চৌকির মাথার দিকে পাটাতনের উপর মোরশেদার তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে শুয়েছেন পারুর মা, পারু আর গোলাপির শোয়ার ব্যবস্থা হয়েছে উত্তর দিককার বেড়ার লগে, চৌকি বেড়ার মাঝখানকার জায়গায়। কিছু না ভেবেই বেড়ার দিকে শুয়েছিল গোলাপি আর চৌকি ঘেঁষে পারু। চৌকির ঠিক এদিকটাতেই বুলু শুয়েছিল।
অনেকরাত তরি বুলু সেই রাতে বাইরে।
ঘরে গরম। বাইরে ফুটফুটা জ্যোৎস্না। একটু একটু হাওয়া আছে। বাগানের দিকটায় হাঁটতে হাঁটতে গান গাইছিল বুলু। কোনও গানই পুরা না। যে গানের যতটুকু জানে ততটুকুই দরদ দিয়া, মায়াবী গলায় গাইছিল। একটা গানের কথা আজও মনে আছে পারুর।
আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব
আমিও নদীর মতো আসবো না ফিরে আর
আসবো না ফিরে কোনওদিন!
বুলুর গান শুনে মন উদাস হচ্ছিল পারুর। ঘুম আসছিল না। ঘরের আর সবাই গভীর ঘুমে। পারুর ইচ্ছা হল সে একটু বাইরে যায়। বাইরে গিয়া সেও একটু পায়চারি করে উঠানে, কাপড় রোদ দেওয়ার যে তারটা টাঙানো আছে ওই তার ধরে চাঁদের আলোয় একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকে।
মনের মধ্যে অন্যকোনও উদ্দেশ্য নাই, এমনিতেই বেরুতে ইচ্ছা হয়েছিল পারুর। শেষ তরি, বেরিয়েছিল সে। উঠানে গিয়ে তার ধরে উদাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বুলু তখনও বাগানের দিকে হাঁটছে, গান গাইছে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় উঠানের দিকে এল। এসে পারুকে দেখে চমকাল হয়তো, কোনও কথা বলল না। তখনও গান গাইছে সে। গান গাইতে গাইতেই পারুর পাশে এসে দাঁড়াল। আলতো করে একটা হাত রাখল পারুর কাঁধে। সেই প্রথম ওইরকম নির্জন রাতে কোনও পুরুষের স্পর্শ। পারুর। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। শরীরের ভিতরকার কোন অচিনস্তরে গিয়ে যেন নাড়া দিল এই স্পর্শ। পারু কথা বলল না, নড়ল না, কাঁধ থেকে বুলুর হাত সরিয়েও দিল না। চাইল হাতটা বুলু তার কাঁধেই রাখুক। যতক্ষণ ইচ্ছা রাখুক।
শুধু পারুর কাঁধেই তারপর হাতটা রাখেনি বুলু। শুধু একটা হাতই পারুর শরীরের রাখেনি। একসময় পেছন থেকে দুইহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে পারুকে। পারুর বুকে পেটে হাত বুলাতে শুরু করেছে। কখন কোন ফাঁকে পারুর পেটের কাছ থেকে জামা তুলে হাত দিয়েছে ভোলা বুকে।
পারু তখন অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে ডুবে গিয়েছিল, আশ্চর্য এক ভাল লাগায় আচ্ছন্ন। হয়েছিল। সে চাইছিল বুলু যা করছে তা আরও করুক, শরীরের যেখানে ইচ্ছা হাত দিক, যা ইচ্ছা করুক।
কিন্তু ঘরের দুয়ারখোলা। এতগুলি মানুষ একটা ঘরে শুয়ে আছে। যে কেউ যখন তখন বেরুতে পারে, কোনও কিছুই খেয়াল করছিল না পারু। হয়তো বুলু আড়চোখে পাটাতন ঘরের দরজার দিকে তাকাতে পারে। সে হয়তো একটু সাবধানি ছিল।
এভাবে কতটা সময় কেটেছিল মনে নাই পারুর। শুধু মনে আছে একটা সময়ে সে টের পাচ্ছিল তার শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে, তার শরীর যেন গলে গলে যাচ্ছে। পুরুষ মানুষের স্পর্শে যে এমন জাদু সেই প্রথম টের পাওয়া পারুর।
