আজ নিয়া খুব বেশিদিনি যে কাছ থেকে নিখিলকে ফিরোজা দেখছে তা না। দূর থেকে মান্নান মাওলানার বাংলাঘরে আতাহারের লগে আনাগোনা করতে দেখছে অনেকদিন ধরেই। তখন ফিরোজার চোখে এতটা পড়েনি নিখিল। কিছুদিন ধরে পড়ছে। কারণ কিছুদিন ধরে কোনও না কোনও অছিলায় মন্তাজদের বড়ঘরে আসছে আতাহার। লগে বেশির ভাগ দিনই আছে নিখিল। আতাহারের বন্ধু হওয়ার পরও নিখিলের লগে আতাহারের ব্যবহার চাকর বাকরের মতন। যখন তখন মানুষের সামনে ধমক দিচ্ছে, গালাগাল করছে, অপমানের একসা। তবু যেন ওসব আচরণ গায়ে মাখে না নিখিল। দুইদিন তার সামনেই মালাউনের বাচ্চা বলে গাল দিল। সেই গাল শুনে বিষণ্ণ মুখ আরও বিষণ্ণ হল নিখিলের, তারপরই মুখটা হাসিহাসি করল। যেন গালটা সে শুনতে পায়নি বা শুনেও ভুলে গেছে।
ওই সময়কার নিখিলের মুখ দেখে মায়া লেগেছে ফিরোজার!
কিন্তু আতাহার কেন আজকাল ঘনঘন আসছে তাদের ঘরে, মন্তাজের বুড়িমাকে দেখার অছিলায়, তার ভালমন্দ খোঁজখবর নেওয়ার অছিলায় সে যে আসলে ফিরোজার কাছেই আসছে, ফিরোজাকেই পেতে চাইছে এসব মেয়েমানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা দিয়েই বুঝে নিয়েছে ফিরোজা। ছেলের মতন একই উদ্দেশ্যে মান্নান মাওলানাও যে সেদিন মন্তাজের বড়ঘরে এসে ঢুকেছিল, অনেকদিন ধরেই যে মাওলানা হুজুর চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছে ফিরোজার ব্যাপারে, সবই ফিরোজা টের পাচ্ছে। এই নিয়া মুখে কাউকে কিছু বলতে পারছে না। যেমন করে পারে নিজেকে রক্ষা করে চলেছে। আতাহার এলেই তাকে চা করে খাওয়াচ্ছে। হাসিহাসি মুখে কথা বলে শরীর থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। আর মান্নান। মাওলানাকে সেদিন চিরতরে ফিরিয়েছে তার ছেলের এই ঘরে আসাযাওয়া নিয়া। কথায় কথায় এমনভাবে আতাহারের কথা বলেছে শুনে মান্নান মাওলানা ভেবেছেন এই লাইনে তার এলেমদার মাজারো পোলা ঠিকই অনেকদূর আগায়া গেছে। পোলায় যে মেয়ের ক্ষেত্রে এতদূর আগাইছে বাপ হয়ে সেই একই মেয়ের ক্ষেত্রে তার আগানো ঠিক হবে না। তবু শেষ পর্যন্ত নূরজাহানকে নিয়ে একখানা অশ্লীল কথা বলে মন্তাজের বড়ঘর থেকে মান্নান মাওলানা বেরিয়ে ছিলেন।
নূরজাহানের লগে চিন পরিচয় নাই ফিরোজার। তবে হুজুরের মুখে ছ্যাপ ছিটিয়ে যে আলোড়ন গ্রামে সে তুলেছে সে-কথা তার কানে আসছে। সেদিন হুজুরের মুখে নূরজাহানের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার যে ধুরন্ধর ছায়া ফিরোজা দেখেছে ওই ভাবনায় রাতের ঘুমটা তার ঠিকঠাক মতো হয় নাই। বারবার মনে হয়েছে মান্নান মাওলানা যেরকম মানুষ ঠিকই মেয়েটিকে সে দেখে নিবে। কোনও না কোনও কায়দায় যা বলেছেন ঠিক ওই কাজটাই মেয়েটার লগে করবেন। সত্যি যদি কোনও মেয়ের লগে ওই কাজটা করা হয়, তা হলে তার আর থাকল কী! সবই তো গেল! বিয়ে হলে স্বামীকে সে দেবে কী?
