দুঃখে বুকটা আমার তহন ফাইট্টা যায় তয় কেঐরে কিছু কই না। যা আছে কপালে, আমি ওই বাইত্তে ঝিয়ের কামেঐ যামু গা। বাপের বাইত্তে কোনওদিন আহুম না।
তর মা’র লগে দইল্যাদার তহন বিয়া ঠিক অইয়া গেছে। বিয়ার দিন তারিকও ঠিক অইছে। ছোডচাচায় আমারে কইলো ভাইয়ের বিয়া খাইয়া যাইচ। আমি কইলাম, না। কাকা, থাউক। আমি পোড়া কপালি, এই হগল সুক আহ্লাদ আমার কপালে নাই। আমি আগেঐ যাইগা। আর নতুন বউ সংসারে আইয়া দেকবো হের নন্দে ঝিয়ের কামে মেলা। দিছে ভিন গেরামে, নুতন বউর কাছে শরম পাওন লাগবো। আগেঐ যাইগা।
কাকায় কইলো, হ, কথা মন্দ কচ নাই। তয় যা গা। বুকের দুঃখ বুকে চাইপপা, মাজারো ফুবার লগে পথে নামলাম। দুই হাতে বুকের কাছে ধরা ছোট্ট একখান গাট্টিতে আমার দুইহান ফিনের কাপড়, ছায়া বেলাউজ, আরও দুই চাইরহান টুকুর টাকুর জিনিস। দইল্যাদায় আমারে একবার কইলোও না, অহন যাই না বইন, বিয়ার পর যা। এই বাইত্তে আমি আইয়া উটলাম দোফরের পর। আমারে দিয়া ফুবায় গেল গা। মনে আছে ফুবার যাওন দেইখা আমি পোলাপানের লাহান ফোঁপাইয়া ফেঁপাইয়া কানছিলাম। মনে অইছিলো আমার শেষ আপনজন আমারে অচিন এক বাইত্তে রাইখা চিরদিনের লেইগা গেল গা। এই দুইন্নাইতে আমি অহন একলা। আমার কেঐ নাই।
রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কতকাল আগের কথা, তাও বেবাক মনে আছে। পয়লা পয়লা ভাল্লাগতো না এই বাইত্তে, আস্তে আস্তে দেহি ভাল লাগে। বেবাকঐ কেমুন জানি আপনা আপনা অইয়া ওডে। সব কিছু নিজের মনে অয়। মাইনষের নিয়মঐ এইডা, বুজলি হাসু, একহানে থাকতে থাকতে কুনসুম জানি হেই জাগাড়াঐ তার আসল জাগা অইয়া যায়। এই বাড়িডাও দিনে দিনে আমার আসল বাড়ি অইয়া গেল।
গণি মিয়ার সীমানায় তাদের বুড়া কুত্তাটা হঠাত্র দু-তিনটা ঘেউ দেয় এ সময়। চাঁদের আলোয় দূরে কোথায় একটানা ডেকে যাচ্ছে একটা কোকিল পাখি। তেঁতুলগাছটার ওদিকে বোধহয় বাদুড় ওড়াউড়ি করছে, ডানা ঝাঁপটাবার শব্দ পাওয়া যায়। বাঁশের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে হু হু করে আসছে চৈত্র রাতের হাওয়া। গুটি ধরে আসার পরও পারুর ঘরের পিছন দিককার আমগাছ থেকে বোউলের গন্ধ এসে মিশছে হাওয়ায়। এই হাওয়া কিছুক্ষণের জন্য যেন বুকে আটকে রাখল রহিমা। সেই ফাঁকে হাসু বলল, তয় তোমগো বাইত্তে তুমি আবার কবে গেলা? এই বাইত্তে আহনের কতদিন পর?