বাকি রাতটুকু পারুর শরীর নিয়ে অন্য এক খেলা খেলেছিল বুলু।
ঘরে চলে আসার পর যে যার জায়গায় শুয়ে পড়েছিল তারা। বুলু চৌকিতে আর ঠিক তার পাশে মেঝের পাটাতনে পারু। কিছুক্ষণ পরই পারু টের পেল চৌকি থেকে বুলুর একটা হাত নেমে এসেছে নীচে আর সেই হাত তার শরীরের আনাচে কানাচে বিচরণ করছে।
সারারাত ওভাবেই কেটেছিল। শুধু হাতাহাতিতেই যেন পুরাপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছিল না পারু। সে চাইছিল চৌকি থেকে নিঃশব্দে তার শরীরের উপর নেমে আসুক বুলু, পুরুষমানুষরা যা করে তাই করুক। কিন্তু বুলু বোধহয় সাহস পায়নি।
পরদিন ভোরবেলা পারু টের পেল তার মাথা ধরে আছে। কিছু ভাল লাগছে না।
সেবার বুলু ছিল তিনদিন, তিনরাত। তিনরাত ধরে একই রকমের আচরণ চলল। আর তিনটি দিন তিনটি রাত পারুর মাথা এক রকম ভাবেই ধরে থাকল। আশ্চর্য ব্যাপার দিনেরবেলা পারু এবং বুলুর অবিরাম দেখা হচ্ছে কিন্তু রাতের ওই আচরণ নিয়ে কেউ কোনও কথা বলছে না, এমনকী কোনও ইঙ্গিতও করছে না। যেন রাতেরবেলা যে আচরণটা একজন মানুষ আরেকজনের শরীর নিয়া করছে সেটা যেন একেবারেই অন্য বিষয়, যে বিষয় নিয়া দিনের আলোয় কথা বলা যায় না। আর সেই প্রথম পারু টের পেল বুলুর লগে তার আচরণটা ছিল অসম্পূর্ণ। আচরণটা পূর্ণ হয় নাই বলে তার মাথা ধরেছে।
এসব ক্ষেত্রে মাথা কি শুধু মেয়েদেরই ধরে? পুরুষমানুষের ধরে না? এই প্রশ্নের উত্তর আতাহারের লগে সম্পর্ক হওয়ার কিছুদিন পর পেয়েছিল পারু। বসন্তের সেই মনোরম বিকালে বুলুর কথা মনে পড়েছিল পারুর, সেই ঘটনার কথা মনে পড়েছিল। সেবার সেই যে প্রথম মাথা ধরেছিল, বিয়ার পর ছয়-সাত মাস ধরে যেন সেই মাথা ব্যথাটাই পাকাপাকি ব্যবস্থা করে নিয়েছে মাথায়, অবিরামই হচ্ছে। কোথায় বিয়ার পর শরীরের চাহিদা পূরণ হবে, স্বামীর কারণে মাথা ব্যথা দূর হবে চিরতরে, তা না ব্যথা স্থায়ী হয়ে গেল। স্বামী যেন স্বামী না, স্বামী যেন সেই ছেলেবেলার আরেকজন বুলু। জাগিয়ে দেয়, নিবৃত্ত করে না।
সেই বিকালেই পারুর জীবনে এসেছিল আতাহার। একজন প্রকৃত পুরুষ। যে জাগাতে জানে, নিবৃত্ত করতে জানে।
কাছাকাছি বয়সের বলে আতাহারের লগে মধুর একটা সম্পর্ক ছিল পারুর। একে দেবর দুয়ে দূর সম্পর্কের ভাই, যখন তখন নানারকমের খুনসুটি তারা করত। সেই বিকালেও খুনসুটি করতেই আতাহার আসছিল। উত্তর দিককার জোড়া হিজলগাছের তলার পায়েচলা পথ দিয়ে চক থেকে উঠে এসেছিল আতাহার। আথালের পাশের আমগাছ তলায় ঘাপটি মেরে দেখেছিল ভাবিছাব কী করে! তারপর পা টিপে টিপে এসে পিছন থেকে চোখ টিপে ধরেছে পারুর। পারু লগে লগেই বুঝে গেছে কাজটা কার। তয় আতাহারের হাতের ছোঁয়া যেন আজ অন্যরকমভাবে উপলব্ধি করল সে। আগেও যে আতাহার তার লগে এই ধরনের আচরণ না করেছে এমন না, তবে ঠিক এভাবে যেন উপলব্ধি করেনি পারু। তা ছাড়া তার গ্রীবার কাছে পড়ছিল আতাহারের শ্বাস প্রশ্বাস, কেমন যেন উষ্ণতাও ছিল সেই শ্বাস প্রশ্বাসে। ফলে শরীরের ভিতর সেই ছোটবেলাকার আমেজ ফিরে আসছিল পারুর। মনে হচ্ছিল আতাহার যেন আতাহার না, তার স্বামীর ভাই, দেবর না, আতাহার যেন সেবারের সেই উদ্দাম বর্ষাকালের বুলু। তার শরীর শুধুই জাগিয়ে দিবে যে, নিবৃত্ত করবে না।
