বানেছা নরম গলায় বলল, গেছেলা কই?
পয়লা গেছি দিগলি বাজারে, রতন ভাঙ্গারির দোকানে।
হ হেইডা আমরা জানি।
ওহেন থিকা গেছিগা পয়সা গেরামে। ওই গেরামে বিরাট নামকরা এক মাওলানা হুজুর আছেন। রফিউদ্দিন মাওলানা। তাঁর কাছে গিয়া তোবা করলাম। নমজ তো ছোডকালেঐ হিগছিলাম। তয় পাঁচওক্ত কোনওদিনও পড়ি নাই। আবার নতুন কইরা হিগলাম, পড়তে আরম্ব করলাম। হেদিন থিকা আর দাড়িও কাডি না। পাঁচওক্ত নমজ পড়ি আর পয়সা বৈলতলি ইছাপুর তালতলা কলমা এই হগল গেরামে গাওয়াল করি। যেই গেরামে রাইত অয় হেই গেরামেঐ কোনও না কোনও গিরস্ত বাইত্তে থাকি। নমজি মানুষ, গিরস্তে আদর কইরা থাকতে খাইতে দেয়। গাওয়ালের ফাঁকে ফাঁকে নমজের সময় অইলেঐ নমজ পড়ি আর আল্লার কাছে কান্দি। ইয়া হে আল্লা, পাকপরোয়ারদিগার, আমার জীবনের বেবাক গুনা মাপ করো আল্লা। মাপ করো।
বানেছা বলল, তয় গাওয়াল যে করতা, পুরানা মালছামান দিতা কারে, নিতা কার কাছ থিকা? রতন ভাঙ্গারির দোকানে তো মনে অয় আর যাও নাই?
আইজ গেছিলাম। এতদিন আর যাই নাই। এতদিন ইছাপুর বাজার, কলমা নাইলে তালতলা বাজারের ভাঙ্গারিগো কাছে গেছি। সব ভাঙ্গারিগোঐ একরকম নিয়ম। অসুবিদা। অয় নাই।
তোমার দুই পোলায় যে রতন ভাঙ্গারির কাছে গেছিলো ভাঙ্গারি কি হেই কথা আইজ কইলো তোমারে?
হ।
একটু থেমে আজিজ বলল, তয় কেঐ না কেঐ যে আমারে ভাঙ্গারির দোকানে বিচড়াইতে যাইবো এইডা আমি বুজছিলাম।
এর লেইগাঐ ওইমিহি আর আহো নাই?
হ এইডা একটা কারণ। যুদি ভাঙ্গারি লোকজন দিয়া আমারে বাইত্তে পাড়াইয়া দেয়?
একটু থেমে কী ভাবল বানেছা, তারপর বলল, যেই কামের লেইগা এমুন করলা তুমি, হেই কাম তো বাইত্তে থাইক্কাও করতে পারতা? খাইগোবাড়ির মাওলানা হুজুরের কাছে তোবা কইরা নমজ শুরু করতে পারতা?
হ পারতাম। তয় ঐডা আমি ইচ্ছা কইরা করি নাই।
ক্যা?
নিজেরে বদলানের লেইগা একলা একলা থাকন দরকার আছিলো আমার।
আর এইমিহি আমরা মনে করছি ডাকাইতে মারছে তোমারে।
না। মনডারে আল্লার রাস্তায় নেওনের লেইগা মুসাফির অইয়া গেছিলাম। তোমগো কথা যে চিন্তা করি নাই তা না, তোমগো লেইগা যে মায়া মহব্বত লাগে নাই তা না। তয় বেবাক কিছু মিল্লা আল্লার রাস্তায় গিয়াঐ আমি কইলাম আবার সংসারে ফিরলাম। কারণ তুমি আমার পরিবার, তোমার লেইগা আমার একহান দায়িত্ব আছে। পোলাপানডি আমার, পোলাপানের লেইগাও দায়িত্ব আছে। আল্লার রাস্তায় থাইক্কা বেবাক দায়িত্ব আমি অহন থিকা পালন কইরা যাইতে চাই। তয় সবকিছুর আগে তোমার লগে আমার কথা আছে।
কী কথা, কও।
আমি যা কমু তুমি হোনবা?
