তা ছাড়া বয়সও হয়েছে, একটা বয়সে এসে যে-কোনও কাজ থেকেই অবসর নেয় লোকে। মুকসেদই বা নিবে না কেন? হোক না চুরি! চুরি কি কাজ না? চোরের কি অবসর নাই?
তার ওপর চুরি শুরু করার পর থেকে জীবনটা জেলে জেলেই কাটল। পুলিশের রোলের বাড়িতে শরীরের হাড়গোড়, মাংস চামড়া সবই লোহা হয়ে গেছে। মারধরটা আজকাল সহ্যও হয় না। বাড়িগুলি এখন আর শরীরে লাগে না। শরীরের যেখানেই পড়ুক লাগে মাথার তালুতে গিয়া, বুকের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা রুহের গোড়ায়। এইসব কারণেই চোর জীবনটা বাদ দিতে চাইছে মুকসেদ। অবসর নিতে চাইছে।
তয় বহু বছরের পুরনো অভ্যাস। মুক্ত জীবনে থাকলেই রাতেরবেলা ঘুম আসে না। মন উচাটন হয়ে চুরির ধান্ধায়। ঘরে মন বসেই না। পা উসপিস উসপিস করে। খালি এইবাড়ি ওইবাড়ি যাইতে ইচ্ছা করে।
আজ রাতেও এই কারণেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে মুকসেদ। বেরিয়ে দূরে কোথাও যায়নি। নিজেদের বাড়ির সীমানার ঢাল বেয়ে নেমে মান্নান মাওলানার বাড়ির তিন নম্বর শরিক গণি মিয়ার সীমানায় উঠেছে। গণি মিয়া ঢাকায় চলে গেছে কয়দিন হল। বাড়িতে রেখে গেছে মতিমাস্টার, তার বউ আর অথর্ব দুই ছেলেমেয়ে। তাদের লগে আছে বাড়ির কুকুরটা। আজ রাতে মুকসেদকে তাদের সীমানায় উঠতে দেখেই দৌড়ে এল তবে তেমন ঘেউ ঘেউ করল না। কারণ ঢাকায় যাওয়ার কয়দিন আগেই নিজের মনিব গণি মিয়ার লগে এই লোকটাকে কথা বলতে দেখেছে কুকুরটা। গত দু-আড়াই মাসে দিনরাত মিলে দুই-চারবার তাদের সীমানার পুবদিককার বাড়িটায়ও লোকটাকে সে দেখছে ঘরের ছাইছে দাঁড়িয়ে বিড়ি সিগ্রেট টানছে। দেখে দেখে চিনা হয়ে গেছে। লোকটা চোরাচড় কি না বুঝতে পারছে না।
রাতেরবেলা বাড়ি থেকে সব সময়ই খালি গায়ে বেরোয় মুকসেদ। শীত গরম নাই শরীরের উপরের অংশ খালিই থাকে। নিম্নাঙ্গে লুঙ্গি যতটা সম্ভব শক্ত আর খাটো করে কাছা মারা। তার উপর কোমরের কাছে লুঙ্গি যেখানে গিটই দেওয়া ঠিক সেখানে একখান পুরনো লম্বা ধরনের গামছা লুঙ্গির মতোই শক্ত করে গিটঠ দিয়ে বাঁধে। গলা থেকে পায়ের গুড়গুড়া তরি সরিষার তেল এমন ভাবে মেখে নেয়, যেন তেল মাখে নাই শরীরে, যেন পুকুর থেকে এইমাত্র ডুব দিয়া উঠছে।
এরকম তেলমাখার কারণ চুরি করতে গেলে আচমকা যে কেউ দুইহাতে জাবরে (জাপটে) ধরবে, বা থাবা দিয়ে ধরবে হাত পা, ধরলেও ধরে রাখতে পারবে না। শোলমাছের মতন পিছলে যাবে মুকসেদ। কাছা মারা লুঙ্গির দিকটাও যে থাবা দিয়ে ধরবে, তাও পারবে না, গিঁট খুবই কায়দা করে দেওয়া। থাবা দিয়া ধরেও হাতের মুঠায় রাখতে পারবে না, খুলে ল্যাংটাচোংটা করে ফেলতে পারবে না মুকসেদকে। একে শরীরে মাখা চপচপা তেল তার