তারপর হাতের ঘড়ি দেখল গণি। দেখে ছটফটা ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল, পাগলের মতো ছুটে গিয়ে বড়ঘরের দরজার সামনে রাখা ব্যাগটা হাতে নিল। আর দেরি করণ যাইতাছে না দাদা, আমি মেলা দেই।
মান্নান মাওলানাও উঠলেন। আচ্ছা যা।
গণি যখন উত্তর দিককার নামার দিকে নেমে যাচ্ছে, গণির দিকে তাকিয়ে মান্নান মাওলানা মনে মনে বললেন, তর কথা ঠিক না গইন্না। আমি ইট্টুও বদলাই নাই। আমি খালি থোম ধইরা রইছি। অহনঐ যুদি গাছির মাইয়ারে লইয়া কাইজ্জাকিত্তন আরম্ব করি তাইলে আমার আসল কামডা অইবো না। ওই কামডা করনের লেইগা দরকার অইলে দুই চাইর বচ্ছর দেরি করুম আমি। তারবাদে যেই ছ্যাপ ছেমড়ি আমার মোকে ছিডাইছে হেই ছ্যাপ দিয়া অরে আমি….।
.
গোলাঘরের পুবদিককার বাঁশের বেড়ার তলা দিয়ে চাঁদের এক টুকরা আলো এসে ঢুকেছে। ঘুটঘুটা অন্ধকার ঘর ওইটুকু আলোয় অপার্থিব হয়ে উঠেছে। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে হাসু বলল, ও ফুবু, ঘুমাইছো?
হাসুর দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে রহিমা। ভাইঝির কথায় সোজা হল। না।
হাসু শুয়ে আছে রহিমার দিকে মুখ করে। চৌকির উপর থেকে তার খোলা চোখ গিয়ে পড়েছে পুবদিককার বেড়ার ওদিকে। চাঁদের আলোটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। এই আলোর কারণেই কি না কে জানে, ঘুম আসছেই না হাসুর। মন কেমন করছে। মনে হচ্ছে। আজ রাতে ঘুম আর আসবেই না। মনে হচ্ছে আজ রাতটা ফুবুর লগে গল্প করে কাটালে ভাল লাগবে। এই কারণেই রহিমাকে সে ডাকল। রহিমা সোজা হয়ে শোয়ার পর মনটাও আনন্দে নেচে উঠল হাসুর। ওই যে তোমারে একদিন বিয়ালে একখান কথা জিগাইতে চাইছিলাম ফুবু, তোমার মনে আছে?
রহিমা বলল, থাকবো না ক্যা?
কথাহান আউজকা জিগাই?
জিগা।
হুইন্না তুমি আবার চেইত্তা যাইবা না তো?
রহিমা হাসল। তর মনে অয় চেতুম?
চেততে পারো।
আমি ইট্টু ইট্টু বুজছি তুই কী জিগাবি। হেদিন বিয়ালেঐ বুজছিলাম। জিগা, আমি চেতুম না।
না চেতলা, হাচা কথা কইবা তো?
উদাস দুঃখী গলায় রহিমা বলল, কমু। মনের বেবাক কথা হারাজীবন মনের মইদ্যে চাইপপা রাখলাম। চাইপপা রাখতে রাখতে বুকের ভিতরডা পাথরের লাহান অইয়া গেছে। কেঐরে যুদি বেবাক কথা একদিন কই, বুকের পাথরডা মনে অয় নামবো। পাতলা বুক লইয়া মরতে পারুম। তুই জিগা, যা তর মনে লয় জিগা! বেবাক সত্যকথা তরে আমি কমু। একখানও মিছাকথা কমু না, একখান কথাও হামলামু (লুকানো) না। লজ্জাশরমের কথাও কইয়া দিমু।
ফুফুর কথা শুনে বুকের ভিতরটা কী এক মায়ায় মোচড় দিয়ে উঠল হাসুর। একটা হাত ফুফুর বুকের কাছে রাখল সে। গভীর মায়াবী গলায় বলল, আমার কাছে তোমার আবার শরম কী? আমারে তুমি বেবাক কথা কইতে পারো। আর আমারে না কইলে কইবাবা কারে। আমি ছাড়া তোমার আছে কে?
হ, তরও তো আমি ছাড়া কেঐ নাই।
এর লেইগাঐত্তো আমরা দুইজন দুইজনরে বেবাক কথা কইতে পারি। তোমার কথা হোননের পর আমিও তোমারে আইজ আমার কথাডি কমুনে। কীর লেইগা মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে আমি থাকতে চাই না, খালি এই বাইত্তে তোমার কাছে আইয়া পড়ি। আমার শইল্লের এমুন ব্যাডা ব্যাডা দশা ক্যান, বেবাক তোমারে কমু নে।
আইচ্ছা।
আমার কথা হোনতে হোনতে তুমি আবার ঘুমাইয়া পড়বা না তো?
রহিমা ম্লান গলায় হাসল। আরে না ছেমড়ি। সুকদুঃখের কথা কইতে কইতে মাইনষে আবার ঘুমায় কেমতে?
