বানেছা আজিজের দিকে তাকাচ্ছিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় বলল, না। থাউক। আমি পরে খামুনে।
আজিজ অনুনয়ের গলায় বলল, ক্যা? আমগো লগেঐ খাও। বেবাকতে একলগে মিল্লা খাইলে ভাল খাওন আরও ভাল লাগে। তুমি এতো কষ্ট কইরা মোরগ পোলাও রানছো, আর আমগো লগে বইয়া খাইবা না, এইডা আমার ভাল্লাগবো না। বহো।
আজিজ ফিরে আসার পরপরই বানেছা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গিয়েছিল মানুষটা আর আগের মানুষ নাই, অন্যমানুষ হয়ে গেছে। বাইরের বদলটা পলকেই বুঝে গিয়েছিল সে। ভিতরের বদলটা বুঝতে সময় লাগছিল। এখনকার কথায় সেটাও অনেকখানি বুঝে গেল।
তারপর নিজের থাল নিয়ে খেতে বসেছিল বানেছা।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে পোলাপানরা যে যার মতন শুয়ে পড়েছে। এতদিনকার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা শেষ হয়েছে আজ, বাবা ফিরা আসছে, ফলে শোয়ার লগে লগেই নিশ্চিন্তে ঘুমায়া পড়ছে সবাই। চৌকির উপর আজিজ তখন এশার নামাজ পড়তে দাঁড়িয়েছে, আর এতগুলি। মানুষের খাওয়াদাওয়ার পরের কাজগুলি করছিল বানেছা।
নামাজ শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়েছে আজিজ। বানেছাকে ডেকেছে। বাইরে জোছনা আছে। আহ উডানে বইয়া কথাবার্তা কই দুইজনে।
হাতের কাজ শেষ করে বেরিয়েছে বানেছা। বড়ঘরের ওটায় বসেছে। আজিজ গিয়ে বসেছে ঢেঁকিঘরের ওটায়। তখন আচমকাই বিড়ি খাওয়ার কথাটা বলল বানেছা। আজিজ ফিরে আসার পর তার লগে নিজ থেকে এই প্রথম কথা বানেছার। শুনে আজিজ বলল, না, বিড়ি খাওন আমি ছাইড়া দিছি। জীবনের অনেক কিছু আমি ছাইড়া দিছি। জীবনডা আমি বদলাইয়া হালাইছি। আজিজ গাওয়াল আর আগের মানুষ নাই। অন্য মানুষ অইয়া গেছে।
বানেছা উদাস গলায় বলল, হেইডা আমি বুজছি। তোমার চেহারা সুরৎ বদলাইয়া গেছে, মন বদলাইয়া গেছে। তুমি নমজ ধরছো। পোলাপানের লেইগাও মায়া মহব্বত আইজ দেকলাম বেশি। কোনওদিন পেপালাপানরে এত আদর করতে দেহি নাই। কথাবার্তা, চালচলনও বদলাইছে তোমার।
হ কইলাম না, বেবাকঐ বদলাইছে। তয় পোলাপানডিরও যে আমার লেইগা এত টান এইডা আমি আগে কোনওদিন বুজি নাই। আইজ যহন ফিরত আইলাম তহন বোজলাম।
বানেছা কথা বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজিজ বলল, তোমার টানডাও আমি বুঝছি। আমার লেইগা তোমার বহুত টান। তুমি যে আমার লেইগা একদোম শেষ অইয়া গেছিলা, বাইত্তে উইট্টা, তোমার মোক দেইক্কাঐ আমি হেইডা বুজছি।
আজিজের কথায় চোখ ফেটে কান্না এল বানেছার। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল সে, নাক টানল।
আজিজ বুঝল বানেছা কাঁদছে। উঠে এসে বানেছার সামনে দাঁড়াল সে, হাত বাড়িয়ে বানেছার একটা হাত ধরল। কাইন্দো না, আহো আমার কাছে।
বানেছা নড়ল না, বসেই রইল।
আজিজ বলল, পোলাপানরা মনে অয় ঘুমাইয়া গেছে। তাও এহেনে বইয়া কথা কওন। ঠিক অইতাছে না। যুদি কেঐ জাগনা জোগনা থাকে তয় আমগো কথা হুইন্না হালাইবো। লও ওইঘরের ওটায় বইয়া কথা কই দুইজনে। তোমার লগে অনেক কথা আছে আমার।
এবার বানেছা উঠল। নাক টেনে খোলা দরজা আবজায়া দিল, স্বামীর লগে এসে বসল ঢেঁকিঘরের ওটায়।
পাশাপাশি বসেই একটা হাত বানেছার কাঁধে দিল আজিজ। গভীর আবেগে তাকাল স্ত্রীর মুখের দিকে। তুমি আমারে লইয়া অনেক চিন্তা করছো, না? মনে করছো আমি মইরা ধইরা গেছি! এতডি পোলাপান লইয়া তুমি কেমুন করবা, আমারে কই বিচড়াইবা! আমিও আলার বাপের লাহান নিরুদ্দিশ অইয়া গেলাম, আমিও আর কোনওদিন ফিরত আমু না, এমুন চিন্তা করছো না?
