আমারে বিয়া দেওনের পর বচ্ছরও ঘোরে নাই বাবায় মরলো। মায় তো মরছিলো। আরও আগে। দইল্যাদায় তহনও বিয়া করে নাই। তর মায় আহে নাই সংসারে। অবস্তাও ভাল না আমগো। বাবায় মরণের আগে হের ভাইবেরাদররা জাগাজমিন খেতখোলা বেবাক ভাগ করছে। আমগো ভাগে যেডু জমিন পড়ছে হেই জমিন চইয়া তিন-চাইরজন মাইনষের বচ্ছর চলবো না। বাপের জাগাজমিনের ভাগ দুই-ইটু মাইয়ারাও পায়। চিন্তা করলাম বাইত্তে যাই, গিয়া দইল্যাদারে কই, জাগা জমিনের দাবি আমি করি না,তয় আপনে খালি এই বাইত্তে আমারে থাকতে দেন। আপনে আমার ভাই, আপনে জাগা না দিলে আমি যামু কই।
এই তরি শুনে হাসু বলল, ইস, আর মানুষ পাইলা না তুমি? গেলা আমার বাপের কাছে? ওই শুয়োরের পোয় মানুষনি? অর কাছে গেলা ক্যা?
হের কাছে ছাড়া আর যামু কই? আছে কে আমার?
আর কোনও আততিয় স্বজন আছিলো না? দুইন্নাইর বেবাক মাইনষের ঐত্তো আততিয় স্বজন দুই-চাইরজন থাকে। তাগো মইদ্যে কি বেবাক মানুষঐ খারাপ? কেঐর লেইগা কেঐর মায়া মহব্বত নাই?
থাকবো না ক্যা, আছে। তয় গরিব মাইনষের আসলে মায়া মহব্বত থাকে না। যাগো। প্যাডে ভাত নাই, নিজের প্যাডের ভাত জোগাইতে যাগো দিন যায় তারা আবার অন্য মাইনষেরে মায়া দেহাইবো কেমতে? আমগো আততিয় স্বজন বেবাক অইলো গরিব। আশিন কাতি মাসে না খাইয়া থাকে অনেকে। এমুন আততিয় স্বজনরা কে কারে জাগা। দিবো নিজের সংসারে? কে কারে খাওয়াইবো?
হ, এইডা ঠিক কথা। আইচ্ছা কও দিহি, তারবাদে বাবায় তোমারে কী কইলো?
কইবো আর কী, জামাই তালাক দিছে যেই বইনরে হেই বইন বাইত্তে আইয়া উডনের লগে লগেঐত্তো তারে আর খেদাই দেওন যায় না। দুই-চাইরদিন থোম ধইরা রইলো। হেই ফাঁকে দেহি বাইত্তে ঘটক আহে, দইল্যাদায় নিজেঐ নিজের বিয়ার লেইগা মাইয়া দেকতাছে। দুইদিন দেখলাম আমার ছোডচাচা আর চাচতো ভাইগো লইয়া শাট পায়জামা ফিন্দা, মোকে ছুনু পাউডার মাইক্কা মাইয়া দেকতে গেল। বিয়াও ঠিক অইয়া গেল। তহন একদিন ছোডচাচা আর চাচতো ভাইগো লইয়া, দুই ফুবু আইলো বাইত্তে, তাগো। পোলাপানরা আইলো, বেবাকতে মিলা বইয়া ঠিক করলো আমার অহন উপায় অইবো কী? তালাক অওয়া মাইয়ার কত বিয়া অয় আবার! তয় হেইডা তো আর আমার অইবো না। আমি তো বাঁজা! বাজা মাইয়া কে বিয়া করবো? আর ভাইর সংসারেও যে আমি থাকুম, ভাই বিয়া করতাছে, দিনে দিনে সংসার বড় অইবো, হেয় আমারে টানবো কেমতে? খাওয়াইবো কী? শেষমেশ আমার মাজারো ফুবায় কইলো, রহিরে কোনও বড়গিরস্ত বাইত্তে কামে দিয়া। দিলে অয়। বিক্রমপুরে পয়সাআলা গিরস্তের আকাল নাই। ঝি চাকর ম্যালা লাগে তাগো। ইট্টু চেষ্টা করলে যে-কোনও গেরামে কামে দিয়া দেওন যাইবো অরে। ভাল গিরস্ত বাড়ি পাইলে হারাজীবনঐ এক বাইত্তে থাকতে পারবো। ল বেবাকতে মিলা চেষ্টা কইরা দেহি অমুন বাড়ি পাইনি। যতদিন না পাই ইট্টু কষ্ট অইলেও দইল্যার সংসারেঐ রহি থাউক।
