ফিরোজা অবাক হওয়ার ভান করল। ক্যা, বাইত্তে আইয়া নিজেগো ঘরে না গিয়া হেয় আমাগো ঘরে আইয়া বইয়া থাকবো ক্যা?
নিখিল হাসল। তুমি তো জানঐ আতাহারে তোমারে খুব পছন্দ করে।
হ জানি, তয় আমি তারে পছন্দ করি না।
ক্যা?
হের লাহান মাইনষেরে পছন্দ কইরা আমার কোনও লাব নাই।
কীয়ের লাব?
আপনে বোজেন নাই কীয়ের লাব?
না।
বোজন উচিত আছিলো।
নিখিল আবার হাসল। বুজি নাই যহন তহন আর কী করন যাইবো, বুজাইয়া কও।
হেয় অইলো বিরাট নামকরা মাইনষের পোলা। টেকাপয়সা জাগাজমিনের আকাল নাই। আমি যুদি হেরে পছন্দ করি, আর যাই করুক হেয় তো আমারে বিয়া করবো না।
নিখিল আবারও হাসল। করতেও পারে। রাজার পোলায়ও ভিকারির মাইয়ারে বিয়া করে?
হেইদিন আইজ কাইল আর নাই।
আছে। পেরেম মহব্বত থাকলে ধনী গরিব দিয়া কিছু অয় না।
আতাহার দাদার যে আরেকজনের লগে পেরেম আছে।
কার লগে?
এবার ফিরোজাও হাসল। ক্যান আমার মোক থিকা হোনতে চান? আপনে তো বেবাকঐ জানেন। বিয়া করনের মতলব থাকলে হেয় তো হের ভাবিছাবরেঐ করতে পারে। ভাবিছাবে অহনও কী সোন্দর! অহনও এক্কেরে আবিয়াত মাইয়াগো লাহান। হেমুন মাইয়ারেঐ যে। বিয়া করে না হেয় আমার লাহান কামের ছেমড়িরে মইরা গেলেও বিয়া করবো না। আতাহার দাদায় বহুত চালাক। ভোমরার লাহান। একবার এই ফুলে যাইবো, মধু খাইবো। আবার অন্য ফুলে যাইবো, মধু খাইবো। কোনও ফুলেঐ হারাজীবন বইয়া থাকবো না।
ফিরোজার কথা শুনে নিখিল হকচকিয়ে গেল। কথা বলতে যেন ভুলে গেল। হাঁ করে ফিরোজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসল ফিরোজা। কী অইলো? এমতে চাইয়া রইছেন ক্যা?
নিজেকে সামলাল নিখিল। তোমার কথা হুইন্না।
ক্যা, খারাপ কিছু কইছিনি আমি?
না খারাপ কও নাই। সত্য কথা কইছো। আমি খালি চিন্তা করতাছি তুমি এত কিছু বোজলা কেমতে?
মাইয়ামানুষরা দুনিয়ার বেবাক পুরুষপোলার চকু দেইখাঐ বোজে হেয় কী চায়? আতাহার দাদার মতলব, হের বাপের মতলব বেবাকঐ আমি বুজি।
তোমার মোক দেইক্কা কইলাম মনে অয় না তুমি এত কিছু বোজো।
মোক দেইক্কা মানুষ চিনন যায় না। কার ভিতরে কী, মোক দেইক্কা কেমতে বোজবেন?