হুনুম। তুমি যা কইবা, যেমতে কইবা আমি হুনুম।
বানেছার কথায় আজিজ খুব খুশি হল। হাত বাড়িয়ে বানেছার একটা হাত ধরল। খুশি অইলাম, বহুত খুশি অইলাম তোমার কথা হুইন্না। মনে অইলো মাসেকহানি ধইরা বাইত্তে না আইয়া আমি যেমুন বদলাইছি, বাইত্তে থাইক্কা তুমিও হেমুন বদলাইছো। এই একমাসে তুমি মনে অয় অনেক কিছু চিন্তা করছ।
বানেছা সরল গলায় বলল, হ নিজের অন্নাই অপরাদের কথা চিন্তা করছি। তুমি তোমার মা’র লগে যেই অন্নাই করছ, হেই অন্নাইডা আসলে তোমার না। অন্নাইডা আছিলো আমার। আমার ডরেঐ তুমি তোমার মা’র মিহি ফিরা চাইতে পারো নাই, তার ভরণপোষণ দিতে পারো নাই। আমার লেইগাঐ কিরপিন অইছো তুমি, বচ্ছর বচ্ছর পোলাপানের বাপ অইছো। অন্নাই তোমার না, বেবাক অন্নাই আমার। তোবা তোমার করনের কাম আছিলো না, তোবা করনের কাম আছিলো আমার। যেই অন্নাই আমি আমার হরির লগে করছি, আমার পোলার বউ যুদি আমার লগে অমুন করে তহন যেই দুঃখু আমি পামু, আমার হরিরে তো হেই দুঃখুঐ আমি দিছি। সংসারডা এমুন ছেঁড়াভেড়া অইছে আমার লেইগা। বেবাক দোষ আমার।
শেষদিকে আবার গলা বুজে এল বানেছার। কথা জড়িয়ে এল। আর আজিজের আত্মায় লাগল অন্যধরনের এক কাঁপন, মন ভরে গেল অন্যধরনের এক ভাল লাগায়। আবেগে আবেশে কথা বলতে যেন ভুলে গেল সে। সত্যিই তো, বানেছাও তো চিন্তা করেছে অনেক কিছু। নিজের যাবতীয় অন্যায় অপরাধের কথা চিন্তা করে সেও তো মরছে তীব্র অনুশোচনায়! এই এক মাসের দূরত্বে তারা দুইজনেই তো পেরেছে ভিতর থেকে বদলে যেতে!
আল্লাহ, আল্লাহ! সবই আল্লাহপাকের কুদরত। আল্লাহ চাইলে সব হয়। মানুষ হচ্ছে তার হাতের পুতুল। যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তাদের মনকে তিনি ঘুরিয়ে দেন। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে দুইজন মানুষের মনকে কীভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছেন! অন্য মানুষ করে দিয়েছেন!
বানেছার পাশে বসে মনে মনে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করল আজিজ। ইয়া হে আল্লাহ, পাকপরোয়ারদিগার, তোমার রহমতের দুয়ার আমগো লেইগা খুইলা দিছো। বইলাই এমুন বদলান আমরা দুইজন বদলাইতে পারছি। এর লেইগা আল্লাহ আমি তোমার দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করতাছি। আল্লাহপাক, তুমি আমগো আরও দয়া করো, আমরা যেন হারাডা জীবন ঠিক থাইকা জীবনডা কাড়াইয়া যাইতে পারি। আর কোনও গুনা য্যান জীবনে আমরা না করি।
নিজেকে সামলে বানেছা বলল, তুমি তো আছিলা না, সংসারের কামকাইজ আমি কিছু করি নাই। বেবাকঐ করছে পরি-জরি। আমি বইয়া বইয়া খালি তোমার কথা চিন্তা করতাম। এই সংসারে আহনের পর থিকা কী কী অন্নাই আমি করছি, বেবাক কথা আমার মনে অইতো। মনে অইতো আমার অন্নাইয়ের লেইগাঐ তুমি এমতে নিরুদ্দিশ অইয়া গেছে। অন্নাইয়ের শাস্তি আল্লায় আমারে, তোমারে নিরুদ্দিশ কইরা দিল। এতডি পোলাপান লইয়া হারাড়া জীবন অহন আমার শাস্তি ভোগ করন লাগবো। এই হগল চিন্তা কইরা রাইত্রে ইট্টুও ঘুমাইতে পারতাম না। খালি কানতাম আর আল্লার কাছে কইতাম, আল্লা তারে তুমি ফিরত আইন্না দেও, আইন্না দিয়া দেহো এই জিন্দেগিতে আমি আর কোনও অন্নাই করুম না, কোনও গুনার কাম করুম না।
