সেই বছর বর্ষা একটু যেন তাড়াতাড়িই হয়েছিল। বর্ষা শুরুর দেড় দুই সপ্তাহের মাথায় গ্রামের মাঠঘাট, পুকুর ডোবা সব পানিতে ডুবে গেল। একে পদ্মা থেকে রজতরেখা ধরে আসা পানি খাল বেয়ে ঢুকছিল গ্রামে, লগে আছে একটানা বৃষ্টি, বড় বড় ফোঁটার অবিরাম বৃষ্টি, এরকম বৃষ্টিকে বিক্রমপুর এলাকার লোকে বলে ‘ঢল। একদিকে পদ্মা থেকে আসা পানি আরেকদিকে ঢলের পানি, দুই পদের পানি মিলে মাস যেতে না যেতে লোকের উঠান পালানও ডুবুডুবু। পারুদের বাড়ির চারদিকে পানি। বাঁধানো ঘাটলাঅলা পুকুরের দক্ষিণ পাশের উঁচু হালট সামান্য জেগে আছে, পুকুরের পুব-উত্তর পারে গাছপালা ঘেরা জঙ্গুলে জায়গাটা ডুবুডুবু। পারুদের পশ্চিমের ভিটির বড়ঘরটার পিছনে বাঁশবাগান, সেই বাগানে একটু একটু করে ঢুকছে পানি। রান্নাঘরটা দক্ষিণের ভিটিতে, এই ঘরের পিছনে কচুবন, কচুগাছগুলির মাজা তরি উঠে গেছে পানি। শুধু পুবের ভিটির, পুবে-পশ্চিমে লম্বা পাটাতন ঘরটার লগের দক্ষিণে যে ফলফুলের বাগান সেই বাগানে ঢোকে নাই পানি। বর্ষার শুরু দিকে দিন বিশেক স্কুল বন্ধ। ওই বছরটাই ছিল পারুর স্কুলজীবনের শেষ বছর। ক্লাস এইটে পড়ছে। একটু বেশি বড় হওয়ার পরই স্কুলে দেওয়া হয়েছিল তাকে। ক্লাস এইটে পড়বার সময় পারুর বয়স ষোলো-সাড়েষোলোর কম না। লম্বা স্বাস্থ্যবতী মেয়ে। ওই বয়সে তাকে দেখাত আর একটু বয়স্ক।
সেবারের সেই বর্ষায়ই ঘটেছিল ঘটনা।
পারুর বাবা আফাজউদ্দিন আর বড়ভাই রফু বরিশাল পটুয়াখালির ওদিককার গলাচিপা এলাকায় কাটাকাপড়ের কারবার করে। ওদিকটা ভাটির দেশ। চারদিকে শুধুই নদী খাল বিল, শুধুই পানি। কারবারটা তাদের নৌকায় নৌকায়। নৌকা নিয়া একেকদিন একেক হাটেবাজারে যায়, সেখানে দোকান সাজিয়ে বসে, সন্ধাবেলা দোকান গুটিয়ে আবার ওঠে। নৌকায়। মাঝিরা সারারাত নৌকা বেয়ে যায় অন্য এলাকার হাটবাজারে। এই কারবার। কারবারটা মন্দ না। রোজগার ভাল। তবে থাকাখাওয়া নৌকায় এই এক যন্ত্রণা। আর ছয়মাস-নয়মাসের আগে বাড়ি ফিরা হয় না, ওই হচ্ছে আরেক যন্ত্রণা। তবে পারুদের বাড়ির আরও যে তিন শরিক তারাও ওই একই এলাকায় একই কারবার করে। দুই-তিন মাসের মধ্যে ঘুরে ফিরে কেউ না কেউ বাড়ি আসেই। পারুর বাপ আর বড়ভাই তাদের লগে টাকাপয়সা পাঠায়, তাতে সংসার চলে। খোরাকির কোনও অসুবিধা হয় না।
পারুরা চারবোন তিনভাই। বড়বোন মোরশেদা খুবই সুন্দরী। ভাইবোনদের মধ্যে তার গায়ের রংই ফরসা। হলে হবে কী, এই সুন্দরী বোনটাকে বাবা বিয়া দিছে দোজবরের কাছ। মোরশেদার জামাই হালিম আগে একটা বিয়া করছিল। আবদুল হাই নামের তিন বছরের একটা ছেলে রেখে বউ মারা যায়। হালিম অবস্থাপন্ন। ঢাকার সদরঘাটে থান কাপড় কাটাকাপড় মিলে চার-পাঁচখান দোকান। অবস্থা ভাল দেখেই এত সুন্দরী বড়মেয়েকে আফাজউদ্দিন হালিমের কাছে বিয়া দেয়।
