছে কান্দেন। মাপকরনেআলা আল্লাহপাক। নিজের বান্দাগো নানান রকমের পরীক্ষার মইদ্যে হালান আল্লাপাকে। হালাইয়া দেহেন পরীক্ষায় তারা পাশ করে কি না। আল্লার কাছে কাইন্দা মাপ চায় কি না। তুমি যে তোমার অন্নাইডা বুইজ্জা আল্লার কাছে কানছো এইডাঐ আছিলো তোমার পরীক্ষা। আমারে সরাইয়া দিয়া এই পরীক্ষা আল্লায় তোমার নিছে। তোমার কান্দন দেইখা তোমার মিহি মুখ তুইলা চাইছে। তয় যেই কথা তোমারে আমি কইতে চাইলাম, যেই জীবন এতদিন আমরা কাডাইছি ওই জীবন আর কামু না।
তয় কেমুন জীবন কাড়ামু?
ভাল মানুষের জীবন, পাক পবিত্র আর আল্লার ন্যাকবান্দার জীবন। কাইল থিকা তুমিও নমজ পড়বা। আল্লার কাছে তোবা কইরা নতুন জীবন শুরু করবা। কোনওদিন একহান মিছাকথা কইবা না, ছল চাতুরি চালাকি করবা না। পোলাপানডিরে আমি নমজ কালাম কোরান শরিফ পড়া হিগাইতে চাই। স্কুল মাদরাসায় ভরতি করাইতে চাই। মানুষের লাহান মানুষ বানাইতে চাই বেবাকতেরে। আল্লায় আমারে জাগাসম্পত্তি টেকাপয়সা যা দিছে এই হগল দিয়া, গাওয়াল কইরা সব ঠিকঠাক লাহান চালাইতে পারুম আমি। তুমি খালি আমার
লগে থাকবা, আমার কথা হোনবা।
বানেছা ধীর গলায় বলল, তুমি যেমতে যেমতে কইলা ওমতে ওমতেঐ সব অইবো। তোমার বেক কথাঐ আমি হুনুম। আইজ থিকা তুমি যা কইবা ওইডাঐ সই। যেমতে আমারে চালাইবা ওমতেঐ আমি চলুম, ওমতেই পোলাপানগো চালামু। জীবনে কোনও অন্নাই আর কোনওদিন করুম না।
একটু চুপ করে থেকে আজিজ বলল, বাইত থিকা যেদিন গেলাম তার পরদিন আরেকহান কাম আমি করছি।
বানেছা বলল, কী কাম?
লৌহজংয়ের সরকারি হাসপাতালে গিয়া একহান অরাপেশন, না না অপরেশন, অপরেশন করাইছি।
বানেছা চমকে উঠল। কী করাইছো? অপরেশন? কীয়ের অপরেশন?
পোলাপান না অওনের।
কও কী?
হ। ওইডারে কয় ভেসেকটেমি। পথটা আমারে ধরণীচাচি দেহাইয়া গেছিলো। খুব ছোড অপরেশন। একদিন হাসপাতালে আছিলাম আমি। তার পরদিনঐ ভার কান্দে লইয়া রাস্তায় নামছি, মুসাফির অইয়া গেছি। আমার কোনও অসুবিদায়ই অয় নাই।
বানেছা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এইডার লেইগাও আমিঐ দুষি। আমি যুদি তোমার কথা হোনতাম তয় এই কষ্ট তোমার করন লাগতো না। কতপদের অষইদ বাইর অইছে আইজ কাইল, হেই হগল অষইদ খাইলেঐ পারতাম।
স্ত্রীকে বুঝ দেওয়ার ভঙ্গিতে তার কাঁধে হাত রাখল আজিজ। থাউক এই হগল লইয়া আর চিন্তা কইরো না। যা অওনের অইয়া গেছে। অহন চিন্তা করো ভবিষ্যৎ লইয়া। কেমতে আল্লার রাস্তায় থাইকা নিজেরা চলুম, পোলাপানডিরে চালামু এইডাঐ অইলো অহন আসল কাম। আইজ থিকা নতুন কইরা আমরা বেবাক কিছু শুরু করলাম, খালি এইডা মনে রাখবা।
