লগে লগে দেলোয়ারার ওপরকার রাগ বউর ওপর ঝেড়ে দিল মোতালেব। জোরে হাত ঝটকা মারল। কাহিল বউটা প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল দূরে। মোতালেব চিৎকার করে বলল, তুই আমারে থামাইতে আহচ ক্যা মাগী? আমি কি কেঐরে ডরাই? কেঐরডা খাই ফিন্দি?
মোতালেবের বউ কথা বলল না। উঠে কাপড় থেকে ধুলা ঝাড়তে লাগল। স্বামীর এই ধরনের ঠেলাধাক্কা প্রায়ই খায় সে। যে কোনও কাজের ব্যর্থতার ঝাল মোতালেব তার বউর ওপর ঝাড়ে। বউটা এই সব ব্যাপারে অভ্যস্ত। বাড়ির লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে তার উড়ে গিয়ে পড়াটা দেখল তবু সে কিছুই মনে করল না। আবার এসে স্বামীর সামনে দাঁড়াল।
দেলোয়ারা তখন বলছে, কথা কইতে কইতে গলা বইল্লা (বড় হয়ে) গেছে, না? যার তার শইল্লে হাত তোলতে তোলতে হাত বইল্লা গেছে। এর লেইগাইত্তো মন্না দাদার পোলায় ধইরা খালে চুবাইয়া দিছিলো। এইবার আর চুবান না, বেশি বাড়াবাড়ি করবি জেল খাডাইয়া ছাড়ুম। মনে নাই? ভুইল্লা গেছস বেবাক কথা? মাজারো কাকার পোলারা আর তরা মিল্লা যে বড়খেতের ধান কাইট্টা নিছিলি, তারবাদে যহন দরগা পুলিশ আইয়া গুষ্টিসুদ্দা বানছিলো, রাইত দুইফরে ছালাভরা ধান মাথায় কইরা আমগো ঘরে দিয়াইছিলি। গুষ্টিসুদ্দা কাইন্দা কুল পাছ নাই। বেবাকতে মিল্লা আমার দুলাভাইয়ের পাও প্যাচাইয়া ধরছিলি। ভুইল্লা গেছস? দুলাভাই মইরা গেছে কী অইছে। তার পোলারা নাই? এনামুল না পারলে মাজরো বইনপোরে খবর দিমু আমি। আইয়া কইলজা (কলিজা) গালাইয়া হালাইবো তর।
এবারও মোতালেব কোনও কথা বলতে পারল না। তার আগেই মন অন্যদিকে চলে গেল তার। বউ এসে আবার হাত ধরেছে। অন্যদিকে দেলোয়ারার হাত ধরেছে তার মেজো চাচার আগের পক্ষের ছেলে হাফেজের বউ। বাদ দেন বুজি। অনেক অইছে। লন। ঘরে লন।
হাত ধরে টানতে টানতে দেলোয়ারাকে ঘরে নিয়ে গেল হাফেজের বউ। তখনও রাগ কমেনি দেলোয়ারার। আগের মতোই রাগে গো গো করছেন তিনি। ওদিকে মোতালেবের তখন সব রাগ গিয়ে পড়েছে বউর উপর। প্রথমে গলা ধরে প্রচণ্ড জোরে বউকে একটা ধাক্কা দিল সে। তারপর গুমগুম করে তিন চারটা কিল মারল পিঠে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, চুতমারানী মাগী খালি আমার লগে লাইগ্যা থাকে। অর লেইগা মাইনষের লগে কাইজ্জাও করতে পারি না।
বউ কোনও প্রতিবাদ করল না, কাঁদল না। দুঃখি মুখ করে স্বামীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মোতালেবের মেয়ে ময়না ছিল ঘরের ভিতর। ছয় সাত বছর বয়স মেয়ের। ডানপা খোঁড়া। হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত শুধুই হাড়। হাড়ের ওপর লেগে আছে টিকটিকির চামড়ার মতো ফ্যাকাশে চামড়া। এক ছটাক মাংস নাই। এই পা নিয়ে দাঁড়াতে পারে না মেয়েটা, হাঁটতে পারে না। সারাক্ষণ বসে থাকে, কোথাও যেতে হলে হেউচড়াইয়া (ছেছড়ে) যায়।
