আইজকাইল আমার কোনও কোনও সময় মনে অয় কী জানচ হাসু, মনে অয় পেড আমার পুরাপুরি বাজা আছিলো না। অল্পবিস্তর গন্ডগোল আছিলো পেড়ে। ডাক্তার কবিরাজ দেহাইলে, চিকিচ্ছা করলে গন্ডগোলডা যাইতো গা। পোলাপান আমার অইতো। কপালের দোষ, বেবাকঐ কপালের দোষ। গরিবের ঘরে না জন্মাইয়া যুদি বড় গিরস্তের ঘরে জন্মাইতাম, ধনী মাইনষের লগে যুদি বিয়া অইতো তাইলে এই জীবনডা অন্যরকম অইতো। টেকাপয়সা খরচা কইরা জামাই আমার পেড ভাল কইরা দিতো, পোলাপান লইয়া। অন্য মাইয়াছেইলার লাহান সুখের সংসার করতাম আমি। আহা রে, জীবন!
হাসু ততক্ষণে একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফুফুর কাছে আর যেন কিছুই জানার নাই তার। যা জানতে চেয়েছে তা তো জেনেছেই যা না চেয়েছে তাও জেনেছে। একজন মানুষের মনের অতলে লুকিয়ে থাকা সব কথাই আরেকজন মানুষ আজ জেনে গেছে। এখন বলার আছে হাসুর নিজের সবকথা। সেসব এখন আর বলতে ইচ্ছা করছে না। এখন বললে যেন সেইসব দুঃখের ভিতরকার প্রকৃত বেদনাবোধ ঠিকঠাক বোঝানো যাবে না ফুফুকে। বলতে হবে আরেকদিন, যেদিন ফুফুর ভিতরকার সব কথা জেনে প্রবল কষ্টের যে ধাক্কা হাসুর বুকে লেগেছে সেই ধাক্কার প্রচণ্ডতা কিছুটা হলেও কমে আসবে।
বাইরে চৈত্রমাসের জ্যোৎস্না রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল তখন। ঝিঁঝিরা ডেকে যাচ্ছিল আপন মনে। গাছের পাতায় পাতায় ছিল আমের বোউলের গন্ধে মাতোয়ারা হাওয়া। দূরে হঠাৎ হঠাই ডেকে উঠছিল ক্ষুধার্ত শিয়াল। সবকিছুর পরও প্রকৃতি উদাস হয়ে ছিল আপন মহিমায়।
.
বিয়ার পর পরই স্বামীর শরীরের ঘাটতিটা বুঝে ফেলেছিল পারু।
বিছানায় পুরুষের উদ্দামতা বলে কিছু নাই তার। নতুন বউর লগে দুর্বল কিছু আচরণ করেই নিস্তেজ হয়ে যায়। মরার মতো ঘুমায়া পড়ে। এদিকে শরীরভরা চাহিদা নিয়ে জেগে থাকে পারু। ছটফট করে। রাতের পর রাত ঘুম হয় না। মাথা সারাক্ষণ ধরে থাকে। কালিমায় কালো হয় ডাগর দুইখান চোখের কোল। মুখে হাসি নাই, বিষণ্ণতার ছায়া। তারপরও সংসারকর্ম করতে হয়। বিয়ার পর পরই মোতাহারকে আলাদা করে দিয়েছেন। মান্নান মাওলানা, দুইজন মানুষের হলেও সংসার তো! কাজের আকাল নাই সেই সংসারে। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর তরি একটানা কাজ। রান্নাবান্না, গোসল, খাওয়া। দুপুর শেষ হওয়ার আগ তরি আজার নেই।
দুপুরের পর ঘণ্টা-দেড়ঘণ্টার একটা ঘুম ছোটবেলা থেকেই বাধা পারুর। শ্বশুরবাড়িতে এসেও সেই অভ্যাস বজায় ছিল। তার দেখাদেখি মোতাহারও শুয়ে পড়ত বউর পাশে। কয়েকদিনের মধ্যে তারও দুপুরের ভাতঘুমের অভ্যাস হয়ে যায়। বিকালের দিকে ঘুম। থেকে উঠেই চকেমাঠে চলে যেত মোতাহার আর পারু মনমরা ভঙ্গিতে সামান্য সাজগোজ করত।