স্বামীর বুকে হাত রেখে বানেছা বলল, আইচ্ছা। তুমি যা যা কইলা দেখবা তার বেবাকঐ আমি করুম। ইট্টুও এদিক ওদিক অইবো না।
কও ইনশাল্লাহ।
ইনশাল্লাহ।
ততক্ষণে রাত অনেকটাই গম্ভীর হয়েছে। আকাশের চাঁদ পশ্চিমে বেশ খানিকটা হেলেছে বলে আজিজ গাওয়ালের উঠান থেকে ম্লান জ্যোৎস্নাটাও যেন খানিকটা নেমে গেছে ভাঙনের দিকে।
২.৮ আতাহারের ঘরে নাস্তা
সকালবেলা আতাহারের ঘরে নাস্তা করতে বসেছে আলী আমজাদ, ছুটতে ছুটতে এল হেকমত। ছার, আপনের লগে কথার কাম আছে। তাড়াতাড়ি বাইরে আহেন।
আলী আমজাদের সামনে বড় রেকাবিতে ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর চিতনামতো প্লেটে ডিমভাজা। পরোটা ছিঁড়ে ডিমভাজার উপর রেখে ডানহাতের পাঁচ আঙুলের চাপে কায়দা করে পরোটার তলায় ডিমভাজা নিয়ে মুখে দিচ্ছিল সে। চৌকিতে একপাশে বসা আতাহার, অন্যপাশে নিখিল। কাল সন্ধ্যা থেকেই এই ঘরে তারা। সুরুজ আর আলমগীর ছিল না। ফলে পাঁচজনের জিনিস তিনজনে খেয়েছে। জিনিসটাও ভালই ছিল। বিলাতি। ঢাকা থেকে আনিয়েছিল আলী আমজাদ। ভ্যাট সিক্সটি নাইন। ওই জিনিস খেয়ে অনেক রাত তরি জেগে, হইচই গল্পগুজব করে ঘুমিয়েছে। সকালবেলা উঠেছে বেলা করে। সকালের কাজটাজ সেরে মাত্র নাস্তা করতে বসেছে তখন এল হেকমত।
হেকমতের কথা শুনে খুবই বিরক্ত হল আলী আমজাদ। মুখে দেওয়া ডিম পরোটা চিবাতে চিবাতে জড়ানো গলায় বলল, কী অইছে?
হেকমত উত্তেজিত গলায় বলল, বাইরে আহেন। কইতাছি।
ক্যা এহেনে কওন যায় না?
হেকমত কথা বলবার আগেই আতাহার শ্লেষের গলায় বলল, আমরা অইলাম ফালতু মানুষ! আপনের মাইট্রাল সর্দার কথাবার্তা আমগো সামনে কইবো না। যান বাইরে যান, কথা হুইন্নাহেন। আর নাইলে আমি আর নিখিলা বাইরে যাই, এহেনে বইয়াঐ কথা হোনেন আপনে।
পরোটা ডিমভাজা নিখিলের প্লেটেও ছিল। মাত্র মুখে দিতে যাবে সে, আতাহারের কথা শুনে থামল। যদি বাইরে যেতে হয় তা হলে এখন আর মুখে দেবে না, ফিরে এসে দিবে। মাঝপথে খাওয়া থামাতে ভাল লাগবে না।
ওদিকে আতাহারের কথা খুবই গায়ে লেগেছে আলী আমজাদের। রেগেছে সে। হেকমতের দিকে তাকিয়ে শীতল গম্ভীর গলায় বলল, তুই যে একহান আবাল হেই পরমান আমি আগেঐ পাইছি। আইজ আবার নতুন কইরা পাইলাম। তয় এইডা লইয়া অহন তরে আমি কিছু কমু না। কমু পরে। দোস্তগো সামনে আমারে অপমান করলি। আমারে অপমান করনের মজা কেমুন হেইডা তুই পরে উদিস পাবি। অহন ক কী কইতে আইছস। বাইরে আমি যামু না। যা কওনের আমার দোস্তগো সামনেঐ ক।
