হাসুর কথা শুনে অপলক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রহিমা। আইজ আমি বেবাক কিছু বোজলাম। এই হগল কথাঐ তর কাছ থিকা আমি জানতে চাইছি।
হাসু আরেক লোকমা ভাত মুখে দিল। ওই বাইত্তে এহেকটা রাইত অয়, আর আমার আজাব শুরু অয়। আমি হুই রান্নঘরে। হেই ঘরের ঝাঁপহান আলগা। ইট্টুহানি ঠেলা দিয়াঐ ঘরে হান্দন যায়। পয়লা পয়লা বাড়ির আম্মারে কইছি, আম্মা, এই ঘরডায় আমারে রাইকেন না, আমার ঘুম আহে না, অসুবিদা অয়। হেয় আমার কথা হোনে নাই। কয়, বাড়ির বান্দিরে রান্নঘরে হুইতে দিমু না তো কি বড়ঘরের পালঙ্কে হুইতে দিমু? ওই ঘরে তর থাকন লাগবো। তারবাদে বাড়ির বেডাগো কথাও তারে আমি ভাইঙ্গা চুইরা কইছি, কেঐর নামনোম কই নাই, হুইন্না হেয় আমারে কইল, বেডারা অমুন। বেডাগো হাত থিকা নিজেরে বাঁচানোর কাম অইলো মাইয়াগো। তুইও বাঁচাইয়া চলবি। তয় তুমি আমারে কও তো ফুবু, কয়জনের হাত থিকা, কতদিন তুমি নিজেকের বাঁচাইবা?
রহিমা বলল, হ। এই হগল চিন্তা এই বাইত্তে আইয়া পয়লা পয়লা আমিও করছি। তারবাদে বেবাক চিন্তা বাদ দিয়া হুজুরের কথায় রাজি অইয়া গেছি। অহন যেই ঘরে তুই আমি থাকি, পয়লা থিকাঐ ওই ঘরে থাকি আমি। হুজুরের কথায় ভিতর থিকা দুয়ারের খিল আলগা কইরা রাকতাম। রাইত দোরে চোরের লাহান হুজুরে তার বউর পাশ থিকা উইট্টা আইয়া আমার ঘরে হানতো। নিজের শইল্যের সাদ আহ্লাদ মিটাইতো। এই কইরা কইরা দিন গেল।
খাওয়া শেষ করে মগের পানিতে থালাতেই হাত ধুতে লাগল রহিমা।
হাসুর থালায় তখনও সামান্য ভাত রয়ে গেছে। কাচিয়ে কুচিয়ে সেই ভাত লোকমা করে মুখে দিল হাসু। আমি তোমার কথা বুজছি ফুবু। তয় তোমার আর আমার তো একদশা না। আমি তো বিয়াতো মাইয়া না। আমি অইলাম আবিয়াত মাইয়া। নিজের পেট আমি চিনি না। আর যেই বেডারা আমার কাছে আইতো হেরা তো কেঐ আমারে বিয়া। করবো না! কামকাইজ সাইরা যাইবো গা। আমার পেট অইয়া গেলে যাগ কারণে পেট হইব তারাঐ আবার আমার বিচার করবো। খারাপ মাইয়া কইয়া বাইত থিকা খেদাইবো আমারে। এই হগল চিন্তা কইরা বেডাগো হাত থিকা আমি খালি নিজেরে বাঁচাইছি। তয় কতদিন এমুন বাঁচান বাঁচান যায় কও? আইজ কয় বছর ধইরা রোজ রাইত্রে বিছানায় হুইয়া হুইয়া আমি খালি চিন্তা করি, মাইয়াছেইলা থিকা কোনওরকমে আমি যদি বেড়া অইয়া যাইতে পারতাম, আমার গলার আওয়াজখান অইতো বেডাগো লাহান, হাত পাও, বুক মোক অইতো বেডাগো লাহান, আমার পোলাপান অওনের জাগাড়া অইতে বেড়াগো। লাহান তয় বেডারা আমারে এমুন জ্বালান জ্বালাইতে পারতো না। রাইত ভর আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে পারতাম।
ভাত শেষ করে এক ঢোক পানি খেল হাসু। তারপর মগের পানিতে রহিমার মতো করে থালায় হাত ধুতে ধুতে বলল, তারপর থিকা আমি কইলাম সত্যঐ বেড়াগো লাহান অইতে লাগলাম ফুকু, খ্যাল করছ?
আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে রহিমা বলল, হ। তুই তো অহন বেডাঐতর হাত পাও গলার আওজ বেবাকঐ বেডাগো লাহান। বুকও উঁচা না, বেডাগো লাহান।
ফুফুর মতো করে হাসুও আঁচলে মুখ মুছল। তারপর হাসল। হ, অহন খালি পোলাপান অওনের জাগাহান বেড়াগো লাহান অইয়া গেলেঐ অয়।
রহিমা ধমক দিল ভাইঝিকে। ধুর ছেমড়ি, কী কচ?
হ ফুবু, ভাল কথা কই। তুমি দেকবা আমি একদিন সত্য সত্যই বেডা অইয়া যামু। মাইয়াছেইলা আমি আর থাকুম না। মাইনষের কোনও কোনও কথা আল্লায় কইলাম সত্য সত্যঐ হোনে। কহেক বচ্ছর ধইরা আমার কথা মনে অয় হোনতাছে। এর লেইগাঐ ইট্টু। ইট্টু কইরা বেডাগো লাহান অইয়া যাইতাছি আমি। একদিন দেকবা পুরাপুরিঐ বেডা অইয়া গেছি।
রহিমা আর কথা বলল না। তার হাসুর আর হাফিজদ্দির আইট্টা (এঁটো) থালা বাসন নিয়া পুকুরঘাটের দিকে চলে গেল। দুইটো কাক তখন রান্নাঘরের ছনছায় নেমে চঞ্চল চোখে চারদিকে তাকিয়ে খাদ্য খুঁজছিল।
.
বিকালবেলা বড়ঘরের পিছন দিককার জামতলায় দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে চকের দিকে তাকিয়ে আছে ফিরোজা। এখান থেকে পশ্চিমে ঢাকা থেকে আসা বড় সড়কের অনেকখানি দেখা যায়, পুব-উত্তরে দেখা যায় তালুকদার বাড়ির গাছপালা, গাছপালার আড়ালে দাঁড়ানো দালান কোঠার কার্নিশের উপরকার অশ্বথের চারা। বাড়ির গা ঘেঁষে চলে যাওয়া খালের বাঁক দেখা যায়, সীতারামপুরের বাঁকে ছোট্ট একখান টংঘরের দোকান, দোকানের ওপাশে কারিকরদের বাড়িঘর, সব পরিষ্কার দেখা যায় এখান থেকে।
এই বাড়ি থেকে পোয়া মাইল দূরত্বে এইসব দৃশ্যাবলি। মাঝখানে চক। চকে এখন ইরির চাষ হয়। জমির আল বেঁধে পানি আটকে ইরি রুয়েছে কৃষকরা। ফলে চক এখন গাঢ় সবুজ। এই সবুজের দিকে তাকিয়ে মন উদাস হচ্ছিল ফিরোজার।
ঠিক এই সময় ভেতর বাড়ির দিক থেকে তার পাশে এসে দাঁড়াল নিখিল। কী করো ফিরোজা?
আচমকা পিঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে একজন মানুষ, কথাও বলছে, শুনে উদাস ছিল বলেই যেন একটু বেশি চমকাল ফিরোজা। চমকে মানুষটার মুখের দিকে তাকাল। ও নিখিলদাদায়! আমি ডরাই গেছিলাম।
নিখিল হাসল। ক্যা, ডরাইলা ক্যা?
আথকা মাইনষের পিছে মাইনষে আইয়া খাড়ইলে না ডরাইয়া উপায় আছে?
তারপরই যেন নিখিলকে খেয়াল করে দেখল ফিরোজা। নিখিলের পরনে আজ নীল রঙের নতুন লুঙ্গি। লুঙ্গির উপর পরেছে সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির হাতা কনুই তরি গুটানো। বোধহয় আজই চুল কাটিয়েছে, দাড়ি মোচ কামিয়েছে। তারপর সাবান দিয়া হয়তো গোসল করছে। সব মিলিয়ে তরতাজা, প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে নিখিলকে। এমনিতে বেশ লম্বা, ছিপছিপা শরীরের নিখিলের গায়ের রং কালো। তবে মুখটা মায়াবী, নিরীহ ধরনের, কেমন একটু বিষণ্ণতাও আছে মুখে। খানিক তাকিয়ে থাকলেই মায়া লাগে।