বিকালের দিকে সাজগোজের অভ্যেসটা হয়েছিল তার বালিকা বয়স থেকে। স্বর্ণগ্রাম হাইস্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছিল। স্কুল থেকে ফিরে ভাত খেয়েই ঘুম দিত, ঘুম ভাঙার পর মা সুন্দর করে চুল বেঁধে দিতেন, চোখে কাজল দিতেন। কোনও কোনওদিন শাড়ি পরিয়ে দিতেন। সাজগোজের পর মন প্রফুল হয় মানুষের। পারুর হয় একটু বেশি। সেই বালিকা বয়সে প্রফুল্ল মন নিয়া প্রতিটি বিকাল পারু কাটাত তাদের বাড়ির বাঁধানো ঘাটলায় বসে, বাড়ির সামনের গাছপালা ঘেরা জায়গাটায় ঘুরে ফিরে।
তাদের বাড়িটা ছিল গাছপালায় ঘেরা, পুরানো ধরনের হিন্দুবাড়ি। ওই এলাকাটা হিন্দু প্রধানই ছিল। গ্রামগুলির নাম কামাড়খাড়া বাণীখাড়া নশঙ্কর। নামকরা মুখার্জি ব্যানার্জিদের বাড়ি ছিল। পার্টিশানের সময় সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন কলকাতায়। পানির দামে বাড়িঘর কিনে রেখেছে মুসলমানরা। কেউ কেউ আবার কিনেওনি, দখল করেছে। দিনে দিনে চেহারা বদলে গেছে বাড়িগুলির। তারপরও কোনও কোনও বাড়ির পুকুরে এখনও রয়ে গেছে বাঁধানো ঘাটলা, বাড়ির ভিতরে বাইরে প্রচুর গাছপালা, বাগান, বনেদিআনার ছাপ। পারুদের বাড়িটা তেমন।
বিকালবেলা যখন রোদ উঠে যেত গাছপালার মাথায়, রোদছায়ার মনোরম একটা পরিবেশ তৈরি হত চারদিকে, পাখি ডাকত, হাওয়ায় ভাসত ফুলের গন্ধ তখন সাজগোজ করা প্রফুল্ল মনে পুকুরঘাটে বসে থাকতে খুব ভাল লাগত পারুর, গাছপালায় ভরা বাগানে বেড়াতে ভাল লাগত। মনে আনন্দময় একটা ভাব সারাক্ষণই থেকে যেত।
শ্বশুরবাড়িতে এসে এই ভাবটা আর ছিল না। স্বামীর শারীরিক দুর্বলতা হরণ করেছিল মনের প্রফুল্লতা। তবু বিকালের মুখে মুখে সাজতে বসত পারু। চুলে বেণি করত, চোখে কাজল দিত। কোনও কোনওদিন দুপুরে পরা শাড়ি বদলে সুন্দর শাড়ি পরত। এমনিতে নতুন বউ, গয়নাগাটি তার শরীরে দুই-একটা থাকতই। নাকে সুন্দর নাকফুল, কানে সরু রিং, হাতে কাঁচের চুড়ির লগে দুইখান করে সোনার চুড়ি, গলায় চিকন একখান সোনার চেন। সাধারণ মেয়েদের তুলনায় একটু বেশি লম্বা সে, একহারা সুন্দর গড়ন, শ্যামল বরণ মুখোন খুব মিষ্টি। বিকেলের মুখে ওই সামান্য সাজে অসাধারণ লাগত পারুকে।
সেই বিকালেও লাগছিল।
আকাশ রঙের শাড়ি পরে নিজের এক চিলতা উঠানে পায়চারি করছিল পারু। কেন যে সেই বিকালে তার বালিকা বয়সের একটি ঘটনার কথা মনে পড়েছিল।
তখন বর্ষাকাল। গ্রামের পাশে বড়সড় খালের মতন যে নদী, নদীর নাম রজতরেখা। এই নদী উত্তরে গিয়ে শেষ হয়েছে মুনশিগঞ্জের কাটাখালির ওদিকে, আর দক্ষিণে দিঘিরপারের ভিতর দিয়ে গিয়ে পড়েছে পদ্মায়। খরালিকালে রজতরেখা আর নদী থাকে না, একেবারেই খাল, কোথাও কোথাও মরাখাল। পানি কমে মানুষের গলা বুক তরি নামে, কোথাও কোথাও মাজা সমান। বর্ষার মুখে মুখে পদ্মা থেকে আসা পানিতে প্রথমে টইটম্বুর হয় রজতরেখা, তারপর গ্রামের ভিতর ঢুকে যাওয়া নালার মতন সরু খাল দিয়া পানি পাঠাতে থাকে পশ্চিম পাশের গ্রামগুলিতে। নদীর পুবপারে গ্রাম কম, চরাভূমি। মানুষের ঘরবাড়ির চেয়ে শস্যের জমি বেশি।
