তেমুন কিছু না। সড়কটা দেহি, খোলা চক দেহি। আর একখান কথা চিন্তা করি।
কী?
চিন্তা করি বাড়ির বাইরে এতবড় একখান দুনিয়া, হেই দুনিয়ায় পা হালানের ক্ষমতা নাই আমার। আমি যেন খাঁচায় আটকাইন্না পাখি। এই বাড়ির খাঁচার মইদ্যে আইটকা রইছি।
নিখিল আবার সিগ্রেটে টান দিল। অর্থ কী কথাডার?
অর্থ অইলো, এই বাইত্তে যেমতে আছি এমতে থাকতে আমার আর ভাল্লাগে না। রাস্তা আর চকের মিহি চাইয়া আমার খালি মনে অয় একদিন ওই চকের মাঝখানকার রাস্তা দিয়া বহুত দূরে কোনওহানে যামু গা আমি। আর কোনওদিন এই দেশে ফিরত আমু না।
ক্যা এমুন মনে অয় ক্যা তোমার?
কইতে পারি না। মাইনষের মন কত কিছুঐত্তো কয়!
ফিরোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উদাস হয়ে চকের দিকে তাকিয়ে রইল।
এ বাড়ির উঠানপালানে পড়ে থাকা রোদ এখন ঘরের চালে আর গাছপালার মাথার দিকে উঠতে শুরু করেছে। রোদের রং হয়েছে গেন্দা ফুলের পাপড়ির মতন। চকের ধানিজমি আর খোলা মাঠে রোদ বেশ মোলায়েম। সেদিকে তাকিয়ে সিগ্রেটে আরেকটা টান দিয়ে নিখিল বলল, হোনো ফিরোজা, তুমি যে কইলা তুমি গরিব ঘরের মাইয়া, কোন গেরামের গরিব ঘর তোমগো?
নিখিলের দিকে তাকাল না ফিরোজা। চকের দিকে তাকিয়েই বলল, আমগো গেরাম অইলো গাদিঘাট। গাদিঘাট চিনেন?
চিনুম না ক্যা? বিক্রমপুরের কোন মাইনষে গাদিঘাট না চিনে? গাদিঘাটের নাম না হোনছে এমুন মানুষ বিক্রমপুরে নাই। মিষ্টি কোমড়ের লেইগা বিখ্যাত অইলো গাদিঘাট। হেই গেরামের খেতখোলায় খালি মিষ্টি কোমড় বোনে গিরস্তে। একমন দেড়মন ওজনের এহেকখান কোমড় হয়। এক কোমড়ে এক বাড়ির বিয়াশাদির মেজবানি হইয়া যায়। হেই কোমড়ের নাম ভোজকোমড়। ভোজ খাওনের কোমড়।
হ, হেই গাদিঘাটে আমগো বাড়ি।
তোমার বাপে করে কী? গিরস্তি?
গিরস্তিঐ করে, তয় নিজের জমিন নাই। অন্যের জমিন বর্গা চোয়।
ভাইবইন কয়জন তোমার?
পাঁচবইন তিনভাই। আমার বড় দুইবইন দুইভাই। দুই বইনের বিয়া দিয়া বাবায় গেছে ফতুর অইয়া। বড়ভাই দুইডা বাপের লগে গিরস্তি করে। ছোড একটা বইন আমগো গেরামে এক বাইত্তে আমার লাহান থাকে। একদোম ছোড বইনডা ইসকুলে পড়ে, কেলাস ফোরে। ছোড ভাইডা পড়ে সিকসে। বড় সংসার তো! সংসার চলে বহুত কষ্টে। কোনও কোনওদিন না খাইয়াও থাকন লাগে। এর লেইগা বাবায় আমারে এই বাইত্তে দিয়া দিছে।
গাদিঘাট থিকা মেদিনমণ্ডল ম্যালা দূর। এত দূরের এই বাইত্তে কোন পরিচয়ে আইলা তুমি?
ফিরোজা ম্লান হাসল। অ্যারা আমগো আত্মীয় অয়। কাছের আত্মীয়। আমরা গরিব দেইক্কা আত্মীয় পরিচয় দেয় না। তয় বাবার লগে মন্তাজমামার কথা অইছে হের মায় যতদিন আছে হেতদিন তার মা’রে আমি দেহুম। আমার বচ্ছরের কাপড়চোপড় বেবাক হেরা দিবো, আর নানি মইরা গেলে মন্তাজমামায় ভাল পোলা দেইক্কা ধুমধাম কইরা আমারে বিয়া দিয়া দিবো।
সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে নামার দিকে সিগ্রেটের শেষ অংশ ছুঁড়ে ফেলল নিখিল। তয় তো ভালঐ। তয় আর তোমার চিন্তা কী?
