কিন্তু অবিরাম শুধুই শরীরের জাগরণ, শুধুই মাথা ধরা, একজন একজন করে তিন তিনজন পুরুষ ছোঁবে তাকে, যা ইচ্ছা তাই করবে তার শরীর নিয়া, বিনিময়ে শুধুই মাথা ব্যথা, কতকাল ধরে চলবে এই খেলা!
পারু তারপর নির্লজ্জের মতন একটা কাজ করেছিল। চোখ থেকে আতাহারের হাত সরিয়ে না দিয়ে নিজের কোমল মসৃণ হাতে তার চোখের ওপর ধরা আতাহারের হাতে বুলাতে শুরু করেছিল। এই স্পর্শে কী ছিল কে জানে, আতাহার প্রথমে একটু চিন্তিত হয়, তারপর সেও কেমন অন্য মানুষ হয়ে ওঠে। মুখ নামিয়ে নেয় পারুর গ্রীবার কাছে, চোখ থেকে দুইহাত নামিয়ে নেয় পারুর বুকে। গভীর আবেশে চোখ বুজে পারু শুধু বলেছিল, ঘরে লও ছোডমিয়া।
সেই সন্ধ্যায় পারু টের পেল সত্যিকার পুরুষমানুষ কেমন! সাতমাস ধরে মাথায় চেপে বসা ব্যথা সেই সন্ধ্যায় উধাও হয়ে গেল। সেই প্রথম আতাহারের জন্য পাগল হল সে। আজ বারো বছর ধরে সেই একই রকম পাগল হয়ে আছে।
.
চাঁদের আলোয় ভোররাতের দিকে মোতাহারের বিধবা বউ পারুর ঘর থেকে আতাহারকে বেরিয়ে যেতে দেখল মুকসেদ, মুকসেইদ্দা চোরা। মাঝরাতে এই বাড়িতে এসে ঢুকেছে সে। তিন শরিকের প্রত্যেকের সীমানায়ই ছায়ার মতন ঘুরে বেরিয়েছে। কোথাও চুরি করার মতন কিছু আছে কি না খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। গ্রামগিরস্তের বাড়িতে উঠান পালানে, ঘরের ছনছায়, গাছতলায় কখনও চুরি করবার মতন কিছু পড়ে থাকে না একথা মুকসেদ তার দীর্ঘ চোরজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানে। দুই পয়সা দামের জিনিসও যত্ন করে ঘরে নিয়ে তুলে রাখে গিরস্তবাড়ির বউঝিরা। সুতরাং এই বাড়িতে যে কিছু পাওয়া যাবে না তা মুকসেদ ভাল করেই জানে।
আর পাওয়া গেলেই কি চুরিটা আজ মুকসেদ করবে! গ্রামে ফিরার পর কাজটা কি সে। আজ পর্যন্ত করেছে! ফিরার দিন সন্ধ্যার পর পর দবির গাছির বাড়িতে গিয়া এতবড় সুযোগ পেয়েও তো শেষ পর্যন্ত চুরিটা সে করে নাই। মনের ভিতর গন্ডগোল লেগে গিয়েছিল। গন্ডগোলটা অবশ্য জেলখানায় থাকা অবস্থাতেই কমবেশি শুরু হয়েছিল।
বয়স মুকসেদের ম্যালাই হয়েছে। মান্নান মাওলানার চেয়ে বয়সে সে ছোট, তবে খুব ছোট না। ষাট-বাষট্টি তো হবেই। অন্যান্য পেশায় যারা থাকে এই বয়সে তারা কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে বসে আল্লাহ বিল্লাহ করে। কাজকর্ম করে ছেলেরা। যদিও মুকসেদের সংসার। নাই, যৌবন বয়সে বছর চারেকের জন্য সংসার একবার হয়েছিল। আড়াই বছরের একটা ছেলে রেখে বউটা মরল কলেরায়। ছেলেটাকে নিয়া গেল মুকসেদের ছোট বোন রিজিয়া। সে থাকে কক্সবাজার ছাড়িয়ে আরও দূরের নাফনদীর তীরবর্তী শহর টেকনাফে। তার স্বামী সেখানে পুঁটকি মাছের