আজিজ গাওয়ালের বাড়ির পুব দিককার নামায় চার-পাঁচটা বউন্না হিজল আর মটকুরা গাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। তার তলায় একখণ্ড সবুজ ঘাসের জমিন। বিকালবেলা বাড়ির পোলাপান এইখানে গোল্লাছুট দাড়িয়াবান্ধা ধরাছি খেলে। আজিজ গাওয়াল উধাও হওয়ার পর মাসখানেক হল খেলাধুলায় উৎসাহ নাই কারও। বাড়িটা যেন আর মানুষের বাড়ি নাই, গোরস্থান হয়ে গেছে। বাড়ির মানুষগুলি যেন বেঁচে নাই, লাশ হয়ে গেছে।
বিকালবেলা আজ বাড়ির পোলাপান সব উঠানে। নাজুকে কোলে নিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বড়ঘরের ওটায় বসে আছে বানেছা। তার মুখটা ভাঙাচোরা, চোখের কোলে গাঢ় হয়ে পড়েছে কালি, মাথার চুলে তেল পড়ে না অনেকদিন, পরনের শাড়িটা বেশ ময়লা, সব মিলিয়ে বানেছা একেবারেই ভেঙে পড়া অসহায় মানুষ। উদাস চোখে কোনদিকে যে তাকিয়ে আছে বোঝা যায় না।
নাদের হামেদ পরি জরি বদু বসে আছে মায়ের চারপাশে। এতগুলি মানুষ একলগে তয় কারও মুখে কোনও কথা নাই। সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করা বদু তরি স্তব্ধ হয়ে গেছে।
গাছপালা বাড়ির উঠানপালান আর ঘরের চালে বিকালবেলার রোদ তখন নরম হতে শুরু করেছে। একটা কাক ডাকছে উেঁকিঘরের পিছনে। দুটো শালিকপাখি টুকটুক করে লাফাচ্ছে বারবাড়ির দিকে। সামান্য একটু হাওয়া আসছে দক্ষিণ দিক থেকে।
বাবা উধাও হওয়ার পর বিকালের দিকটায় হামেদের কখনও কখনও মনে হয়, আগে প্রতিদিন গাওয়াল করে বিকালের এই সময়টায় ফিরে আসত বাবা। চকপাথালে ভার কাঁধে দুলে দুলে হেঁটে পুবদিককার ভাঙন ঠেলে উঠত বাড়িতে। হয়তো আজও সেইভাবে ফিরে আসবে।
এই আশায় কোনও কোনওদিন বিকালে বাড়ির ওদিকটায় যায় হামেদ। বাড়ি থেকে নেমে যাওয়া ওটার মুখে পথ চেয়ে বসে থাকে। মনে হয় এই বুঝি বাবা ফিরল। ওই তো চকপাথালে ভার কাঁধে দেখা যাচ্ছে তাকে।
বাবা ফিরে না।
বিকাল ফুরিয়ে সন্ধ্যা হয়। চকমাঠ ডুবে যায় অন্ধকারে, বাবা ফিরে না।
কোনও কোনও সন্ধ্যায় ওঠে চাঁদ। চাঁদের আলোয় স্বপ্নের মতন মায়াবী হয় চক মাঠ আর পায়েচলা মেঠোপথ। সেই পথে কত মানুষ ফিরে, বাবা ফিরে না।
তবু হামেদ বসেই থাকে, তাকিয়েই থাকে।
আজও সেই আশায় নামার দিকটায় এল হামেদ। এসেই চকপাথালে তাদের বাড়িমুখী হেঁটে আসতে দেখল একজন মানুষকে। কাঁধে নতুন মালছামান ভরতি ভার, মানুষটি গাওয়াল মানুষ, দেখতে বাবার মতন, আবার বাবার মতন না। হাঁটাচলা অন্যরকম, পরনের কাপড় অন্যরকম। মাথায় টুপি, দূর থেকেও দেখা যায় মুখের দাড়িমোচ।
মানুষটা কে?
