হেকমতের মুখে এখন বেশ একটা স্বস্তির ভাব। আতাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, হ এমুন কথাঐ কওন লাগবো। তয় মনে অয় না ঐ বেডারে বিচড়াইতে কেঐ আইবো।
ক্যা?
বেডার মনে অয় কেঐ নাই।
আলী আমজাদ গদগদ গলায় বলল, যাউক বিপদ অইতে অইতেও অয় নাই। আল্লায় বাঁচায় দিছে।
আতাহার বলল, কন হেকমইত্তা বাঁচাই দিছে।
হ, আসলে হেকমইত্তাঐ বাঁচাইছে।
আলী আমজাদ আবার খেতে শুরু করল। ডিমভাজা পরোটা মুখে দিয়ে হেকমতের দিকে তাকিয়ে চিবাতে চিবাতে বলল, আমি তর উপরে বহুত খুশি হইছি হেকমত। আইজ থিকা তর রোজ দশটেকা কইরা বেশি। তয় এই কথা য্যান আমরা এই চাইরজন ছাড়া আর কে না জানে।
হেকমত বিনীত গলায় বলল, চাইরজনেও জানতো না ছার। জানতাম খালি আপনে আর আমি। আপনে আমার উপরে চেইত্তা গেলেন দেইক্কা আপনের দুই দোস্তে জানলো।
আতাহারও তখন আবার খেতে শুরু করেছে। খেতে খেতে বলল, আমরা জাননে কোনও ক্ষতি অয় নাই। আমরা কনটেকদার সাবের দোস্ত। জিন্দেগিতেও এই কথা কেঐরে কমু না।
হেকমত না, আলী আমজাদ বলল, হেইডা আমি জানি।
তারপর আবার তাকাল হেকমতের দিকে। হোন, অহন আরেকহান কাম করবি। যেহেনে আদিলদ্দি চাপা পড়ছে ওহেনে আরও বিশ-পঞ্চাশ গোড়া মাডি হালায় দে। মাইট্টালগো কবি জাগাড়ায় মাডি কম পড়ছে। কনটেকদার সাবে দেকলে চেতবো। তয় মাডি হালানের আগে তুই ভাল কইরা খ্যাল করবি লউংমউং দেহা যায়নি। কেঐ য্যান কিছু বোজতে না পারে।
না হেইডা পারব না। হেইডা আমি সাবধানেঐ করুম।
তয় তুই অহন যা। গিয়া কামডা কইরা হালা। আতাহারগো লইয়া আমি পরে আমুনে।
আইচ্ছা।
ঘর থেকে মাত্র বেরুবে হেকমত, আলী আমজাদ বলল, হোন।
হেকমত দাঁড়াল। কন ছার।
আমি তর উপরে বহুত খুশি অইছি, বহুত খুশি। এই জিন্দেগিতে আমার কাম থিকা আমি তরে কোনওদিন বাদ দিমু না। জিন্দেগি ভর তরে আমি দেহুম। আল্লার কছম।
হেকমত কোনও কথা বলল না। হাসিমুখে বেরিয়ে গেল।
হেকমত বেরিয়ে যাওয়ার পর আতাহার নিখিল দুইজনের দিকেই তাকাল আলী আমজাদ। বলল, কীরকম একহান বিপদ ঘইট্টা গেছে দেখছো?