রহিমা বলল, দেড়-দুই বছর পর। তুই হইছস হুইন্না গেলাম। একমনে যাইতে চাই নাই, আরেক মনে চাইছি। ভাইয়ের বিয়ার আগে আহনের দিন তো মনে মনে কইছিলাম আর কোনওদিন ফিরত আমু না। দেড়-দুই বচ্ছর হেই ভাবটাঐ আছিলো মনে। তারবাদে যহন হোনলাম আমার ভাইয়ের একহান মাইয়া অইছে, হুইন্না মনডা নুলাম অইয়া গেল। একে ভাইর বউরে দেহি নাই, তার উপরে অইছে মাইয়া, দুইজনরে দেহনের লেইগাঐ মনডা আনচান আনচান করতে লাগলো। নিজে বাজা মাইয়াছেইলা, পোলাপান অইবো না কোনওদিন, এর লেইগা পোলাপানের লেইগা একখান আকাই (আকাক্ষা) আমার আছে। তার উপরে আছে নিজের বাপের ভিডির টান, যত পরঐ কইরা দেউক ভাইয়ে, ভাই তো ভাইঐ, হের আবার একখান মাইয়া অইছে, মাইয়াডার মোক দেহনের লেইগা মনডা ছুঁইট্টা গেল। হুজরানিরে কইলাম পাঁচ-ছয়দিনের লেইগা বাইত্তে যামু। হেয় কয়, যা। একদিন গিয়া উটলাম বাইত্তে।
বোজলাম, তয় ষোল্লঘর থিকা কেডা আইয়া তোমারে বাড়ির খবর কইতো? আমার জন্মের কথা কে আইয়া কইলো তোমারে?
দ্যাশগেরামের খবরাখবর কেমতে কেমতে জানি মাইনষের কাছে আইয়া পড়ে, বুজলি। সীতারামপুরের একজন মানুষ আছিলো, কারিকর। নাম অইলো মোসলেম। কারিকরের কাম হেয় করতো না, করতো দোকানদারি। তয় ঘরে বইয়া দোকানদারি না। কান্দে ভার লইয়া, ভারের দুই মিহির চাঙ্গারিতে মালছামান লইয়া গেরামে গেরামে যাইতো। বেড়া আবার ফউকরালিও (ফকিরি, ওঝার কাজ) করতো। কেঐর গলায় মাছের কাঁডা বিনলে বিড়বিড় কইরা দোয়া পইড়া কইতো, এইবার সেঁক গিলো। যার গলায় কাঁডা বিনছে হেয় ঢোক গিল্লা দেকতো কাডা নাই, গেছে গা। এই মোসলেম পেরায় পেরায়ঐ আইতো এই বাইত্তে, আবার দোকানদারি করতে আমগো গেরাম মিহিও যাইতো। আমার মোকে হুইন্না আমার ভাইরে চিনছিলো। ওই মোসলেম মোদি আইয়াঐ তর জন্মের খবর আমারে দিছিলো। রহিমা, তোমার ভাইর একখান মাইয়া অইছে।
তারবাদে তুমি গেলা?
হ।
যাওনের পর তোমার ভাইয়ে তোমারে দেইক্কা কী করলো?
হেয় দুইফইরা ভাত খাইতে বইছে। ভাবীছাবে তারে ভাত বাইড়া দিতাছে। তরে হোয়ায় রাকছে চকির উপরে। এই এত্তোড়ু মাইয়া তুই। নিঃসাড়ে ঘুমাইতাছিলি। আমারে দেইক্কাঐ তর বাপে মোকহান কালা কইরা হালাইলো। যেন আমি তার খাওনে ভাগ বহাইতে গেছি। দেইক্কা আমি কইলাম, মোক কালা কইরেন না দাদা, আমি এই বাইত্তে থাকতে খাইতে আহি নাই। ভাস্তি অইছে হুইন্না মনডা ছুঁইট্টা গেল, এর লেইগা অরে ইট্টু দেকতে আইছি।
হুইন্না তর বাপে কথা কইলো না, তর মায় পাগলের লাহান ফালদা বাইরে আইলো। পোলাপানের লাহান দুইহাতে আমারে প্যাচাইয়া ধরলো। হায় হায় কয় কী, আমার নন্দে আইছেনি? আহেন বুজি, ঘরে আহেন। আমার মাইয়া তো আপনের মাইয়াঐ। দেহেন ওই যে হুইয়া রইছে।
তর মা’র ব্যাভার দেইক্কা চোক্কে পানি আইয়া পড়লো আমার। এত ভাল একহান মানুষ আমার ভাইর বউ অইয়া আইছে! এমুন মায়া লাইগ্যা গেল তার লেইগা!