হেইডা ঠিক। তয় মোক দেইক্কাঐ কইলাম মাইনষের লগে মাইনষের ভাব ভালবাসা অয়।
হ হেইডা ঠিক। মোক দেইক্কাঐ মাইনষে মাইনষের পয়লা বিচার করে। তারবাদে ঠক খায়।
নিখিল হাসল। বাপ রে, তুমি তো দেহি এক্কেরেঐ অন্যপদের মাইয়া। তোমার মোক দেইক্কা তোমারে আমি যেমুন ভাবছি তুমি দিহি তার থিকা পুরাপুরি আলাদা।
একপলক নিখিলের মুখের দিকে তাকিয়েই উদাস হল ফিরোজা। আমরা গরিব মাইয়া দাদা। বহুত হিসাবকিতাব কইরা, চিন্তাভাবনা কইরা আমগো চলতে অয়। আমি জানি আমগো লাহান মাইয়ার শইলখানঐ আসল, শইলখানঐ সম্পদ। এই সম্পদ যুদি একবার নষ্ট অইয়া যায় তাইলে আর কিছু থাকলো না। বিয়াশাদি তো অইবোঐ না, আউজকা একজনে কাউলকা আরেকজনে খাবলাইয়া খাবলাইয়া খাইবো। মাইয়া মাইনষের নষ্ট শইল। মরা গোরুর লাহান। হকুনের লাহান বেডারা খালি ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া খায়। খাইতে খাইতে ছিবড়া কইরা হালাইয়া দেয়। কুনে যেমুন গোস্ত খাইতে খাইতে মরা গোরুর কঙ্কাল বাইর কইরা তারবাদে উড়াল দেয় আশমানে, বেডারাও হেমুন করে।
ফিরোজার কথা শুনে নিখিল হতবাক। আরে এ তো আশ্চর্য মেয়ে! বাইরে থেকে দেখে। বোঝা যায় না কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুবই বুদ্ধিমতী। আতাহারকে নিয়া ঠিক ভাবনাটাই সে ভাবছে। আর ফিরোজার কথাবার্তার ধরনে মেয়েটাকে যে হঠাৎ করেই কী ভাল লেগে গেল। নিখিলের! আজ পর্যন্ত কোনও মেয়েকে এমন ভাল তার লাগে নাই।
নিখিলের ইচ্ছা হল যতক্ষণ সম্ভব এই নির্জনে দাঁড়িয়ে ফিরোজার লগে গল্প করে। আরও অনেক কথা শোনে ফিরোজার কাছ থেকে। সে যে বলল সে গরিব ঘরের মেয়ে, কেমন গরিব ঘর তাদের! কোন গ্রামে বাড়ি! মা বাবা ভাই বোনের কী বিত্তান্ত সবই জানতে ইচ্ছা করছে নিখিলের।
সেই কথা কীভাবে শুরু করা যায়?
ছোট্ট করে গলা খাকারি দিল নিখিল। এতক্ষন ধইরা তুমি যে এহেনে খাড়ইয়া আমার লগে কথা কইতাছো, তোমার কোনও অসুবিদা অইতাছে না?
ফিরোজা অবাক হল। অবাক হলে তার নাকের দুইপাশে ছোট্ট ভাজ পড়ে, নাকের পাটা সামান্য কুঞ্চিত হয়। মিষ্টি মুখটা তাতে আরও মিষ্টি দেখায়। ফিরোজার এই সৌন্দর্য। আজকের আগে দেখে নাই নিখিল। তার কথা শুনে ফিরোজা যে বলল, কীয়ের অসুবিদা, সে-কথা যেন শুনতেই পেল না। মুগ্ধ চোখে ফিরোজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফিরোজা হাসল। কীয়ের অসুবিদা কইলেন না? নিখিল থতমত খেল। না, ওই যে মন্তাজকাকার মায়, তারে ছাইড়া এতক্ষুন ধইরা তুমি বাইরে! হেয় তোমারে বিচড়াইবো না?
না। দোফরের পর থিকা বেদম ঘুম ঘুমাইতাছে হেয়।
ক্যা রাইত্রে ঘুমায় নাই?
কাইল রাইত্রে ঘোমডা পুরা অয় নাই। কেমুন উসপিস উসপিস করছে। হেই রাইত্রের ঘোম অহন দিতাছে।
আর এই ফাঁকে তুমি আইয়া খাড়ই রইছো জামগাছ তলায়!
হ। এই জাগাটায় খাড়ই থাকতে আমার বহুত ভাল্লাগে।
পাঞ্জাবির ডান দিককার পকেট থেকে হাতিয়ে হাতিয়ে বাঁকাচোরা হয়ে যাওয়া একটা স্টার সিগ্রেট বের করল নিখিল। কয়েকটা মাত্র কাঠি আছে এমন একখান ম্যাচ বের করল। তারপর সিগ্রেট ধরিয়ে বড় করে একটা টান দিয়ে বলল, এহেনে খাড়ইয়া কী দেহো তুমি?
