এইসব কারণে দুই ইদের কোনওটাতেই চিনিগুড়ি চালের পোলাওটা বানেছার রান্না করা হয় নাই। আজ এত বিপর্যয়ের পর সংসারে মানুষটা তার ফিরেছে। এসেই চেয়েছে পোলাপান নিয়া ভালভালাই খেতে। বানেছা কি আজ পোলাও রাধবে!
তয় ঘি? মুরগি?
মুরগি সমস্যা না। বাড়ির পালা মোরগ মুরগি থেকে ড্যাকরা মতন দুইটা জবাই করলেই হবে। সমস্যা হচ্ছে ঘি। ঘিও ইচ্ছা করলে এখনই মাওয়ার বাজারের সেন্টু ঘোষের দোকান থেকে আনায়া নেওয়া যায়। রসগোল্লাটা যেমন খাঁটি বানায় সেন্টু, ঘিটাও বানায় তেমন। নাদের-হামেদকে পাঠায়া দিলেই দৌড়ে গিয়া নিয়া আসবে।
আয়োজনটা করার জন্য তৈরি হয়ে গেল বানেছা।
ঘরে গোপনে কিছু টাকাপয়সা সবসময়ই বানেছার কাছে রাখত আজিজ। গত এক মাসে সেইসব টাকার কিছু খরচা হয়েছে। নগদ পঁচিশ-তিরিশ টাকা গেছে জিন ডাক দিতে। এদিক ওদিক গেছে আরও কিছু। তবু এখনও হাতে যা আছে পোয়াখানেক ঘি আনানো যাবে।
আজিজ তখন চৌকিতে উঠে মাগরিবের নামাজ পড়ছে।
দুই ইদ ছাড়া বাবাকে কখনও নামাজ পড়তে দেখে নাই পোলাপানে। মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি এই বাবাকেও দেখে নাই কোনওদিন। ফিরে আসার পর থেকে তাই বাবার প্রতিটা আচরণ খেয়াল করছিল তারা। মাগরিবের সময় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিল বাবার নামাজ পড়া।
এসময় শিকায় তোলা একটা পট থেকে টাকা যা ছিল বের করল বানেছা। সেই টাকা হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নাদের-হামেদকে পরি-জরিকে ডাকল। নাদের-হামেদকে বলল, সব থিকা বড় মোরগ দুইডা জবো কইরা দে। তারবাদে মাওয়ার বাজারে গিয়া সেন্টুর দোকান থিকা একপোয়া ঘি লইয়ায়। পরি-জরিরে লইয়া আমি মোরগ বানাইতে বানাইতে ঘি লইয়া ফিরত আবি। দৌড়াইয়া যাবি, দৌড়াইয়া আবি। তর বাপে তগো লইয়া ভালভালাই খাইতে চাইছে। এর লেইগা আমি পোলাও মোরগ রাম।
শুনে আনন্দে একেবারে ফেটে পড়ল সবাই। লগে নাদের-হামেদ দৌড়ে গেল মোরগ ধরতে। তাদের লগে ছুটাছুটি শুরু করল পরি জরি বদু। ছোট্ট নাজুও টলমল পায়ে ভাইবোনদের লগে তাল মিলাতে চাইল।
মোরগ ধরে পশ্চিম দিককার আমগাছটার কাছে নিয়ে জবাইয়ের কাজটা দ্রুতই সেরে ফেলল নাদের হামেদ। একহাতে শক্ত করে মোরগের দুই পা আর ডানা ধরল হামেদ। অন্যহাতে টানা দিয়া ধরল গলার কাছটা। নাদেরের একহাতে মাঝারি সাইজের ধারালো ছুরি। মোরগের মাথাটা একহাতে টেনে ধরে, তার আর হামেদের ধরা মোরগের গলার টানা দেওয়া জায়গাটার মাঝবরাবর বিসমিল্লাহ বলে ছুরি চালিয়ে দিল। পলকে ফিনকি দিয়ে বেরুল রক্ত, মোরগটা শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে নড়াচড়ার চেষ্টা করল, হামেদের শক্ত হাতের জোরে কুলাতে পারল না।
