আকাশে ম্লান চাঁদ আছে, ম্যাটম্যাটা জ্যোৎস্না ফুটেছে গ্রাম প্রান্তরে। শেষ চৈত্রের রাত্রিকালীন হাওয়াটা আছে। এই হাওয়ায় খাইগোবাড়ির মসজিদ থেকে ভেসে আসছে। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের মধুময় সুরের এশার আজান।
মাথায় তখন মোড়া ভরতি মাটি আদিলউদ্দিনের। ফেলতে গিয়াই আজানের শব্দ পেল। লগে লগে নামাজের জন্য তৈরি হয়ে গেল সে। অন্ধকার মতন একটা দিকে চানমিয়ার চোখে যাতে না পড়ে এমন ভঙ্গিতে ছোঁড়া হাতে নেমে গেল।
এই দিকটায়ই মাটি ফেলছে মাটিয়ালরা। দূরে গেলে ফিরতে দেরি হবে দেখে মাটি ফেলবার জায়গার একটি কোণে মাজার গামছা বিছায়া, লুঙ্গির কোচড়ে যত্ন করে রাখা টুপি বের করে নামাজ পড়তে বসে গেল আদিলউদ্দিন। তবে বসল বেশ গা বাঁচিয়ে, যাতে মাটি এসে গায়ে না পড়ে। নির্বিঘ্নে নামাজটা শেষ করা যায়।
নামাজে বসে বহুদিন ধরেই এই মাটির পৃথিবীতে যেন আর থাকে না আদিলউদ্দিন। অচিনলোকের অলৌকিক এক মহাজগতে যেন চলে যায়। পার্থিব সবকিছু লুপ্ত হয়ে যায় চোখ থেকে, চিন্তা চেতনা থেকে।
আজও তাই হয়েছে।
ঠিক তখন মাটিয়ালদের একটা দলকে ওদিকেই পাঠিয়েছে চানমিয়া। ওদিকে মাটি ফেলার আদেশ দিয়েছে। দিকপাশ না ভেবে মাটিয়ালরা ছোঁড়ার পর গোড়া ভরতি মাটি এনে ফেলতে শুরু করেছে। একজন মানুষ যে নামাজে বসেছে, পরম করুণাময়ের উদ্দেশে দুইহাত তুলে নিজের সারাজীবনের গুনার জন্য যে কাঁদছে, মজনুর জন্য যে কাঁদছে, টেরই পেল না তারা। মাটি ফেলতে লাগল।
মাটির আড়ালে ডুবে যেতে যেতে মানুষটা তখন তার মোনাজাত শেষ করেছে। শেষ করেই পার্থিব জগতে ফিরেছে। তখন তার আর শব্দ করবার উপায় নাই, নড়াচড়ার উপায় নেই। পাঁচদিক থেকে উড়ে আসা মাটির চাপে চোখের আলো নিভে আসছে। বুকের ভিতর থেকে প্রবল চাপে নাকমুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে গনগনে তাপ উত্তাপ। বুঝি বা এই উত্তাপের নামই জীবন।
অদূরের মাঠে তখন পড়েছিল ম্লান চাঁদের ম্যাটম্যাটে একটুখানি জ্যোত্সা। সেই জ্যোৎস্নায় সাদা আলখাল্লা পরা চারজন মানুষকে আদিলউদ্দিন তারপর দেখতে পায় সবুজ রঙের কাঁচা বাঁশের তৈরি চারদিক ভোলা একখান পালকি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। মানুষ চারজনের নিজস্ব আলোয় যেন মার খেয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো, মানুষ চারজনের নিজস্ব আলোয় যেন আদিলউদ্দিনের চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে অচিনলোকে পৌঁছুবার এক মায়াবী পথ।
মাটিয়ালরা তখনও তাদের নিজস্ব নিয়মে মাটি ফেলে যাচ্ছিল।
.
তুমি অহন বিড়ি খাও না?
ঘরের চাল টপকে উঠানে এসে পড়েছে একটুখানি ম্লান জ্যোত্স। এই জ্যোৎস্নায় বানেছার মুখ পরিষ্কার দেখা যায় না। তবু মুখটা দেখার চেষ্টা করল আজিজ। সে ফিরে আসার পর এখনও কি বানেছার মুখে লেগে আছে গভীর দুঃখকষ্ট, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর প্রিয়মানুষ উধাও হয়ে যাওয়ার বেদনা! নাকি এখন তার মুখ অন্যরকম! নাকি এখন তার মুখে এসে ভর করেছে অন্তর ভরে থাকা অভিমানের ছায়া!