ওপর ধরার লগে লগে মাছের মতন পিছলে যাওয়ার সব কায়দা দীর্ঘদিন ধরে রপ্ত করেও ধরা জীবনে কম পড়ে নাই মুকসেদ। আর ধরা পড়ার পর যে দশা হয়েছে, বহুবার মরতে মরতেও মরে নাই। পুলিশের রোলের বাড়ি আর জেল তো পরের কথা, তার আগে ধরা পড়ার লগে লগে গিরস্তের যে মাইরটা আছে সেটার কোনও তুলনা নাই। কেচকি মাইর বলে একখান মাইর আছে, সেটা হল মাইরটা যে বেদম ভাবে মাইরা হইছে বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যাবে না। মনে হবে একদমই মারা হয়নি। শরীর চেহারা একেবারেই তেলতেলে তয় তলে তলে দশা কেরাসিন। কেচকি মাইর খেয়ে বসে আছ তো ঠিক আছে, উঠে দাঁড়াতে গেলেই টের পাওয়া যাবে মাইরটা কী পরিমাণ হয়েছে।
কেচকি মাইর জিনিসটা আসলে হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় মারা হয়, পায়ের তালুতে, হাতের তালুতে মারা হয়। হাত দুয়েক লম্বা হেঁচা কাঠের মুঠ পরিমাণ মোটা, তেল চকচক একখান রোলার দিয়া হাড়ের জোড়াগুলি, যেমন পায়ের হাঁটু, গোড়ালি, হাতের কনুই, কবজি এসব জায়গা বেছে বেছে রোলার দিয়া বেদম পিটানো, চিত করে ফেলে বুকে চেপে থাকবে দুই-তিন জুয়ান আর আরেকজন রোলার চালাবে পায়ের তালুতে, কখনও কখনও এক রোলারের উপর হাত পায়ের আঙুল লম্বা করে বসিয়ে আরেক রোলার দিয়া আঙুলের জোড়াগুলিই পিটানো, এই হচ্ছে কেচকি মাইর। জীবনে এক-দুইবার ওই মার খেলে বাপের নাম ভুলে যেতে সময় লাগে না।
কেচকি মাইর জীবনে মুকসেদে খেয়েছে পাঁচ-সাতবারের কম না। শেষবার তো এমন খাওয়া খেল, সাতঘরিয়ার এক বাড়িতে চুরি করতে গিয়া ধরা পড়ছিল, কেচকি মাইর খেয়ে একদম ভাল মানুষের কায়দায় উঠানে বসে আছে, লৌহজং থানার পুলিশ দারোগা এসে মোটা দড়ি দিয়া কোমর বরাবর বাঁধল, দাঁড়াতে বলার পর মুকসেদ তো আর উঠে দাঁড়াতে পারে না! দারোগা পুলিশ দড়ি ধরে টানছে। কী রে মুকসেইদ্দা, উঠছিস না কেন?
মুকসেদ কিছুতেই উঠতে পারে না। দুই-একবার উঠবার চেষ্টা করেই নেতিয়ে পড়ছে।
সেবারের দারোগাটি ছিল অল্পবয়েসি, বুদ্ধিমান মানুষ। মুকসেদের দশা দেখে বুঝল কারবারটা কী হয়েছে। গিরস্তের নাম মকবুল ফারাজি, তার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, কারবার তো মন্দ করেননি দেখি!
শুনে লোকটা আকাশ থেকে পড়ল। কীয়ের কারবার ছার (স্যার)। আমরা তো কোনও কারবার করি নাই। চোর ধরছি ঠিকঐ তয় ফুলের টোকাডাও শইল্যে দেই নাই। দিলে তো দেকতেনঐ। দেহেন, ভাল কইরা দেহেন, শইল্যে কোনও দাগ আছে চোরার!
দারোগা হাসলেন। উপরের দাগ দিয়েই কি সব কিছু হয়! কিছু দাগ আছে দেয়া হয় শরীরের উপর দিয়েই কিন্তু দাগটা পড়ে গিয়ে ভিতরে। এই বিষয়ে আপনারা যে খুবই এলেমদার তা আমি বুঝেছি।
