না, এই কাজটা মুকসেদ করবে না।
আর মান্নান মাওলানার বাড়িতে চুরি যদি তাকে করতেই হয় বড় রকমের চুরি তো সে ইচ্ছা করলেই করতে পারে। আথালে এতগুলি গোরু বান্দা। জুয়ান তাগড়া দামি একখান গোরু খুলে নিলেই হল। দুইটো নিলে একা সামাল দেওয়া যাবে না। একটা নিলে টেনে হিঁচড়ে পথে নামাতে সুবিধা হবে। তারপর বাড়ির যে-কোনও শরিকের রান্নাঘর বা কদু কুমড়ার ঝকা থেকে বাঁশের কঞ্চি জোগাড় করে ওই দিয়া গোরুটার পাছায় দু-চার ঘা দিলেই সেটা সামনে হাঁটতে থাকবে। এখন গোরু নিয়া রওনা দিলে ভোরবেলা গিয়া পৌঁছানো যাবে দেলভোগের হাটে। দুপুর নাগাদ বিক্রি করে নগদ টাকা কেঁছড়ে নিয়া বাড়ি ফিরা যাবে।
তয় গোরু চুরি মুকসেদ করবে না। চোর কথাটা ভাল, গোরুচোর খুবই খারাপ। জীবনে। গোরুচোর কখনও হয় নাই মুকসেদ। তার নামের লগে গোরুচোর কথাটা যুক্ত হয়নি। চোর হলেও তার একটা সম্মান আছে, নীতিধর্ম আছে। এই বয়সে এসে সেই সম্মান আর। নীতিধর্ম কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারে না।
মন্তাজের বড়ঘরের ভিতর থেকে কাশির শব্দ এল। মন্তাজের এখন যাই তখন যাই মা ঘ্যারঘ্যারা গলায় কাশছে। তিন-চারবার কেশেই থেমে গেল। তালুকদার বাড়ি আর কামারবাড়ির মাঝবরাবর পুবদিকে ধানি মাঠের কোনায় যে বিশাল মেঘশিরীষের গাছ সেই গাছের দিক থেকে ভেসে আসছে কোকিলের একটানা ডাক। মেঘশিরীষের ডালপালার আড়ালে বসে আকাশ থেকে আসা চাঁদের আলোর দিকে মুখ তুলে হয়তো ডেকে যাচ্ছে প্রকৃতির যৌবনে মগ্ন হয়ে থাকা পাখি। রাতের মধ্যযাম শেষ হয়ে আসার সময়কার নির্জনতায় এই ডাক যেন এই পরিচিত দেশগ্রাম আর দুনিয়া ছাড়িয়ে বহুদূরের কোনও অচিনলোকে পাড়ি জমাচ্ছে। রাতের এসময় শীতল বাতাস বয়। চাঁদ পশ্চিমে হেলে পড়েছে বলে গিরস্তবাড়ির ঘরদুয়ার তয় গাছপালার ছায়া পড়েছে উঠান পালানে। মন্তাজের সীমানায়, উঠানের এক কোণে নিমগাছ। নিমের ঝিরকিকাটা বড় রকমের ছায়া পড়েছে উঠানের অনেকখানি জুড়ে। হাওয়ায় নিমের ডালপালা দুলছে দেখে উঠানে পড়া ছায়াও দুলছে। পুবদিক থেকে উড়ে আসা একটা বাদুড়ের ডানার ছায়াও পড়ল উঠানে। ঠিক তখনই আনমনা চোখে মোতাহারের ঘরের দিকে তাকিয়েছে মুকসেদ, দেখে নিঃশব্দে খুলে যাচ্ছে সেই ঘরের সামনের দিককার দরজা, দেখেই চট করে নিমগাছটার পিছনে সরে গেছে মুকসেদ, চোখ খুলে যাওয়া দরজার দিকে। তারপরই আতাহারকে পরিষ্কার দেখতে পেল সে। লুঙ্গির ওপর হাফহাতা গেঞ্জি পরা। ঘর থেকে বেরিয়েই এদিক ওদিক তাকিয়ে। দ্রুত পা চালিয়ে নিজেদের বাংলাঘরের দিকে চলে গেল। আর মোতাহারের বউ নিঃশব্দে বন্ধ করে দিল দরজা। দুইজন মানুষের আচরণই চোরের মতো। চোরের মতো সাবধানতা, চোরের মতো শব্দ বাঁচিয়ে চলা।
