শস্যের চকেমাঠেও চলে এই একই ধরনের কাজ। গিরস্তের সোনার ধান চোরের মতো এসে কেটে নেয় বাবুই পাখি আর মেঠো ইঁদুর। মেঠো ইঁদুরের গর্তে এসে চোরের মতন ঢুকে তাদেরকে খেয়ে শেষ করে দাঁড়াস সাপ। বনের বাঘ চোরের মতন এসে ধরে খায় হরিণ, তার ফেলে রাখা খাবার আবার চোরের মতন করেই এসে খেয়ে যায় শিয়াল হায়েনা। পানির তলার মাছ, মাছকে জানান না দিয়ে শিকার করে জেলেরা, সেই মাছেরা পেটের আহার জোটাতে শিকার করে অন্য মাছেদেরকে। শিকারও তো এক ধরনের চুরিই। জগতের সব প্রাণীই এক অর্থে চোর। আর এই চৌর্যবৃত্তির মূলে আছে ক্ষুধা, কোনও না কোনও রকমের ক্ষুধা।
এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের বাড়িতে এসে উঠল মুকসেদ। তখন চাঁদ নেমে গেছে পশ্চিমে।
.
হাফিজদ্দি খেয়ে চলে যাওয়ার পর আজ দুপুরের ভাত খেতে বসল রহিমা আর হাসু। রান্নাঘরের মেঝেতে থালাভরতি ভাততরকারি আর টিনের মগে দুই মগ পানি নিয়ে সিঁড়ি পেতে মুখামুখি বসেছে ফুফু-ভাইজি। আজ একটু সময় নিয়ে আয়েশ করে খেতে কোনও অসুবিধা নাই। কারণ বাড়িতে মান্নান মাওলানা, তহুরা বেগম বা আতাহার কেউ নাই। বড়ঘর তালা দিয়ে তারা গেছে মেজোমেয়ে মদিনার শ্বশুরবাড়িতে দাওয়াত খেতে। দুপুরের খাওয়ার দাওয়াত। এজন্য সকালের নাস্তা করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তারা। পায়ে হেঁটে ঘণ্টাখানেক লাগবে সেই বাড়িতে পৌঁছাতে, তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে বিকালের মুখে। মুখে মেলা দিলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, সুতরাং দিনটা মোটামুটি শাসন বাঁধনের বাইরে আজ। রাখাল হাফিজদ্দির জন্য যেমন বাড়ির ঝি রহিমার জন্যও তেমন। আর রহিমা আজার থাকা মানে হাসুও আজার।
দূরে বাংলাঘরের ছনছায় বসে এখন বেশ গা-ছাড়া ভঙ্গিতে তামাক টানছে হাফিজদ্দি। হাঁটুর উপর লুঙ্গি তুলে, গামছাটা গলার উপর, গুড়গুড় করে তামাক টানছে সে। ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় কাজকামের ব্যাপারে আজ তারও কোনও তাড়া নাই।
থালে ভাত মাখতে মাখতে একবার হাফিজদ্দিকে দেখল হাসু, তারপর রহিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ফুবু, তোমার হেদিনকার কথাডি লইয়া আমি বহুত চিন্তা করছি।
মুখে ভাত ছিল রহিমার। ভাত চিবাতে চিবাতে হাসুর দিকে তাকাল। জড়ানো গলায় বলল, কী চিন্তা করছস?
এই বাইত্তে কামে আহনের পর হুজুরে যা চাইলো তাতে তুমি রাজি হইছিলা ক্যা?
মুখের ভাত গিলে রহিমা বলল, না রাজি অইয়া উপায় আছিলো না।
ক্যা, উপায় থাকবো না ক্যা?
হেই হগল অনেক কথা।
কও, আমি হুনুম।
হ আইজ তো কওন যায়। আইজ তুই আমি দুইজনেঐ আজাইর।
আমার কথা কইয়ো না, আমি তো আর এই বাড়ির বান্দি না!
বান্দিঐ।
কেমতে?
বান্দির কাছে আইয়া দিনের পর দিন যে থাকে হেও বান্দি। আর তুই তো এই বাইত্তে আমার কাছে থাকতেঐ চাইতাছস। বান্দি তো অইতেঐ চাইতাছস।
হাসু হাসল। হ।
তারপর এক লোকমা ভাত মুখে দিল। এইবার কও।
পয়লা পয়লা হুজুরের কথা আমি হুনি নাই। হেয় খালি তক্কে তক্কে থাকতো, আমার মিহি। খালি চাইয়া থাকতো, আঐলে পাইলেঐ প্যাচাইয়া পোচাইয়া ধরতো, শইল্লে হাত দিত। টেকাপয়সা হাততো (সাধতো)। টেকাপয়সার লোব আমার আছিলো না। আইজও নাই। হের কাছ থিকা একখান পয়সাও আমি কোনওদিন নেই নাই।
বোজলাম। আসল কথা কও।
এই হগল কথাও আসল কথাঐ। বেবাক না কইলে বুজবি কেমতে?