তয় হালিম বদরাগী স্বভাবের লোক। পান থেকে চুন খসলেই চেতে বোম হয়ে যায়। একবার চেতলে রাগ কমতে সময় লাগে। বউর উপর চেতলে শ্বশুর শাশুড়ি আর অন্যান্য ময়মুরব্বি কিছু মানে না, সবার সামনেই বকাবাজি এমনকী মারধরও শুরু করে।
পারুদের পরিবারের সবাই নিরীহ, নরম আর নির্বিরোধ স্বভাবের। আফাজউদ্দিন আর রফু তো অতি সজ্জন! রাগারাগি দূরের কথা, জোরে কথাটা পর্যন্ত বলে না।
এই পরিবারের একটু রাগী ছেলে হচ্ছে কামরুল, কামু। কামু সেবার বাড়িতে ছিল না। গ্রামের মির্জাবাড়িতে কিছুদিন আগে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতি কেসে গ্রামের আরও কয়েকজন উঠতি যুবকের লগে কামুকেও আসামি করা হয়েছে। কেসের তদবির করতে কামু এখন ঢাকায়। মিরপুরে আফাজউদ্দিনের দুর সম্পৰ্কীয় এক ভাইয়ের বাসায় থাকে। ভাইয়ের নাম হায়দার। হায়দারের মেজছেলে বুলু সেই বর্ষায় হঠাৎ করেই বেড়াতে এসেছিল পারুদের বাড়িতে। পারুর চেয়ে বছর তিন-চারেকের বড় হবে। দেখতে সুন্দর। মায়াবী চেহারা। একটু উদাস উদাস ধরনের। কথাটথা কম বলে। তবে ভারী সুরেলা গলা তার, ভারী সুন্দর গান করে।
পারুর মেজোবোনের নাম নাহার। তার বিয়া হইছে বৈলতলি গ্রামে। শ্বশুর নাই, এক বিধবা ননদ আর শাশুড়ির লগে সে থাকে গ্রামে, জামাই তার ছোটভাই নিয়া ঢাকার নিউমার্কেটের কাঁচা বাজারের ফুটপাতে বসে রেডিমেড জামাকাপড় বিক্রি করে। থাকে বাজারের লগের মেসে।
বাড়িতে সেবার পারু আর তার ছোট তিনটা ভাইবোন। পারুর পর এক ভাই মন্টু, মন্টুর পর বোন গোলাপি, তারপর সবশেষ ভাই মিজু। এই অবস্থায় হঠাৎ করেই বুলু এসে হাজির। যেদিন দুপুরের পর খাজুরতলার ঘাটে লঞ্চ থেকে নামল বুলু, সেদিন সন্ধার সময় একখান কেরায়া নৌকা এসে থামল পারুদের বাড়ির সামনের হালটে। নৌকা থেকে সপরিবারে নামল হালিম। মোরশেদার কোলে মাস সাতেকের ছেলে আর হালিমের হাতে ধরা তিন বছরের মেয়ে।
একদিনে দুই আত্মীয় বেড়াতে আসছে, বাড়িতে ভাল রকমের হইচই পড়ে গেল। রান্না খাওয়াদাওয়ার বেশ ভাল আয়োজন। তখন কয়েকদিন ধরে মেঘ বৃষ্টিটা একদমই নাই। আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়। ভাল গরম পড়েছে।
বাড়িতে ঘর মাত্র দুইটা, এতগুলি লোকের থাকার ব্যবস্থা কী হবে!
মেয়েজামাইকে বড়ঘর ছেড়ে দেওয়া হল। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে বুকের শিশুটিকে নিয়া স্বামীকে নিয়া বড়ঘরের দরজায় খিল তুলে দিল মোরশেদা আর পাটাতন ঘরে গিয়া ঢুকল বাকিরা। পাটাতন ঘরের দক্ষিণের জানালা ঘেঁষে বড় চৌকি। সেই চৌকিতে পশ্চিমে মাথা দিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা হল উত্তর দিক থেকে প্রথমে বুলু, বুলুর পর মিজু তারপর দক্ষিণের জানালা ঘেঁষে মন্টু।
