আজ বিকালে মজনুরও এই অবস্থা হল। বাড়ির উত্তর পশ্চিম কোণ দিয়ে নামতে গেছে, একটু আনমনা ছিল, ফলে পা এত জোরে দৌড়াল, নিচে নেমে একজন মানুষের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
মানুষটা তখন দুইহাতে জড়িয়ে ধরেছে মজনুকে। আস্তে আস্তে। আছাড় খাইবেন তো!
লজ্জা পেয়ে নিজেকে সামলাল মজনু। মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে তাকে ধরে। নাকে নথ পরা মিষ্টি মুখখানা উজ্জ্বল হাসিতে ঝকঝক করছে।
মজনুকে এভাবে তাকাতে দেখে জীবনে এই প্রথম শরীরের খুব ভিতরে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হল নূরজাহানের। অদ্ভুত এক লজ্জায় চোখ মুখ নত হয়ে গেল। চট করে মজনুকে ছেড়ে দিল সে। চোখ তুলে কিছুতেই আর মজনুর দিকে তাকাতে পারল না।
মজনু তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নূরজাহানকে দেখছে। চারমাসে যেন অনেক বড় হয়ে গেছে নূরজাহান। মুখটা ঢলঢল করছে অপূর্ব এক লাবণ্যে। চোখে আশ্চর্য এক লাজুকতা। পিঠের ওপর ফেলে রাখা বেণী দুইখানা যেন হঠাৎ করেই তার চপলতা হরণ করেছে।
নূরজাহান তো এমন ছিল না! কোন ফাঁকে এমন হয়ে গেছে!
মজনুর ইচ্ছা হল নূরজাহানকে জিজ্ঞাসা করে, কীরে নূরজাহান তুই দিহি বিয়ার লাইক (লায়েক) অইয়া গেছস! চাইর মাসে এতবড় অইলি কেমতে?
কী ভেবে কথাটা মজনু বলল না। বলল অন্যকথা। কই যাইতাছিলি নূরজাহান?
নূরজাহান মুখ তুলে মজনুর দিকে তাকাল। হাসল। আপনেগ বাইত্তে।
ক্যা?
একথায় রাগল নূরজাহান। ক্যা আবার, এমতেঐ। মাইনষের বাইত্তে মাইনষে যায় ক্যা?
নূরজাহানের এই রাগি ভাব সব সময়ই ভাল লাগে মজনুর। এখনও লাগল। ইচ্ছা হল রাগটা আরেকটু বাড়িয়ে দেয় তার। কিন্তু বাড়াল না। বলল, এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আহনের কথা মনে অইলো তর?
এতদিন বাদে কো? কয়দিন আগেও তে আইয়া গেলাম!
তয় আমি দিহি (দেখি) তরে দেকলাম না!
নূরজাহান অপূর্ব মুখভঙ্গি করে হাসল। আপনে দেকবেন কেমতে! আপনে তহন বাইত্তে আছিলেননি?
এবার মজনুও হাসল। আমি বাইত্তে আইছি পাঁচদিন অইল।
তার আগে আইছি আমি।
তাইলে তো আমার কথা ঠিকঐ আছে।
মজনুর কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। সরল মুখ করে মজনুর দিকে তাকাল। কী ঠিক আছে?
ওই যে কইলাম এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আইনের কথা মনে অইলো তর। পাঁচদিন কী কম দিন? আগে তো রোজঐ আমগো বাইত্তে আইতি!
নূরজাহানের ইচ্ছা হল বলে, আগে যে আপনে বাইত্তে আছিলেন এর লেইগা রোজঐ আইতাম। অহন তো আর আপনে নাই, কীর লেইগা আমু! আপনের খালার লগে প্যাচাইল পাড়তে আমার ভাল্লাগে না। বুড়া মাইনষের লগে কথা কইয়া জুইত (জুত) পাই না।
কথাটা বলল না নূরজাহান। জীবনে এই প্রথম মুখে আসা কথা আটকে রাখল। কী রকম লজ্জা হল।
মজনু বলল, আমগো কথা তর মনে অয় অহন আর মনে থাকে না।
নূরজাহান বলল, কে কেইছে?