স্বামী ফিরে আসার পর থেকেই আশ্চর্য এক অভিমানে বুক ভরে আছে বানেছার। স্বামীর মুখের দিকে সহজে তাকাতে পারছিল না সে, কথা বলতে পারছিল না। অচেনা এক অনুভূতি। সন্ধার মুখ থেকে এতটা রাত তরি সেই অনুভূতির মধ্যেই ছিল। খানিক আগে স্বামী হাত ধরায় সেই অনুভূতি খানিকটা ভেঙেছে, এখন কাঁধে হাত দেওয়ায় পুরাপুরিই ভাঙল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না বানেছা, স্বামীর দিকে ঘুরে দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলল। আমগো হালাইয়া কই গেছিলা গা তুমি? ক্যান গেছিলা? আমার লেইগা না অউক পোলাপানডির লেইগা তোমার মায়া লাগে নাই? এতো। নিঠুর তুমি অইলা কেমতে? কেমতে এতদিন আমগো ছাইড়া থাকলা?
বানেছার কান্নায় আজিজেরও চোখ ভরে এল পানিতে। একহাতে বানেছাকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ধরা গলায় বলল, আমি ইচ্ছা কইরা এমুন করছি। ইচ্ছা কইরা। নিজেরে বদলানের লেইগা এমুন করছি। আমি তো মানুষ আছিলাম না, আছিলাম আমানুষ। আমানুষ থিকা মানুষ অওনের লেইগা আমি এমুন করছি।
মা’কে নিয়া নিজের অপরাধবোধ, সাতদিন বয়সের মেয়েটির জন্মমুহূর্তে আলার মা’র লগে যেসব কথা হয়েছিল সেইসব, মৃত্যুর পরে মেয়েটিকে দাফন না করার অপরাধ, এক দুপুরে বহ্নিছাড়ার ওদিককার হিজলতলায় বসে তোতার সঙ্গের কথা, শেষ পর্যন্ত মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কাছে গিয়া নিজের যাবতীয় গুনার কথা স্বীকার করা, সব বানেছাকে খুলে বলল আজিজ।
শুনে কান্না ভুলে বানেছা স্তব্ধ হয়ে গেল। স্বামীর বুক থেকে মুখ তুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যদিও উঠান থেকে ছিটকে আসা ম্যাটম্যাটে জ্যোৎস্নায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না মুখ, তবু তাকিয়ে রইল।
আজিজও তখন ছেড়ে দিয়েছে বানেছাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মাওলানা সাবে কইছিলো আল্লার কাছে তোবা (তওবা) কইরা নমজ শুরু করেন বাবা। পাঁচওক্ত নমজ পইড়া এই হগল গুনার লেইগা আল্লার কাছে মাপ চান। মাপ করনেআলা আল্লা। পাকপরোয়ারদিগার লিশ্চই সব গুনা মাপ করবো। যেদিন হুজুরে এই হগল কথা কইল তার দুই-তিন দিন বাদেঐ গাওয়ালে বাইর অইয়া আমি আর ফিরত আইলাম না।
