শুনে মুকসেদ কাঁদোকাঁদো গলায় বলেছিল, ঠিকঐ কইছেন ছার। ভিতরের দাগে ফরাজিরা এইবার আমারে দাগাইছে। এমুন দাগাইন জিন্দেগিতেও খাই নাই। এর থিকা বাঁশডলা বহুত ভাল।
দীর্ঘ চোরজীবনে বাঁশডলাও কয়েকবার খেয়েছে মুকসেদ। কান্দিপাড়ার গাজীবাড়িতে বছর কয়েক আগে চুরি করতে গিয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই তারা সেবার ধরা পড়ল। সে নওশের আর রহা, রহমত। ধরা পড়ার পর বাড়ির উঠানে ফেলে তাদের উপর একত্রে বাশলা চালাল গাজীরা।
বাঁশডলা জিনিসটা কায়দার। মাটিতে উপুড় করে ফেলে, হাত আটেক লম্বা শক্ত ধরনের একখান বাঁশের দুইমাথায় দুইজনে ধরে উপুড় হওয়া লোকটার পা থেকে মাথা তরি বেলুনে রুটি বেলার মতো করে বেলে। তাতে উপুড় হওয়ার দিকটার ছাল চামড়া কিছুক্ষণের মধ্যেই ছিলা মুরগির রূপ ধারণ করে, আর শরীরের ভিতরকার হাড়গোড় হরমাইলের মতন পটাপট ভাঙতে শুরু করে।
এ ছাড়াও কত পদের মার যে জীবনটা ভর খেল মুকসেদ! একবার এক কাঠমিস্ত্রির বাড়ি ধরা পড়ার পর কাঠের গায়ে অযথা গেঁথে থাকা পেরেক সাঁড়াশি দিয়ে যেভাবে টেনে তোলে সেভাবে বুড়া মিস্তিরিটা মুকসেদের হাত পায়ের প্রায় সবগুলো নখ টেনে তুলে ফেলেছিল।
আরেকবার সমষপুরের এক বাড়িতে নখের তলা দিয়া ইয়া লম্বা লম্বা, মোটা মোটা সঁচ ঢোকাল কয়েকজন মিলে।
এ ছাড়া লাথথি গুঁতা, ইটা মুগুর দিয়া পিটানো, বাঁশ দিয়া পেটানো, কন্নি (কনুইয়ের গুঁতো), মুক্কি (এক ধরনের ঘুসি), কিল ঘুসি থাপ্পড়, এমনকী ঠোকনা (ঠোনা) পর্যন্ত খেতে হয়েছে। অর্থাৎ এমন কোনও মাইর নাই জীবনে যা না খেয়েছে মুকসেদ। বাঁ দিককার কানের লতিটাও তো একবার কেটে দিল কোলাপাড়ার এক কাঁচারু বাড়ির লোকজন। দুই তিনবার নাইড়া করে মাথায় গোবর দিয়া দিছে। একবার শিমুলিয়ার এক গিরস্ত বাড়িতে ধরা পড়ার পর ব্লেড দিয়া বুক পিঠের অনেক জায়গা কেচেছিল গিরস্ত বাড়ির লোক, তারপর দলা দলা লবণ মাখায়া দিছিল।
গণি মিয়ার সীমানায় দাঁড়িয়ে আজ রাতে এসব কথা মনে পড়ছিল মুকসেদের। তারপর হঠাৎ করেই যেন মনে হল, আইচ্ছা, এমুন পাকা চোর হওনের পরও এতবার ধরা আমি পড়ছি ক্যান?