কে আবার কইবো! আমি কই।
আপনে কইলেঐ অইবোনি? মনে না থাকলে আইজ আইলাম ক্যা?
মনে হয় এই মিহি কোনও কাম আছিলো, কাম সাইরা এক ফাঁকে মনে অইছে আমগো বাইত ঘুইরা যাবি, এর লেইগা আইলি!
নূরজাহান আবার হাসল। টাউনে থাইক্কা দিহি বহুত ঘুরাইন্না প্যাচাইন্না কথা হিগছেন আপনে! আগে এমুন আছিলেন না!
আগে তুইও এমুন আছিলি না।
তয় কেমন আছিলাম আমি?
অন্যরকম।
কেমুন হেইডা কইতে পারেন না?
এত সোন্দর আছিলি না। পচা আছিলি।
ঠোঁট বাঁকিয়ে মজাদার ভঙ্গি করল নূরজাহান। ইস পচা আছিলো! আমি কোনদিনও পচা আছিলাম না। পচা আছিলেন আপনে।
নূরজাহানের দিকে সামান্য ঝুঁকে ঠোঁট টিপে হাসল মজনু। আর অহন?
অহনও পচা। তয় আগের থিকা ইট্টু কম।
একথায় মজনু থতমত খেল। তারপরই ঠিক হয়ে গেল। নূরজাহান তো এরকমই। যা মুখে আসে ঠাস ঠাস বলে ফেলে। কে কী ভাবল ভেবে দেখে না।
তবে নূরজাহান চোরাচোখে তখন মজনুকে দেখছে।
মজনু পরে আছে আকাশি রঙের ফুলহাতা শার্ট। হাতা বেশ সুন্দর করে ভঁজ দিয়ে গোটান। লুঙ্গি পরে আছে বেগুনি চেকের। মাথার চুলে বুঝি আজই সাবান দিয়েছে। রুক্ষ উড়ু উড়ু চুল। মুখটা চারমাস আগের তুলনায় অনেক ফর্সা, অনেক সুন্দর হয়েছে।
এখন পরিপূর্ণ বিকাল। আসন্ন শীতের রোদ আদুরে ভঙ্গিতে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। গাছপালা আর মানুষের বাড়িঘর যেন উচ্ছাস আনন্দে ভরা। এরকম বিকালে মজনু যা না তারচেয়ে যেন অনেক বেশি সুন্দর।
নূরজাহান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখতে থাকে।
মজনুদের বাড়ির পশ্চিম দিকে সরু একখানা হাট। এই হালটের দক্ষিণে কালিরখিল, মাওয়া। উত্তরে খানবাড়ি হাতের বাঁদিকে রেখে হালট ঘুরে গেছে সীতারামপুরের দিকে। গিয়েই মাঝপথে থেমে গেছে। এই হালট মুছে ফেলে তার উপর দিয়ে উত্তরে দক্ষিণে ধা ধা করে আসছে সেই মহাসড়ক। সড়কের কাজে ওদিকটায় দিনরাত লেগে আছে লোকজনের চিল্লাচিল্লি কিন্তু মজনুদের বাড়ির দিকটা একেবারেই নির্জন। হালটের ওপাশ থেকে শুরু হয়েছে বিল। পশ্চিমে মাইল দেড়েক, উত্তরে দুই আড়াই মাইল, দক্ষিণে অল্প, তারপরই গ্রাম, নয়াকান্দা। পশ্চিমে কান্দিপাড়া, জশিলদিয়া। উত্তরে কবুতরখোলা, কোলাপাড়া, রাড়িখাল। এই বিশাল বিলের মাঝখানে খুব কাছাকাছি সামনে পিছনে দুইটা বাড়ি। একটা বাড়িতে গোরস্থান। কয়েকটা বাঁশঝাড় আর মানুষের কবর ছাড়া আর কিছু নাই। পিছনের বাড়িটার নাম বিলেরবাড়ি। বিশাল একটা শিমুল গাছ আছে বাড়িতে, দূর থেকে এই গাছ দেখে দিক চিনে নেয় পথিকেরা।
