হাজামবাড়ির নামার দিকে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে তছির মা, মেয়ে কোলে দেখছে আবদুলের বউ। আর নিজেদের বারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নাজুকে কোলে নিয়া অপলক চোখে দেখছে বানেছা।
চকে তখন নাদের আজিজকে বলল, ভারডা এহেনে থাউক, তুমি বাইত যাও বাবা।
আজিজ অবাক হল। কচ কী? তয় ভার নিবো কেডা?
আমরা নিতাছি।
কেমতে?
ওই যে কইলাম এহেকজনে এহেকখান জিনিস হাতে লমু। বেবাকতে একহান দুইহান কইরা লইলে ভার খালি অইয়া যাইবো।
হামেদ বলল, তারবাদে খালি ভারডা ভাজ কইরা লইবো নে দাদায়।
আজিজ মায়াবী গলায় বলল, এত কষ্টের কাম কী বাজান? আমিঐ লইয়া যাই!
ভাইদের লগে পরিও তখন গলা মিলিয়েছে। না বাবা আমরাঐ নেই। তুমি যে ফিরত আইছো এইডা আমগো ইদের লাহান আমোদ। আমগো ইট্টু আমোদ করতে দেও।
আইচ্ছা মা, আইচ্ছা। করো, যত ইচ্ছা আমোদ করো। তয় আমিও তোমাগো লগে একলগেঐ বাইত্তে যাই।
একটা-দুইটা করে জিনিস হাতে নিল ছেলেমেয়েরা। কেউ দুইখান কলসি দুইহাতে, কেউ বুকের কাছে একপাজা থালবাসন, কেউ ঘটিবাটি লোটা বদনা, কেউ হাঁড়ি পানদান কড়াই। ছোট্ট বদু নিয়েছে অ্যালুমিনিয়ামের একেবারেই হালকা একখান জগ। ভারটা ভজ করে নিয়েছে নাদের। বাবাকে মাঝখানে রেখে বিকাল শেষ হয়ে আসা আলোয় দলটা বাড়ির দিকে আগাতে লাগল।
বানেছা তখনও পাথরের মতন দাঁড়িয়ে আছে বারবাড়িতে। কী যেন কী কারণে একদমই কান্না পাচ্ছে না তার। যে মানুষটার জন্য হাহাকার করে গত একমাসে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সে, খাইতে পারে নাই, ঘুমাইতে পারে নাই, দুনিয়াদারি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল যার জন্য সেই মানুষের ফিরে আসার কথা শুনে আনন্দ উত্তেজনায় যেরকম তোলপাড় করে উঠেছিল বুক, সেই অনুভূতিটাও যেন এখন আর নাই। কোথা থেকে যেন তার মনের ভিতর এসে চেপে বসেছে আশ্চর্য এক অভিমান। সেই অভিমান যেন একেবারেই নিরাবেগ করে। রাখছে তাকে।
পোলাপানের লগে আজিজ তখন উঠে আসছে বারবাড়িতে। বানেছার সামনে দাঁড়িয়ে গভীর দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার মুখ দেইখাই আমি বুইজ্জা গেছি কেমুন আছিলা তুমি। এর লেইগা কথাডা আর জিগাইলাম না। তয় বহুত কথা আছে তোমার লগে। পরে কমুনে। মাগরিবের ওক্ত অইলো, অহন ঘাডে গিয়া অজু কইরা আইয়া। নমজ পড়ুম। এই ফাঁকে তুমি ইট্টু ভালভালাই রান্দ। পোলাপানের লগে বইয়া খামুনে।
বানেছা কথা বলল না। রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
.