এই একই ভয়ে আতাহারের কাছ থেকে প্রাণপণে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ফিরোজা। মান্নান মাওলানাকে ছেলের কথা বলে ফিরিয়েছে, আতাহারকে ফিরাবে কার কথা বলে!
নিখিলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই যেন সেই মানুষটার সন্ধান আজ বিকালে পেয়ে গেল ফিরোজা। আতাহারকে কি যে কোনও কায়দায় একদিন সে জানিয়ে দিবে, আমার মিহি আর আউগাইয়েন না আতাহার দাদা। আপনের দোস্ত নিখিলের লগে আমার অইয়া গেছে। দোস্ত অইয়া দোস্তের মনের মাইনষের মিহি আউগান ঠিক অইবো না।
তয় নিখিল যে হিন্দু! হিন্দু পোলার লগে কি মোসলমান মাইয়ার এইসব হয়?
মনে মনে হাসল ফিরোজা। সত্যঐ তো আর অইতাছে না! এইডা তো মিছা! আতাহার দাদারে ফিরানের লেইগা।
ফিরোজার মতো নিখিলও তাকিয়ে ছিল ফিরোজার মুখের দিকে। শ্যামলা গোলগাল মুখের এই মেয়েটিকে তার ভালই লাগে। লাল সবুজের ডুরে শাড়ি আজ পরেছে সে। ঘটিহাতা ছিট কাপড়ের ব্লাউজ পরেছে। লালফিতা দিয়া দুইখান বেণি করেছে, নাকে নাকফুল আছে, চোখে কাজল দিছে, সব মিলায় ভাল লাগছে ফিরোজাকে দেখতে।
কিন্তু কিছু ভেবে ফিরোজা কি মনে মনে হাসছে!
মনে মনে হাসার সময় নিজের অজান্তেই মানুষের মুখে সেই হাসির আভা ফুটে ওঠে। ফিরোজার মুখেও ফুটেছিল। এই ব্যাপারটা খেয়াল করল নিখিল। বলল, কী অইছে তোমার?
ফিরোজা চমকাল। কী অইবো?
আমার মনে অয় কিছু অইছে।
কেমতে বোজলেন?
তোমার মোক দেইক্কা।
ক্যা কী অইছে আমার মোকে?
মোক দেইক্কা মনে অইতাছে তুমি জানি মনে মনে কী চিন্তা কইরা হাসতাছো!
ফিরোজা চমকাল। আল্লা, কেমতে কইলেন আপনে?
নিখিল হাসল। ওই যে কইলাম তোমার মোক দেইক্কা মনে অইলো।
ঠিকঐ মনে অইছে। আসলেই আমি হাসতাছিলাম।
ক্যা, আমারে এহেনে দেইক্কা?
ফিরোজা ভুরু কোঁচকাল। ক্যা আপনেরে দেইক্কা হাসুম ক্যা?
একলা একলা তোমাগো মিহি আইছি!
হেতে কী অইছে?
না তুমি অন্যকিছু মনে করতে পারো।
অন্যকিছু কী মনে করুম?
মনে করতে পারো আমি কোনও মতলবে আইছি।
মতলবে আহেন নাই?
নিখিল চমকাল। না, কী মতলবে আমু?
তয় আইছেন ক্যা?
আইছিলাম আসলে আতাহারের কাছে। আইজ হারাদিন অর লগে দেহা অয় নাই। কনটেকদার সাবে আলম সুরুজ অরা কইলো দেইক্কা আয় আতাহার বাইত্তে আছেনি, থাকলে ডাইক্কা লইয়ায়। আইয়া হাসুর কাছে হোনলাম অরা বেবাকতে মাজারো বইনের বাইত্তে দাওত খাইতে গেছে। তারবাদে ফিরত যাওনের সময় ভাবলাম, কী জানি আতাহার অর বইনের বাইত্তে থিকা আগেঐ আইয়া পড়ল কি না, আইয়া তোমগো ঘরে বইয়া রইলো। কি না!
