মান্নান মাওলানা বেরিয়ে যাওয়ার পর উঠানে মোতালেবকে দেখতে পেলেন দেলোয়ারা। হাতে ছালার একটা ব্যাগ। ব্যাগের পেট বেশ ফোলা।
ঘর থেকে বেরিয়ে মোতালেবকে ডাকলেন দেলোয়ারা। এই মোতালেব, হোন।
হাতের ব্যাগ ঘরের পিড়ার কাছে রাখল মোতালেব। বেশ একটা ভাব ধরে দেলোয়ারার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু দেলোয়ারার দিকে তাকাল না। পশ্চিমের ভিটিতে মোতালেবদের বাংলাঘর। সেই ঘরের সামনে ঝাপড়ানো একটা হাসনাহেনার ঝড়। হাসনাহেনা ঝাড়ের পাশ দিয়ে বাংলাঘরের সামনের দিককার দুইপাশ বেয়ে উঠেছে কুঞ্জলতা, উঠে চালের (চালার) উপর গিয়ে ছড়িয়েছে। ঘরের পিছনে বিশাল একখানা তেঁতুল গাছ। তেঁতুলের ঝাঁপড়ানো ডালা এসে নত হয়েছে চালের ওপর। বিকালবেলার রোদ যত্ন করে আটকে দেয় এই ডালখানা। ফলে বিকালের মুখে মুখে মোতালেবদের বাংলাঘরের চালে বেশ একটা ছায়া ছায়া ভাব। শীতকাল এসে গেল বলে, উত্তরের হাওয়া বইতে শুরু করেছে বলে আজ এসময় বেশ একটা শীত শীত ভাব। এজন্যই কী না কে জানে, বাংলাঘরের চালের ওপর তেঁতুলের ডালার দিকে তাকিয়ে রইল মোতালেব। সেই অবস্থায় দেলোয়ারার লগে কথা বলতে লাগল। কী?
মোতালেব তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে না দেখে বিরক্ত হলেন দেলোয়ারা। গলা একটু রুক্ষ হল তাঁর। বললেন, বাদলারে তুই মারছস ক্যা?
মোতালেব তবু দেলোয়ারার দিকে তাকাল না। আগের মতোই তেঁতুলের ডালার দিকে তাকিয়ে বলল, মারছি কী অইছে।
কী কইলি?
এবার তেঁতুলের ডালা থেকে চোখ ফিরাল মোতালেব। দেলোয়ারার দিকে তাকাল। নির্বিকার গলায় বলল, কইলাম, মারছি কী অইছে।
মোতালেবের কথার ভঙ্গিতে পিত্তি জ্বলে গেল দেলোয়ারার। কপালে তিনটা ভাঁজ পড়ল। গলা আরেকটু রুক্ষ হল। পরের পোলারে কীর লেইগা মারবি তুই?
শয়তানি করছে দেইক্কা মারছি।
কী শয়তানি করছে তর লগে?
কী করছে হেইডা আপনেরে কওন লাগবনি?
কওন লাগবো। বাদলারা আমগো ঘরে থাকে। আমগো মানুষ।
আপনেগো সব সমায় ছোডজাতের লগে খাতির। আগে আছিলো হাজামগো লগে, অহন অইছে চউরাগো লগে।
ঘাড় বাঁকা করে দেলোয়ারা বললেন, দেখ মোতালেইব্বা কথাবার্তা ঠিক মতন ক। ডাক দিলেই হাজামগো আমরা পাইতাম। অগো দিয়া আমগো কাম অইতো। অহন হেই কাম চউরাগো দিয়া করাই। এই হগল লইয়া কোনও রকমের বাড়াবাড়ি তুই করিস না।
বাড়াবাড়ি করলে কী অইবো? কী করবেন আপনে?
দেখবি কী করুম?
হ দেহুম।
কাউলকাঐ (কালই) ঢাকায় খবর পাডামু। এনামুলরে বাইত্তে আইতে কমু।
একথা শুনে মোতালেব নাক ফুলিয়ে বলল, এনামুলের ডর দেহাননি আমারে? এনামুলরে জমাখরচ দিয়া চলি আমি, এ্যা?