ভাত খাওয়ার মাঝখানে ঢোঁকে ঢোঁকে পানি খাওয়ার অভ্যাস হাসুর। টিনের মগ তুলে একঢোঁক পানি খেল সে। ফুফুর দিকে তাকিয়ে বলল, আইচ্ছা কও।
রহিমা আরেক লোকমা ভাত মুখে দিল। দিনের পর দিন একজন মানুষ, তাও হুজুরের লাহান মানুষ এমুন করন লাগল, আমিও তো মানুষ, না কি! মাইয়ামানুষ, বয়েস তহন তর লাহান, শইল সাস্ত ভাল, হুজুরের বয়েসও কম। অহন যা দেহচ তার থিকাও কত জুয়ান মর্দ। দেড়-দুই বচ্ছর জামাইর ঘর করছি আমি। আমার শইলও তো শইল, আমারও তো সাদ আহ্লাদ আছে! পয়লা পয়লা এই সাদ আহ্লাদ আমি ঠেকাইয়া রাকছি। শইল্যে হাত দিলেঐ হুজুররে আমি ডর দেহাইতাম। এমুন করলে কইলাম হুজরানিরে কইয়া দিমু। হুইন্না হুজুরে ডরাইতো। কয়দিন আর আমার মিহি চাইতো না। দেকতো সত্যই আমি হুজরানিরে কইনি। কই না দেইক্কা আবার আগের লাহান অইয়া যাইতো। আবার আগের লাহান ঘ্যানর ঘ্যানর করতো কানের সামনে। হারাজীবন এই বাইত্তে থাকতে পারবি তুই, খাওন ফিন্দনের আকাল অইবো না। অসুকবিসুক অইলেও আমি তরে দেহুম, আমি কোনওদিন না তরে হালামু না। আমি জামাই তালাক দেওয়া মাইয়া, তারপর পোলাপান অইবো না। কোনওদিন, ভাইয়ে বাইত্তে জাগা দেয় নাই, এমুন কোনও আততিয় স্বজন নাই যার কাছে। গেলে একওক্ত আমারে খাওয়াইবো। বোজলাম হুজুরে খারাপ মানুষ, হেয় যা চায় হেইডা না দিলে হেয় কোনও না কোনও উছিলায় এই বাইত থিকা আমারে খেদাইয়া দিবো। আমি তহন যামু কই? নাইলে অন্য বাইত্তে গিয়া কামলমু। তয় যেই বাইত্তে কাম লমু হেই হগল বাইত্তেও তো পুরুষপোলা আছে, আমার লাহান যুবতী কামের ছেমড়ি পাইলে তারাও তো হুজুরের লাহানঐ করবো! এই বাইত্তে অইলো এক হুজুর আর অন্য বাইত্তে তো শয়ে শয়ে হুজুর! অত হুজুর আমি হামলামু কেমতে?
থালার ভাত অর্ধেক পরিমাণ শেষ হয়েছে। আরেক লোকমা ভাত মাত্র মুখে দিতে গিয়েছিল হাসু, ফুফুর শেষ কথাটা শুনে থতমত খেয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। তারপর কেমন দুঃখী, মন খারাপ করা গলায় বলল, ঠিক কইছো। মৌচ্ছামান্দ্রার যেই বাইত্তে আমারে কামে দিছ হেই বাইত্তেও হুজুরের কোনও আকাল নাই। বাপ পোলা বাড়ির কামলাবেড়া থিকা শুরু কইরা এতজনে আমারে জ্বালায়, অগো ঠেকাইতে ঠেকাইতে, নিজের শইল অগো বদ মতলব আর কুনজর থিকা বাঁচাইতে বাঁচাইতে আমার আইজ এই দশা। রাইতের পর রাইত বেডাগো জ্বালায় আমি ওইবাইত্তে ঘুমাইতে পারি না, দিনেরবেলা আঐলে পাইলে বুক টিপ্পা ধরতে চায় কেঐ না কেঐ। এই হগল যন্ত্রণা থিকা নিজেরে বাঁচানডা অইলো যুইদ্ধের লাহান। আইজ দশ-বারো বছর ধইরা এই যুইদ্ধ করতে করতে আমি এক্কেরে শেষ অইয়া গেছি ফুবু। মাইয়ামানুষ থিকা বেড়ামানুষ অইয়া যাইতাছি আমি। যুইদ্ধ করতে করতে যহন আর পারি না, শইল্যে কুলায় না, তহন আমি তোমার কাছে আইয়া উডি। ঐ বাইত্তে আর ফিরত যাইতে চাই না।