ফাঁকে ফাঁকে আতাহার তার নাস্তা প্রায় শেষ করেছে। যেটুকু ডিম পরোটা প্লেটে ছিল সেটুকু মুখে দিয়া বলল, অহন তো বিপদ আর নাই। কাইট্টা গেছে। রাস্তায় যে মাইনষের জেতা (জ্যান্ত) কবর অইছে আমরা চাইরজন ছাড়া হেইকথা কোনওদিনও কেঐ জানবো না। তয় আপনের ভাগ্যিডা বহুত ভাল, হেকমইত্তার লাহান একজন মানুষ পাইছিলেন। হেকমইত্তার জাগায় যুদি অন্য মানুষ অইতো, অন্য মাইনষের চোক্কে যুদি ব্যাপারডা পড়তো, তয় এতক্ষুনে দেশগেরামের বেবাক মাইনষে জাইন্না যাইতো। থানা থিকা দারগা পুলিশ আইয়া মাড়িরতলা থিকা আদিলদ্দির লাচ বাইর করতো আর আপনেরে এরেস্ট করতো। দেশগেরামে একহান চিকরাচিকরি পইড়া যাইতো।
হ ঠিক কথা কইছো। তয় আরেক দিক দিয়াও আমার ভাগ্যি ভাল, তোমগো লাহান দোস্ত পাইছিলাম। তোমগো জাগায় অন্যমানুষ অইলে তারাও তো এইডা লইয়া আমারে বিপদে হালাইতে পারতো।
এবার নিখিলের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। তুমি দিহি এক্কেরে চুপ কইরা আছো। নিখিল! তুমি দিহি কোনও কথা কও না?
ঘটনাটা শোনার পর থেকে নিখিল একেবারে স্তম্ভিত হয়ে আছে। সামান্য একটু খেয়ে। আর খেতেও পারছে না। খেতে ইচ্ছা করছে না তার, গলা দিয়া খাবার নামতে চাইছে না। মুখটাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবু হাসিমুখে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। কোনওরকমে। বলল, কী কমু কন? যা অইছে হেইডা তো চিন্তাও করন যায় না। বিরাট একহান বিপদ আপনের মাথার উপরে আইয়াও গেছে গা। ভগবান আপনেরে বাঁচাই দিছে।
তয় তোমগো দুইজনের কাছে আমার একহান অনুরুদ আছে।
আতাহার বলল, আপনে কী কইবেন বুজছি আমি। তয় কথাডা কওন লাগবো না। আমগো দিয়া আপনের কোনও ক্ষতি অইবো না। আমরা একবার যারে বুক দেহাই তারে পিড দেহাই না। আপনে নিচচিন্ত থাকেন। যেমতে যা চলতাছে ওমতে বেবাক চলবো। আমগো লইয়া চিন্তা না কইরা চিন্তা করবেন হেকমইত্তারে লইয়া। অর লগে রাগারাগি আর খারাপ ব্যাভার করবেন না। অরে খালি হাতে রাখবেন।
হ এইডা ঠিক বুদ্ধি দিছো। আইজ কইলাম এত সহজে আমি বাইচ্চা গেলাম অর লেইগাঐ।
তখনই চায়ের কথাটা মনে পড়ল আতাহারের। আরে এতক্ষণ হয়ে গেছে চা দিয়া যায় নাই কেন রহিমা? হেকমত না এলে অনেকক্ষণ আগেই নাস্তা খাওয়া হয়ে যেত, অনেকক্ষণ আগেই চায়ের দরকার হত! তা হলে কি হেকমতকে দেখেই চা নিয়ে এইঘরে আর ঢোকে নাই রহিমা?
তাই হবে।
আতাহার নিখিলের দিকে তাকাল। ওই নিখিলা, রানঘরে যা। রহিরে জিগা অহনও চা দেয় নাই ক্যা? তাড়াতাড়ি দিতে ক। চা খাইয়া কনটেকদার সাবের লগে বাইর অই। দেইক্কাহি ওইমিহির অবস্তা কী?
নিখিল কোনও কথা না বলে ঘর থেকে বেরুল। হাঁটাচলার ভঙ্গি মনমরা ধরনের।
.
দুপুরের ভাত খেয়ে একটু শোবে মরনি, দুয়ার বন্ধ করবার জন্য হাত বাড়িয়েছে, দেখে তার উঠানের উপর দিয়া হেঁটে যাচ্ছে নিখিল। সেই যে নূরজাহানের ঘটনার দিন মুরগি কিনা নিয়া গিয়াছিল নিখিল তারপর এই এতগুলি দিন তার লগে আর দেখা হয় নাই। এই বাড়িতে নিখিল আর আসে নাই।
আজও যে আসে নাই নিখিলের হাঁটাচলার ভঙ্গিতেই তা বোঝা যাচ্ছিল। হয়তো এদিকে কোথাও আসছিল, নিজেদের বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য মরনির উঠান পার হচ্ছে।