এই দেখার পর মুকসেদের মনে হল সে তার এতদিনকার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছে প্রত্যেক মানুষের ভিতরই একজন চোর বসবাস করে। জীবনের কোনও না কোনও সময়ে সেই চোরটি বেরিয়ে আসে, লোকের অগোচরে কিছু না কিছু চুরি করে। কখনও কখনও নিজের অগোচরেও করে, নিজের কাছ থেকেও কিছু না কিছু চুরি করে। সমাজ সংসার স্ত্রী সন্তান, মা বাপ ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন বা প্রাণের মানুষ প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের চলছে এক ধরনের চৌর্যবৃত্তি। এমনকী প্রকৃতির মধ্যেও যেন চলছে এক বিশাল চৌর্যবৃত্তির খেলা। গাছপালা, শস্যচারা মাটিকে জানান না দিয়ে মাটি থেকে রস শুষে নিয়ে বেঁচে থাকছে, নদী-সমুদ্রকে জানান না দিয়ে মাথার ওপরকার বিশাল আকাশ মেঘ তৈরির জন্য টেনে নিচ্ছে পানি, রোদের ছদ্মবেশে সূর্যের আলো শুষে নিচ্ছে মাটির রস, বহতা হাওয়ার মধ্যেও যেন আছে এক চোরের বসবাস। এমন করে নিঃশব্দে বইছে, বহু সময়ই মানুষ যেন তা বুঝতে পারে না। আর জীবন অবসানের যে প্রক্রিয়া মৃত্যু, সে। তো আসে একেবারেই চোরের মতো। রুহ কবচ করতে মহান আল্লাহতায়ালার প্রেরিত ফেরেশতা আজরাইল মানুষের শিয়রে এসে দাঁড়ান একেবারেই নিঃশব্দে, কখনই কাউকে বুঝতে দেন না কখন তিনি আসবেন, কখন কবচ করবেন আল্লাহর বান্দার জান।
এসব ভেবে নিজের চোরজীবন নিয়ে কেন যে আর কোনও আক্ষেপ রইল না মুকসেদের! ভোররাত তরি মান্নান মাওলানার বাড়িতে ঘুরঘুর করে ফজরের আজানের আগে আগে নিজেদের বাড়ির দিকে ফিরতে গিয়া গণি মিয়ার সীমানায় মাত্র আসছে মুকসেদ, দেখে উঠানের এক কোণে দুই-তিনটা কুনোব্যাং থপ থপ করে লাফাচ্ছে। খাদ্যের খোঁজে বেরিয়েছে। গিরস্তবাড়ির আঙিনায় রাতের যে-কোনও মুহূর্তেই লাফাতে পারে ব্যাং, এ এমন কিছু চোখে দেখার মতন দৃশ্য না। মুকসেদ তেমন তাকিয়ে দেখছিল না ব্যাংগুলি, নিজের মতো করে বাড়ির নামার দিকে পা বাড়িয়েছে, তখন গা হিম করার মতন দৃশ্যটা সে দেখল। গণি মিয়ার আঙিনার পুব দিককার নামায় দুইটো বউন্নাগাছ, একটা মটকুরা গাছ আর ছিটকি টোসখোলার ঝোঁপ, সেই ঝোঁপের দিক থেকে নিঃশব্দে উঠে আসছে হাত পাঁচেক লম্বা, সাদার কাছাকাছি রঙের উপর কালো চওড়া ছোপ ছোপ অতিকায় এক সানকি (শঙ্খীনি) সাপ। একেবারেই নিঃশব্দে, চোরের ভঙ্গিতে ব্যাংগুলির দিকে আগাচ্ছে।
সাপ দেখেই লাফ দিয়ে অনেকটা দূর সরে গেল মুকসেদ। অপলক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল কাজটা কী হচ্ছে। শরীর টেনে টেনে নিঃশব্দে ব্যাংগুলির কাছাকাছি এসে স্থির হল সাপ, তারপর আচমকা প্রথম থাবাটা দিল, একটা ব্যাং ধরে আস্তেধীরে গিলতে লাগল। অন্য ব্যাংগুলি তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ব্যাপারটা কী! তারা। নিজেদের মতন চরছে। উঠানের এদিককার মাটির সরু সরু গর্ত থেকে এক ধরনের পোকা বেরুচ্ছে। ব্যাংগুলিও চোরের ভঙ্গিতে সেই পোকা ধরে ধরে খাচ্ছে। ব্যাং খাচ্ছে মাটিপোকা, আর সাপে খাচ্ছে ব্যাং। দুই খাওয়াখাওয়ির মধ্যেই যেন কাজ করছে এক ধরনের চৌর্যবৃত্তি। জীবজগতের প্রত্যেকের কাজই যেন চুরির কাজ। রাতদুপুরে গিরস্ত বাড়ির ফলগাছে চোরের মতো এসে নামছে বাদুড়, গিরস্তের ফল খেয়ে শেষ করছে। বাদুড় তাড়াবার জন্য কত রাতদুপুরে ক্যানেস্তারা পিটায় কোনও কোনও গেরস্তে। তবু চোরের ছদ্মবেশে আসা বাদুড় ঠেকিয়ে রাখা যায় না।