বানেছা বসে আছে বড়ঘরের ওটায়। জায়গাটা ছেয়ে আছে আবছা অন্ধকারে। ম্লান জ্যোৎস্নাটুকু ওখানে পৌঁছায়নি। ঘরের চাল টপকে ছনছা ছাড়িয়ে অনেকখানি দূরে এসে পড়েছে।
বানেছার পিছনে ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ঘরে কোনও আলো নাই, শব্দ নাই। বহুদিন পর বাবাকে ফিরে পেয়ে পোলাপানরা আমোদ আহ্লাদ আবেগ আনন্দে ফেটে পড়েছিল। অনেকটা রাত তরি উঠানে বসে, ছুটাছুটি করে, গল্প গুজব হাসিমজায় বাড়িটা মাতিয়ে রেখেছিল। রান্নাচালায় বসে বানেছা তখন ব্যস্ত হাতে রান্না করছিল। ফিরে এসেই স্বামী চেয়েছে ভালভালাই খেতে। তয় কী খাওয়াবে সে! ঘরে তো তেমন কিছুই নাই।
তখনই মনে পড়েছে সের পাঁচেক চিনিগুড়ি চাউল আছে একটা জেরে। আর বছর দক্ষিণ পাইকসার এক শৌখিন গিরস্তবাড়ি থেকে চাউলটা এনেছিল আজিজ। সেই বাড়িতে গাওয়াল করতে গিয়া পুরানা মালছামান আর সের পাঁচেক চিনিগুড়ি চালের বিনিময়ে পিতলের মাঝারি সাইজের একখান কলসি দিতে হয়েছিল গিরস্তকে।
চাউলটা পোলাওয়ের জন্য অতুলনীয়। তয় পোলাও আজ তরি রান্না করা হয় নাই। মাঝখানে দুইটা ইদ গেল, চাউলটা হাতে আসার কিছুদিন পরেই ছিল কোরবানির ইদ, সেই ইদে গিরস্তঘরে পোলাও তেমন রান্না হয় না। হয় খিচুড়ি। খিচুড়ি আর সেঁউই (সেমাই) খেয়ে নামাজ পড়তে চলে যায় লোকে। ফিরে এসেই শুরু করে কোরবানি। তারপর তো দিন কাটে গোরু বরকির গোস্ত নিয়া। তিন-চারটা দিন গ্রামে শুধুই রান্না করা গোস্তের গন্ধ। চকের এদিক ওদিক গোরু বরকির হাড়গোড় আর নাড়িভুড়ির ভিতর থেকে বের হওয়া মলের দুর্গন্ধ। হাওয়াটাই যায় অন্যরকম হয়ে, পরিবেশটাই যায় অন্যরকম হয়ে।
আজিজ গাওয়াল কোরবানি দেয় না। কোরবানির দিন নামাজ পড়েই নাদের-হামেদকে নিয়ে চলে যায় মেন্দাবাড়ি। এনামুল ঢাকা আর মেদিনীমণ্ডল দুই জায়গাতেই কোরবানি। দেয়। নানার বাড়িতে খালার সম্মানে দেয় বড় এক ষাঁড়। গোরু বানানোর কাজে ওস্তাদ এমন লোকজনের লগে মিলেমিশে দুই ছেলেকে নিয়া আজিজও কাজটা করে। তারপর ভাগে পাওয়া গোস্তের লগে উপরি পায় উজরিটা (নাড়িভুড়ি)। সেই জিনিস গোড়ায় ভরে বাড়িতে এনে আবার পড়ে ওই নিয়া। উজরি পরিষ্কার করা, ধোয়া পাকলা, ম্যালা কাজ। তারপর দুইদিন ধরে চলে ওই জিনিস রান্না আর গরম করা। পোলাপানরা দিন দুইতিনেক থালভরতি মুড়ির লগে উজরি আর দুয়েক টুকরা গোস্ত, গোস্তের সুরা (ঝোল) খেয়েই আনন্দে থাকে। ওই ফাঁকে পোলাও রান্নার দরকারটা কী! তা ছাড়া পোলাও রান্না তো খরচেরও ব্যাপার! ঘি লাগবে। কোরবানির ইদে না হয় বড় গিরস্তবাড়ি থেকে পাওয়া গোরু বরকির গোস্ত দিয়া পোলাওটা খাওয়া হল! রোজার ইদে! রোজার ইদে তো পোলাও রাধলে মুরগিও লাগে! মুরগির গোস্ত ছাড়া পোলাও খাওয়ার অর্থই হয় না। যার লগে। আর মুরগি মানে কমপক্ষে দুইটা। দুইটা মুরগি ছাড়া এতগুলো পোলাপানের হবে নাকি! এক টুকরা করে দিলেও তো দুইটা মুরগি লাগে!