এবার খুবই রহস্যময় একখান হাসি হাসল ফিরোজা। চিন্তা আছে।
কী?
আমি একজনরে পছন্দ করি। আমি চাই আমার বিয়াডা হের লগে অউক।
কও কী? কারে, কারে পছন্দ করো তুমি?
হেইডা আপনেরে আমি কমু না।
ঠিক এসময় মন্তাজের বড়ঘর থেকে তার মায়ের জড়ানো গলার চিৎকার ভেসে এল। তারস্বরে ফিরোজাকে ডাকছে বুড়ি। অন্য যে কারও কাছে এই চিৎকারটা গোঙানির মতন বীভৎস মনে হবে, তয় ফিরোজা এই ডাকের অর্থ জানে। তার নাম ধরেই ডাকছে বুড়ি।
ডাক শুনে ফিরোজা চঞ্চল হল। ওই যে নানি ডাক পাড়তাছে। আমি যাই।
বলেই বড়ঘরের দিকে দৌড় দিতে গেল ফিরোজা, দৌড় দিতে গিয়েই কী ভেবে থামল। একটা হাত জামগাছটার গায়ে রেখে অপূর্ব এক ভঙ্গিমায় বলল, আমি যারে পছন্দ করি, যার কাছে বিয়া বইতে চাই তার কথা আপনেরে একদিন কমু।
তারপর দৌড়ে বড়ঘরের দিকে চলে গেল।
নিখিলের বুকের ভিতর তখন একেবারেই অচেনা এক আবেশ খেলা করছে। মন ছেয়ে গেছে আশ্চর্য এক অনুভূতিতে। আজকের আগে কখনও এই অনুভূতি হয়নি তার। কাকে পছন্দ করে ফিরোজা? কার কাছে বিয়া বসতে চায়? সে-কথা অন্য কাউকে না বলে তাকেই কেন বলবে একদিন? তা হলে ফিরোজার মনের কোনও এককোণে কি তার জন্যও একটুখানি জায়গা হয়েছে!
এসব ভাবতে ভাবতে মান্নান মাওলানার সীমানায় না ফিরে জামতলার ওদিককার ভাঙন দিয়ে উত্তরের চকে নেমে গেল নিখিল। একেবারেই শেষ হওয়া বিকালের রোদে তখন পাকা পেঁপের রং ধরেছে। যখন তখন এই রোদ মুছে অন্ধকার নামবে। এর মধ্যেই ঝিঁঝিপোকারা ডাকতে শুরু করছে।
.
চৈত্রমাসের শেষ দিককার এক বিকালে তামা পিতল কাঁসা অ্যালুমিনিয়ামের নানান পদের মালছামান ভরতি ভার কাঁধে একজন মানুষ চকপাথালে আস্তে ধীরে হেঁটে আজিজ গাওয়ালের বাড়ির দিকে আগাতে লাগল। তার চলাচল গাওয়ালদের মতন অস্থির ধরনের না। ভার কাঁধে গাওয়ালরা যেমন ঘোড়ার মতন ছোটে, মুখে ক্লান্তির হুমহাম শব্দ করে, গাওয়াল বলতে যা বোঝায়, আজিজ গাওয়ালকে দেখে দেশগ্রামের লোক গাওয়াল মানুষের যে ছবি মনের ভিতর ধরে রেখেছে, মানুষটির চালচলন তেমন না। ধীর শান্ত নরম গতিতে বিকালের রোদ ভেঙে হাঁটছিল। মাথায় সাদা গোল টুপি, পরনে গেরুয়া রঙের পরিষ্কার ফতুয়া, গাঢ় সবুজ রঙের লুঙ্গি সামান্য উঁচু করে পরা, যেন পথের ধুলায় ময়লা না হয়। মুখে মানুষটার মাসখানেকের দাড়ি গোঁফ, খানে খানে সাদা খানে খানে কালো। চোখে নির্মল নিরীহ দৃষ্টি আর চোখের কোলে সুর্মা। দূর থেকে দেখেও মানুষটাকে খুবই পাক পবিত্র আর ধার্মিক মনে হচ্ছিল।