জবাই শেষ করেও লগে লগেই মোরগটাকে মাটিতে ফেলে দিল নাদের। হামেদ চাইছিল। নাদের বলল, না, জবো করনের লগে লগে ছাইড়া দিলে মাডিতে পইড়া দাপড়া দাপড়িডা মোরগে বেশি করে। অমুন করলে রক্তমক্ত ছিট্টা জামা কাপড় বিনাশ হইবো বেবাকতের।
শুনে হামেদ বুঝদারের মতন বলল, হ ঠিকঐ কইছস দাদা।
তারপর মোরগের প্রাণটা একেবারে বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত, মোরগ একেবারে নিস্তেজ হওয়া তরি দুইভাইয়ে মিলে ধরেই রাখল। যখন বুঝল, হ্যাঁ, এখন আর নড়াচড়ার ক্ষমতা নাই, প্রাণটা চলে গেছে মোরগের, তখন অদূরে মোরগ জবাই করতে দেখা ভাইবোনদের পায়ের কাছে ফেলে দিল।
অন্য মোরগটা ছিল পরির হাতে, ঠিক আগের কায়দায় সেটাও জবাই করল নাদের হামেদ। তারপর রান্নাচালার বাইরে পুরানা মাটির ঠিলায় রাখা পানি ঢেলে হাত ধুয়ে দুইভাইয়ে মিলে রওনা দিল মাওয়ার বাজারে। পরি জরিদের মনে তখন ইদের দিনকার সকালবেলার মতন আনন্দ। মায়ের লগে হাত মিলিয়ে এটা ওটা করতে লাগল।
নামাজ শেষ করে বড়ঘরের ওটায় পিঁড়ি নিয়ে বসেছিল আজিজ। বদু নাজু ঘুরঘুর করছিল তার কাছে। নাজুকে একহাতে কোলে টেনে বসাল সে, অন্যহাতে বন্দুকে ধরে রাখল বুকের কাছে। টুকটাক কথা বলতে লাগল তাদের লগে আর রান্নাচালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মা-মেয়েদের রান্নাবান্নার আয়োজন দেখতে লাগল।
এইভাবে কেটেছে সারাটা সন্ধ্যা, রাতের অনেকখানি। নাদের হামেদ ঘি নিয়া ফিরে। আসার আগেই মোরগ বানিয়ে চুলায় বসিয়ে দিয়েছে বানেছা। মশলা পিয়াজের গন্ধে ভরে গেছে বাড়ি। সেই ফাঁকে রাবি আর বাদলা এসে ঘুরে গেছে, মেয়ে কোলে আবদুল আর আবদুলের বউ এসে ঘুরে গেছে। মিয়াবাড়ি থেকে আসছিল আলফু। একটু দূরে বাড়ি, তবু খবর পেয়ে আসছিল দবির গাছি। তাদের লগে টুকটাক কথা বলেছে আজিজ। কোথায়। ছিল এতদিন, কী বৃত্তান্ত খোলসা করে বলে নাই কিছুই। জানতে চেয়েছে সবাই। আজিজ হাসিমুখে বলেছে, আছিলাম নানান জায়গায়। ইচ্ছা কইরাঐ আছিলাম। কোনও বিপদ আপদ অয় নাই।
শুনে আশ্বস্ত হয়ে যে যার মতন ফিরে গেছে। শুধু হতাশ হয়েছে বাদলা। সে আশা করেছিল ভীষণ একখান উত্তেজক গল্প শুনবে গাওয়ালের মুখে, হয়তো শুনবে ডাকাতেই ধরেছিল তাকে, ধরে নিয়ে আটকে রেখেছিল কোথাও, তারপর দয়া করে ছেড়ে দিয়েছে। এই দয়ার পিছনে আছে কোনও মানবিক গল্প। যখন শুনল এসবের কিছুই না তখন হতাশ। হয়ে রাবিকে বলল, রাইত অইয়া গেছে। লও মা, বাইত যাই।
রান্নাবান্না শেষ হতে হতে বেশ রাত। তারপর পোলাপান নিয়া খাইতে বসছে আজিজ। বানেছা বেড়ে দিচ্ছিল। আজিজ বলল, তুমিও বহো। বেবাকতে একলগে খাই।