ওই ফুবাঐ কয়দিন বাদে কেমতে কেমতে জানি মেদিনমণ্ডলের এই বাড়িডা বিচড়াইয়া বাইর করলো। আল্লাআলা মাইনষের বাড়ি। এই বাইত্তে একজন বান্দা ঝি লাগবো। ঝি যুদি ভাল অয় হারাজীবন থাকতে পারবো। হুইন্না আততিয় স্বজনরা বেবাকতে খুশি। মাওলানা সাবের বাড়ি অইলে তো ভাল। যুবতী মাইয়া ওইরকম বাইত্তে ভাল থাকবো। মাইয়ার মিহি কেঐ কুনজর দিবো না।
শুনে খিক করে হাসল হাসু। ইস মাইনষের যা চিন্তাভাবনা না! হুজুর মুজুর হোনলেঐ মাইনষে মনে করে তাগো লাহান ভাল মানুষ আল্লার দুইন্নাইতে আর নাই। ভিতরে ভিতরে আলেমগুনি যে কী জালেম হেইডা বোজে খালি তোমার-আমার লাহান মাইনষে।
হ এইডাঐ ঠিক কথা।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে রহিমা বলল, ওই হাসু, হুজুরে তরে কোনওদিন পাও পোও টিপতে ডাক দিছে?
না, অহনতরি দেয় নাই।
কোনওদিনও দেয় নাই?
না।
তয় দিতে পারে। সাবধানে থাকিস।
অহন আর সাবধানে থাকনের কিছু নাই আমার।
ক্যা?
আমি কি অহন আর মাইয়ামানুষনি! থোও আমার কথা। আমার কথা পরে হুইন্নো। আগে তোমার শেষ করো।
অনেকক্ষণ সোজা হয়ে শুয়ে কথা বলার ফলে ক্লান্ত লাগছে রহিমার। হাসুর দিকে পাশ ফিরল সে। কত কথা! হারারাইত ধইরা কইলেও ফুরাইবো না।
ফুফুকে পাশ ফিরতে দেখে হাসু এবার সোজা হল। আরে কও তুমি। ফুরাইবো। আইজ না ফুরাইলে আরেক দিন কইবা।
আইচ্ছা। তয় তর ঘুম আইতাছে না তো?
না। তোমার?
আমারও না।
তয় কও।
মাইনষের বাইত্তে ঝিয়ের কাম কইরা জিন্দেগি কাড়াইতে অইবো হোননের পর থিকা আমি এক্কেরে থোম ধইরা গেছি। মনডার মইদ্যে এমুন দুঃখু অইছে! আহা রে, গিরস্ত ঘরের মাইয়া, পেটখান বাজা অইছে দেইক্কা, কপালের ফ্যারে কোনমিহি অহন যাইতে অইতাছে। ইচ্ছা করলে ভাইয়ে আমারে তার সংসারে রাকতে পারতো। নাইলে নিজের ভাইয়ের সংসারেঐ ঝিয়ের কাম কইরা খাইতাম! অন্যের বাইত্তে যাওনের কাম কী! যেই সংসারে দুইজন মাইনষের আহার জোডে হেই সংসারে তিনজনেরও জোডে। নাইলে নিজেগো গেরামে এই বাইত্তে ওই বাইত্তে ধান বাইন্না, মুড়ি ভাইজ্জা, চাউল কুইট্টা খাইতাম। হারাদিন কাম করতাম মাইনষের বাইত্তে রাইত্রে আইয়া খালি হুইয়া থাকতাম নিজেগ বাইত্তে। বড়ঘরে নাইলে দইল্যাদায় তার বউ লইয়া থাকতো, আমি নাইলে থাকতাম রান্নঘরে! এইভাবে কেঐ আমারে লইয়া চিন্তা করলো না! সংসার বাড়ি থিকা, গেরাম থিকা ভিন গেরামে পাড়ানের বন্দোবস্ত করলো!