না, ঘুম তো আইতে পারে। হারাদিন যেই কাম করো তুমি! বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা আরম্ব করো, দুইফইরা ভাত খাইয়া ইট্টুহানি জিরান, তারবাদে আবার। আজাইর অও। অনেক রাইত্তে।
হারাজীবন ধইরাঐত্তো এই আন্নাতান্না করতাছি। এই হগল কইয়া আর লাব কী! কপালে যা বাইন্দা লইয়াইছি তা কি আর বদলাইবো? ছনুবুড়ি আর আলার মা’র মরণের কথা হোননের পর থিকা যহনঐ ইট্টু আজাইর থাকি, কামকাইজ না থাকে হাতে, উড়ানের কোনায় নাইলে রানঘরে, নাইলে এই ঘরে হুইয়া বইয়া থাকি, হুজরানির পান থিকা যেই পানডু হামলাইয়া নাইলে চাইয়া চুইয়া আনি, হেই পান চাবাইতে চাইতে মরণের কথাও মনে অয়। মনে অয়, যে জিন্দেগি কাড়াইয়া গেলাম হেই জিন্দেগির থিকা মরণ অনেক ভাল। আছিলো। মাইয়ামানুষ অইয়া জন্মাইলাম তারবাদেও নিজের সংসার অইলো না, পোলাপান অইলো না। জিন্দেগি কাটলো হুজুরের বাড়ির বান্দি অইয়া। খালি বান্দির কাম কইরা বাইচ্চা থাকলেও ভাল আছিলো। তাও তো পুরাপুরি অইলো না। এই হগল কামের আড়ালে আবডালে আরও কত কাম করতে অইছে।
কোন কাজের কথা বলতে চাইল রহিমা মোটামুটি বুঝল হাসু তয় ওই নিয়া কথা বলল না। বলল অন্যকথা। বিয়া তো তোমার অইছিল, হেই বিয়া টিকলো না ক্যা, সংসার অইলো না ক্যা তোমার?
রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ওই যে কইলাম, কপালের দোষ। বিয়া তো বাপ চাচারাঐ দিছিলো। জামাইবাড়ি আছিল কোলাপাড়া। কোলাপাড়া অইলো কাঁচারুগো (কাশারু) গেরাম। কাঁচারু কাগো কয় জানচ তো? যারা তামাপিতলের কারবার করে, কাঁচের থাল বাসনের কারবার করে। তারা এহেকজন বিরাট বড়লোক। টেকাপয়সার আকাল নাই। তয়। তর ফুবা কইলাম কোলাপাড়ার মানুষ অইয়াও কাঁচারু আছিলো না। ছিন্নগর বাজারে এক কাঁচারুর দোকানে কাম করতো। নাম আছিলো খালেক। আমগো লাহানঐ গরিব গুরবা মানুষ। সংসারে বুড়ি মা, তিনহান পোলাপানআলা বিধবা বইন, বইনডার নাম আছিল মাজেদা। খাড়ে দজ্জাল আছিলো মাগি। আমার হরিও কম দজ্জাল আছিলো না। জামাইডা ভালই আছিলো, তয় ইট্টু মেউন্না। মা’রে আর বইনরে সাই ডরান ডরাইতো। বিয়ার পর দেড়বচ্ছর কাডে নাই, আমার নন্দে আর হরি বদলাম উডাইলো, আমি বাঁজা। আমার পোলাপান অইবো না। নতুন বিয়ার পর যাগো পোলাপান অওনের তাগো এতদিনের মইদ্যে হইয়া যায়। বিয়ার দুই-তিন মাসের মইদ্যে মাথা ঘুরান আরম্ব অয়, তেতইল খাওন। আরম্ব অয়, ঘনঘন উকাল করে বউরা। আর দেড় বচ্ছর অইয়া গেল এই হগল কিছুই। অয় না আমার, না মাথা ঘুরান, না উকাল পাকাল, না কিছু। জামাইও জুয়ানমর্দ। আমি নিজেও চিন্তায় পইড়া গেলাম। পোলাপান অয় না দেইক্কা হরি আর নন্দে তো আগে চেচছে, অহন দেহি জামাইও ঠিক নাই। আবল তাবল কথা কয়। কিছু না করলেও শইল্লে হাত উডায়, বকাবাজি করে। কয়দিন বাদে হুনি বিয়ার চাড়ি (হুজুগ) উডাইছে। হরি কয়, পোলারে আবার বিয়া করামু। এই বাজা মাগিরে সংসারে রাখুম না। নন্দেও হের লগে উচালি (উৎসাহ) দেয়। জামাই দিহি কোনও কথা কয় না। তারবাদেও আরও আষ্টমাস। ওই বাইত্তে আমি আছিলাম। যেদিন মলবি ডাইক্কা বাড়ির উডানে ময়মুরব্বিগো সামনে খালেক আমারে তালাক দিল, কী কমু তরে, মাডিতে আছড়াইয়া পাছড়াইয়া চিক্কইর পাইড়া। কানছিলাম আমি। বহুত হাতে পায়ে ধরছিলাম জামাইয়ের, হরি-নন্দেরও কম ধরি নাই। জামাইরে কইছিলাম, বিয়া আপনে আরেকখান ক্যা, আরও তিনডা করেন, আমি কিছু। কমু না। আমার লগে আপনের হোওনও লাগবে না। খালি এই বাইত্তে আমারে ইট্টু জাগা দেন। দাসী বান্দির কাম কইরা আপনেগো আমি খাওয়ামু। কেঐ আমার কথা হোনলো না। কইলাম তয় আমি অহন যামু কই? বেবাকতে কইল হেইডা আমরা জানি না। নন্দে কইলো, ক্যা তোমগো বাইত্তে যাও! তোমার বাপ নাইলে মরছে, চাচা ফুবুরা আছে, ভাই আছে, তাগো কাছে যাও।