কয়দিন ধরে সারারাত মাটি ফেলার কাজ চলছে সড়কে।
একদল নতুন মাটিয়াল নেওয়া হয়েছে, মাটিয়ালদের আরেকজন সর্দারও নেওয়া হয়েছে, তার নাম চানমিয়া। দিনেরবেলা সর্দারি করে হেকমত, সন্ধার পর থেকে করে চানমিয়া। আবার উলটাপালটাও হচ্ছে কোনও কোনওদিন। দিনের সর্দার দিনভর জিরায় কাজ করছে রাতেরবেলা, রাতের সর্দার করছে দিনে। মাটিয়ালরাও কেউ কেউ সময় বদলে যার যখন। ভাল লাগছে করছে। এই নিয়া আলী আমজাদের কোনও কথা নাই। যার যখন ইচ্ছা করুক তার কাজ হলেই হল। উপর থেকে চাপ আসছে, যত দ্রুত সম্ভব মাটির কাজ শেষ করতে হবে। তারপর শুরু হবে ইটবিছানোর কাজ, তারও পর পাকা করার কাজ। সেই ফাঁকে রাস্তার দুইপাশে লাগানো হবে গাছ।
অবশ্য ঢাকার দিক থেকে এইসব কাজ শুরুও হয়ে গেছে। ষোলোঘরের ওদিক তরি ইট বিছানো হয়ে গেছে, গাছ লাগানো হয়ে গেছে। গাড়ি ঘোড়াও চলতে শুরু করেছে। এখন। মাওয়া তরি মাটি ফেলার কাজ শেষ হলেই অন্যান্য কন্ট্রাক্টররা এসে অন্যান্য কাজ শুরু করে দেবে।
চব্বিশ ঘণ্টাই কাজ চালাতে হচ্ছে বলে বাড়িতে আলী আমজাদ আজকাল যাচ্ছেই না। মোটরসাইকেল নিয়া সাঁ সাঁ করে এদিক যাচ্ছে, ওদিক যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের পিছনে সব সময়ই কোনও না কোনও ইয়ারদোস্ত আছেই। দৌড়াদৌড়ি শেষ করে পথপাশের ঘরে বসে আড্ডা চাটামি করছে। মদ প্রতিদিনই চলছে। দিন নাই, রাত নাই, যখন ইচ্ছা। ফলে ঘরের চারপাশ মদের গন্ধে সারাক্ষণই মাতোয়ারা হয়ে আছে।
টাকা যেমন কামাচ্ছে লোকটা, ইয়ারদোস্তদের নিয়া খরচাও করছে মন্দ না। তবে ব্যবহারটা তার এখন যেন আগের চেয়েও খারাপ, আগের চেয়েও মারমুখী। মনমতো কিছু না হলে সর্দার মাটিয়াল কাউকেই ছাড়ছে না। আগে বকাবাজি করত প্রথমে, তারপর হয়তো থেমে যেত, নয়তো চড়-চাপড় লাথি গুঁতা দুয়েকটা মারত। এখন শুরুই করে মাইর দিয়া, বকাবাজি পরে।
এই কারণে সর্দার মাটিয়াল সবাই খুব সচেতন।
তবে রাতের কাজ দিনে, দিনের কাজ রাতে করা যাচ্ছে বলে কোনও কোনও মাটিয়াল এই সুযোগটা নিচ্ছে। পয়সা যে বেশি পাওয়া যাবে তা না, নিত্যদিনকার একঘেয়েমি কাটাবার জন্যই সময় বদলে নিচ্ছে কেউ কেউ।
আদিলউদ্দিনও শুরু করেছে আজ।
সর্দার চানমিয়া আর নতুন তাগড়া জোয়ান মাটিয়ালদের ভিড়ে নিজের ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে তার মতন করে কাজটা সে শুরু করেছে। সবাই নতুন, কেউ তাকে চিনে না, সে কাউকে চিনে না। তবু নিয়ম মতো মাটি ভরে দিচ্ছে গোড়ায়, মাথায় তুলে দিচ্ছে। জায়গামতন নিয়া ফেলে আসছে আদিলউদ্দিন। দুইখান হ্যাঁজাক জ্বলছে রাস্তার দুইপাশে। সাদা ম্যান্টেল থেকে আসছে সাঁ সাঁ শব্দ। সর্দার প্রায়ই পাম্প করছে হ্যাঁজাগে। এলাহি। কাণ্ড। কেউ কারও দিকে ফিরাও তাকাচ্ছে না।