জমাখরচ দিয়া চলছ না? ভাত না জোটলেঐত্তো ঢাকায় এনামুলগো বাসায় গিয়া উডছ। আমার বইনের পায়ে ধইরা, এনামুলের পায়ে ধইরা টেকা পয়সা সাহাইয্য আইন্না খাচ। সাহাইয্য চাওনের সমায় এত বড় বড় কথা কই থাকে? এনামুল বাইত্তে আইলে তো দেহি চাকরের লাহান তার পিছে পিছে ঘোরছ। বড়খেত বরগা লওনের লেইগা মামু মামু কইরা পাগল অইয়া যাচ। বাইত্তে মাডি উডাইবো এনামুল, হেই কামও তো তুই করছ। আমগো বাড়ির কামের উপরে দিয়া টেকা কামাছ, তারবাদেও আমগো লগে বড় বড় কথা! জীবনভর তগো অইত্যাচার সইজ্জ করছি। আমগো কোনও আপনা ভাই বেরাদর আছিলো না দেইক্কা জীবনভর তরা আমগো অইত্যাচার করছস। তারবাদেও জীবনভর তগো আমরা উপকার করছি। কইলকাত্তা থিকা আইয়া পড়নের পর, জাহাজের চাকরি শেষ অইয়া যাওনের পর তর বাপে ঢাকা গিয়া আমার দুলাভাইয়ের হাত প্যাচাইয়া ধরলো। এতডি পোলাপান লইয়া না খাইয়া মইরা যামু জামাই, আপনে আমার একটা বেবস্থা কইরা দেন। দুলাভাই তারে মিনসিপালটিতে (মিউনিসিপ্যালিটিতে) কনটেকটারি কামে লাগাইয়া দিলো। তর মাজারো ভাইরে কাপড়ের দোকানের কামে লাগাইয়া দিলো। তরে দিলো জুতার দোকানের কামে। দুলাভাই মইরা যাওনের পর বুজির কাছ থিকা ছয় হাজার টেকা নিছস, হেই টেকার এক পয়সাও শোদ করছ নাই। মাইরা খাইছস। তারবাদেও আমগো লগে এত বড় কথা? নরম পাইছস আমগো? হেইদিন আর নাই। অহন বেশি বাড়াবাড়ি করবি খারাপ অইয়া যাইবো। আহুক এনামুল। ও যুদি তর বিচার না করে তাইলে আমি আমার মাজারো বইনপোরে খবর দিমু। অরে তো চিনস না, আইয়া রে কোনও কথা জিগাইবো না। বাড়ির উডানে হালাইয়া বউ পোলাপানের সামনে তর গলায় পাড়া দিয়া ধরবো। এতবড় সাহস তর, বাদলারে তুই কচ, লাগলে আমারেও এই বাইত থিকা বাইর কইরা দিবি। বাড়িডা তর বাপের?
বেশি রেগে গেলে কথা দ্রুত বলেন দেলোয়ারা। এখনও সেভাবেই বলছিলেন। ফলে মোতালেব আর কথা বলবার সুযোগ পাচ্ছিল না। এদিকে দেলোয়ারার গলা শুনে বাড়ির প্রতিটা ঘর থেকে লোকজন বের হয়ে উঠানে ভিড় করেছে। রাবি আর বাদলা এসে দাঁড়িয়েছে দেলোয়ারার পিছনে কিন্তু কথা বলছে না। মোতালেবকে কেউ শায়েস্তা করলে বাড়ির অন্যান্য লোকজন খুশি হয়। সেই খুশির ছাপ লেগেছে কাইজ্জা শুনতে আসা প্রতিটি মানুষের মুখে।
মোতালেবের বউ দাঁড়িয়ে ছিল কবুতরের খোঁয়াড়ের সামনে। কাইজ্জায় স্বামী সুবিধা করতে পারছে না দেখে, কথা বলবারই সুযোগ পাচ্ছে না দেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে মোতালেবের হাত ধরল সে। বাদ দেও এই হগল। ঘরে আইসা পড়।