কয়েক পলকমাত্র খেয়াল করে দেখল হামেদ। তারপর প্রাণফাটানো একখান চিৎকার দিল। মাগো, ওমা, বাবায় আইছে। বাবায়।
তারপর দিকপাশ না তাকিয়ে একদৌড়ে চকের দিকে নেমে গেল।
হামেদের চিৎকারে তখন বাড়িতে বিশাল সাড়া পড়ে গেছে। পোলাপানরা তো বারবাড়ির দিকে ছুটে গেছেই, নাজুকে কোলে নিয়াই পাগলের মতন ছুটে গেছে বানেছা। তার বুক থেকে যে খসে পড়েছে শাড়ির আঁচল, উঠোনের ধুলামাটিতে যে লুটাচ্ছে, খেয়ালই করল না।
হামেদ তখন বাবার কাছে পৌঁছে গেছে। গিয়ে প্রথমেই দুইহাতে জড়িয়ে ধরেছে বাবাকে। তারপর কেঁদে ফেলেছে। তুমি কই গেছিলাগা বাবা? এতদিন আহো নাই ক্যা?
ছেলের এই আবেগ আগে কখনও দেখা হয় নাই আজিজের। বুকটা হু হু করে উঠল তার, চোখ ছলছল করে উঠল। ছেলের মাথায় ডানহাত রেখে মায়াবী গলায় বলল, কান্দি না বাজান, কান্দি না। এইত্তো আমি আইয়া পড়ছি।
তখন নাদের পরি জরি এমনকী বদুও ছুটে আসছে বাবার কাছে। বাবাকে ঘিরে ধরে। কত আবেগ, কত মমতা তাদের। কেউ বাবার হাতটা একটু ধরে, পেটটা পিঠটা একটু ধরে, বদু এসে লেগে থাকে বাবার হাঁটুর লগে। নাদেরের ইচ্ছা করে বাবার কাঁধের ভারটা নামিয়ে নিজের কাঁধে নেয়। তয় সেই সামর্থ্য এখনও তার হয়নি। তবু অন্য একটা উপায় সে বের করল। বলল, এত ভারী ভার কান্দে, তোমার তো বহুত কষ্ট অইতাছে বাবা। আমরা বেবাকতে একটা একটা কইরা জিনিস হাতে লই, তাইলে বাজার ভার কমবো।
কোন ফাঁকে যে ভারটা কাঁধ থেকে চকে নামিয়েছে আজিজ, খেয়াল নাই। পোলাপানের এত আবেগ কখনও দেখা হয় নাই বলে ভিতরটা তোলপাড় করছিল গভীর আবেগে। চোখ বেয়ে বারবার নামতে চাইছিল কান্না। নাদেরের কথা শুনে কান্নাটা আর ধরে রাখতে পারল না সে। একহাতে চোখ মুছে আরেক হাতে বুকের কাছে টেনে আনল ছেলের মাথা। না বাজান না, এত কষ্ট তোমগো করন লাগবো না। আমিঐ পারুম।
পরি জরিকে কাছে টানল আজিজ। কী গো মা’রা, কেমুন আছো তোমরা?
বাপের আদরে দুই মেয়েই তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পরি বলল, তোমার লেইগা একটা রাইতও ঘুমাইতে পারি নাই বাবা। একদিকদা মায় কানছে বিলাপ কইরা আরেক দিকদা আমি আর জরি কানছি চুপ্পে চুপ্পে। বাবা গো, তুমি কই গেছিলা গা? আমগো কথা তোমার মনে অয় নাই? আমগো লেইগা তোমার মায়া লাগে নাই বাবা?
আজিজ চোখ মুছতে মুছতে বলল, হ গো মা লাগছে। খুব মায়া লাগছে। দূরে থাইক্কা, এতদিন বাদে ফিরত আইয়া আমি আইজ বুজছি তোমরা আমারে কত মহব্বত করো মা, আমি তোমগো কত মহব্বত করি।
জরি কান্নাভরা নাক টেনে বলল, আর কোনওদিন এমুন কইরো না বাবা। আমগো ছাইড়া কোনওদিন চইলা যাইও না।
না গো মা, যামু না, কোনওদিনও যামু না। হারাডা জীবন তোমগো বুকে লইয়াঐ বাঁইচ্চা থাকুম। তোমরা দেইখো।