ঘরের ভিতর থেকে মাকে মার খেতে দেখে হাচড় পাছড় করে বের হল ময়না। হেউচড়াইয়া হেউচড়াইয়া মার কাছে গেল। দুইহাতে মার শাড়ি খামছে ধরে বলতে লাগল, দুঃকু পাইছ মা? দুঃকু পাইছ! বহো আমি তোমারে আদর কইরা দেই। আমি আদর করলে দুঃকু তোমার থাকবে না।
এতক্ষণ কিচ্ছু হয়নি বউর, মেয়ের কথা শুনে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। চোখের পানি গাল বেয়ে দরদর করে নামল।
মার মুখের দিকে তাকিয়ে ময়না বলল, কাইন্দো না মা, কাইন্দো না। বহো, আমি তোমারে আদর কইরা দেই।
এক পলক বউকে দেখল মোতালেব, মেয়েকে দেখল। তারপর বড়ঘরের পিড়ায় গিয়ে বসল। ছালার ব্যাগ থেকে একমুঠ গম নিয়ে উঠানে ছিটিয়ে দিল। ঘরের চাল থেকে, গাছের ডাল ধোয়াড় থেকে উঠানে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল অনেকগুলি কবুতর। গম খেতে লাগল।
হাফেজের বউ তখন দেলোয়ারাকে একটা চেয়ারে বসিয়েছে। চেয়ারে বসে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছেন দেলোয়ারা। একটানা এতক্ষণ চিৎকার করে কথা বলার ফলে ক্লান্ত হয়েছেন। দেলোয়ারার স্বভাব হল কোথাও বসলে প্রথমেই চশমা খোলেন, খুলে শাড়ির আঁচলে যত্ন করে কাঁচ মোছেন। যেন রাজ্যের সব ধুলাবালি জমে আছে কাঁচে। এখনও তাই করতে গেলেন। চোখ থেকে মাত্র চশমাটা খুলবেন, চোখ গেল উঠানের দিকে। উঠানে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে মোতালেবের বউ, ময়না তার শাড়ি খামছে ধরে টানছে। অদূরে পিড়ার ওপর বসে নির্বিকার মুখে কবুতরদের গম খাওয়াচ্ছে মোতালেব। সব দেখে বউটার ওপর অদ্ভুত এক মমতায় মন ভরে গেল দেলোয়ারার। আহা তার জন্য মাঝখান থেকে মার খেল নিরীহ বউটা।
দেলোয়ারার তারপর ইচ্ছা হল আবার উঠে গিয়ে মোতালেবের সামনে দাঁড়ান। আগে কী বকাবাজি করেছেন তার দ্বিগুণ করেন এখন। মরদামি (মরদগিরি) দেহাচ ঘরের বউর লগে? মন্নাফ দাদার অতডু (অত ছোট) পোলায় যে ধইরা চুবাইয়া দিলো, তারে তো কিছু কইতে পারলি না। সাহস থাকলে যা, তারে মাইরা আয়, দেহি!
ইচ্ছা ইচ্ছাই, সব ইচ্ছা কাজে লাগে না।
উঠানে দাঁড়ানো মোতালেবের বউর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দেলোয়ারা। চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে লাগলেন।
.
১.১৮
এই অঞ্চলের বাড়ি থেকে নামার সময় গতি বেড়ে যায় মানুষের। উঁচু ভিটা থেকে নেমে আসতে হয় সমতল চকেমাঠে। ফলে নামার দিকে পা ফেলা অর্থ হচ্ছে পা দুইটা আপনা আপনি দৌড়াতে থাকবে, যার পা সে টের পাবে না।