গণি মিয়ার সীমানা থেকে মন্তাজদের সীমানার দিকে যেতে যেতে মুকসেদ মনে মনে গুনতে শুরু করল মোট কতবার গিরস্তের হাতে ধরা পড়েছে সে, কতবার জেলে গেছে।
আটবার।
এই আটবারের প্রত্যেক বারই যে জেলে যেতে হয়েছে তা না। তিনবার থানা পুলিশ জেল তরি গড়ায়ইনি ব্যাপার। এমন মার গ্রামের লোকরা দিছে, মাইরের চোটে হেগেমুতে একসা হয়েছে মুকসেদ, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মৃত ভেবে জঙ্গলে, ডোবা নালায় নয়তো ধানের খেতে ফেলে দিয়েছে। একবার কবুতরখোলার সর্দারবাড়ির লোকেরা শুধু মুখ বরাবর লাঠি চালিয়েছিল। লাঠি চালাতে চালাতে একটা কথাই তারা বলছিল, যেই মোক দিয়া চুরির জিনিস খাচ হেই মোক শেষ কইরা দিমু।
অবিরাম লাঠির বাড়িতে মুখের ভিতর মুকসেদের দুই-তিনটি দাঁত কদু বিচির মতন ঝরে পড়েছিল। পরে থুতু ফেলার সময় মুখের লালা আর রক্তের লগে মাটিতে পড়েছিল।
আর যে পাঁচবার থানা পুলিশের হাতে পড়েছে, মাইর তো একটা সেখানেও আছে। সব মিলিয়ে জীবনটা মুকসেদের মাইর খেতে খেতেই গেল। তবু স্বভাবটা সে বদলাতে পারল না, অভ্যেসটা বদলাতে পারল না। এখনও রাতদুপুরে লুঙ্গি কাছা মেরে, মাজার কাছে গামছা বান্দা, গায়ে চপচপা তেল, বাড়ি থেকে বেরোয় মুকসেদ। গিরস্তবাড়ি ঢুকে পিড়ার দিকে তাকিয়ে সিঁদ কাটার স্বপ্ন দেখে।
এবারের ভাবটা নিজের কাছেই কেমন যেন অন্যরকম লাগছে মুকসেদের। সেই যে সেদিন, গ্রামে ফিরার দিন লঞ্চঘাটের চায়ের দোকানে পিয়ার খাঁ-র বাড়ির ওদিককার লোকটা তাকে চিনার পরই মাওয়ার বাজারে গিয়া মোচ দাড়িটা কামিয়ে মুখটা ফকফকা করে ফেলেছে। চুলে দিছে কদমছাট। তারপর গত দুই-আড়াই মাসে আরও তিনবার মাথায় কদমছাট দিছে, দুই-চারদিন পর পর বাড়িতে বসেই মুখ বানাচ্ছে। সব মিলিয়ে মুকসেদ এখন আর পুরনা মুকসেদ নাই। নতুন হয়ে গেছে। মোচ দাড়ি আর চুল যে মানুষকে এমন করে বদলে দিতে পারে বহুদিন পর টের পেল মুকসেদ। তখন থেকেই থেকে থেকে মনে হয় চেহারার মতো করে মনটাও যদি ফকফকা করে ফেলা যেত! মনের উপর মোচ দাড়ির মতন দাগি চোরের যে স্বভাবটা রয়ে গেছে সেটা যদি কামিয়ে ফেলা যেত!
চেষ্টা ভিতরে ভিতরে যে না করছে মুকসেদ তা নয়। গণি মিয়াকে সেদিন বলেছেও যে ওসব সে ছেড়ে দিছে। এখন থেকে ভাল হয়ে যাবে।
তয় এতদিনের অভ্যাস চট করে কি আর বাদ দেওয়া যায়! রাত হলেই, ঝিঁঝিপোকারা ডাকতে শুরু করলেই মনের ভিতর থেকে ডাক দিয়ে যায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনা একজন চোর, মুকসেইদ্দা চোরা।
মুকসেদের পিছন পিছন লেজ নাড়াতে নাড়াতে মন্তাজের সীমানা তরি এল গণি মিয়ার কুত্তাটা। এদিক ওদিক দুই-তিনবার মুখ ঘুরিয়ে আবার ফিরে গেল নিজেদের সীমানায়।
রাত এখন কতটা হয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আন্দাজ করতে পারে মুকসেদ। ভোর হওয়ার আরও ঘণ্টা তিনেক বাকি। এসময় মানুষের ঘুম গাঢ় হয়। সহজে ভাঙতে চায় না। গিরস্তের ঘরে সিঁদ কেটে ঢোকার এই হচ্ছে মোক্ষম সময়। ইচ্ছা করলেই বাড়ি গিয়া একটা শাবল এনে যে-কোনও ঘরের পিড়ায় শাবল চালাতে পারে সে। মানুষ ঢুকে যাওয়ার মতন। গর্ত করে ঢুকে যেতে পারে। বেরুবার সময় তো দরজা খুলেই বেরুবে। শরীরে তেল মাখা তো আছেই, লুঙ্গিও কাছামারা আছে।