কারবার করে। দিনে দিনে মুকসেদের ছেলে হয়ে গেছে রিজিয়ার ছেলে। রিজিয়ার জামাইকেই বাপ ডাকে, বাপের সঙ্গে সেও পুঁটকি মাছের কারবার করে। বছর দুয়েক আগে ছেলে বিয়া করছে এক রাখাইন মেয়ে এই খবরও মুকসেদ পেয়েছে। তয়। মুকসেদের লগে সেই ছেলের যোগাযোগ নাই। মুকসেদকে সে চিনেই না। চিনলেও প্রকাশ করে না। বাপ দাগি চোর হলে তার পরিচয় দেয় কোন ছেলে? আপন বোন হয়ে রিজিয়াই। তো পরিচয় দেয় না। নিতান্তই মা-মরা ছেলেটাকে দেখে মায়া লেগেছিল বলে কোলে করে চিরতরে টেকনাফে নিয়ে গিয়েছিল। কোনওদিন মেদিনীমণ্ডল গ্রামে আর ফিরতে দেয় নাই। নিজেও আর কখনও আসে নাই বাপের বাড়িতে। দুই ভাইয়ের একমাত্র বোন যে সে, সেই কথা ভুলে গেছে।
তয় মুকসেদের ছোটভাই আক্কাস পারে নাই তার ভাইকে ভুলতে, পারে নাই ভাইকে ফেলতে। সে নিতান্তই গোবেচারা গিরস্ত। বাপদাদার সম্পত্তি তিন ভাইবোনে যা ভাগে পেয়েছে সব সে একাই ভোগ করে। ধান পাট তিল কাউন সরিষা কলুই সবমিলে ফসল পায় ভালই। আথালে গোরু আছে পাঁচ-সাতটা, সংসারে পোলাপান আছে আটজন, তিন মেয়ের বিয়ে দিয়ে ফেলেছে। অল্পবয়সেই বড় মাজারো পোলা বিয়া করছে, ছেলের ঘরের নাতিনাতকুড়ও আসছে আক্কাসের সংসারে। পাঁচ ছেলের তিনজন গেরস্তি কাজ করে বাপের লগে। চার নম্বরটা ঢাকায় কোন এক ব্যাঙ্কের দারোয়ান, একদম ছোটটা মাওয়ার বাজারে চায়ের দোকান দিয়েছে। সবমিলে বেশ জমজমাট সংসার আক্কাসের। চুরির দায়ে জেল খেটে আক্কাসের সংসারেই ফিরে মুকসেদ। জেলে যাওয়ার আগেও এই বাড়িতেই তার বাস। পশ্চিমের ভিটির ভাঙাচোরায় দিনভর পড়ে পড়ে ঘুমায়, আর রাত হলেই চুরি করতে বের।
এবার তার মন চুরিচামারিতে টানছে না। ফিরার দিন দবির গাছির বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে আসছে, তখন অল্পের জন্য তিনজন মানুষের গায়ের ওপর গিয়ে সে পড়েনি। মানুষের পায়ের শব্দ পেয়েই ঘরের পিছনে গিয়ে ঘাপটি মেরেছিল। পরে মানুষ তিনজনের কথাবার্তায় বুঝেছে দবির তার বউ হামিদা আর মেয়ে নূরজাহান বড় রকমের বিপদে পড়েছে। বিপদটা কী বিস্তারিত বোঝার আগেই দবির গাছির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল সে। বাড়ি এসে সেই রাতেই আক্কাসের মুখে ঘটনা শুনেছে। শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ওইটুকু মেয়ে নূরজাহানের তো সাহস আছে! মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটায়া দিছে! যাক ওই বাড়িতে চুরি না করে সে ভালই করেছে।
অবশ্য জেলখানায় বসে আর চুরি না করার একটা সিদ্ধান্ত মুকসেদ এবার নিয়েছিল। সংসার জীবন নাই, কোনও পিছুটান নাই সুতরাং চুরি তার করবার দরকার কী? কে খাবে তার চুরির পয়সা?
