একটু থেমে বললেন, তুই কোনও চিন্তা করি না গণি। আমার উপরে যহন ভরসা করছস ভরসার কাম আমি করুম। আমি অগো দেইক্কা শুইন্না রাকুম। তুই কি অহনঐ ঢাকা যাইতাছস?
হ দাদা। ব্যাগবোগ রেডি। চা খাইয়াঐ মেলা দিতাম। আপনেরে দেইক্কা বইলাম।
ঠিক আছে যা। অগো খালি কইয়া যা সুবিদা অসুবিদা বেবাক যেন আমারে জানায়।
রান্নাঘরের সামনে দাঁড়ানো আছিয়ার দিকে তাকাল গণি। হোনছো কী কয় দাদায়? কয় সুবিদা অসুবিদা বেবাক তারে কইয়ো।
মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে রেখেছে আছিয়া। সেই অবস্থায় কোনওরকমে বলল, আইচ্ছা কমু।
গণি উঠল। তয় আমি অহন মেলা দেই দাদা?
আর ইট্টু বয়। তর কাছ থিকা জাপানের খোঁজখবর লই। জাপান থিকা বলে বেবাক বাংলাদেশিগো খেদাইয়া দিবো?
গণি হাসল। কে কইছে আপনেরে?
হোনলাম।
বাজে কথা। আমিও হুনছিলাম। হুইন্না পোলারা ফোন করনের পর অগো জিগাইছি, কয় মিছাকথা। যতদিন ইচ্ছা জাপানে অরা থাকতে পারবো। আমিও কইছি, যতদিন পিরচ থাইক্কা আয়। দরকার অইলে থাকতে থাকতে বুড়া অইয়া যাবি তাও দেশে ফিরনের নাম। লবি না। এই দেশে কোনও কাম নাই, ব্যাবসাবাণিজ্য নাই। টেকা যা রুজি কইরা আনবি ওইডিঐ বইয়া বইয়া খাওন লাগবো।
আবার হাসল গণি। এইডি আসলে মিছাকথা দাদা। এইসব কইয়া পোলা দুইডারে জাপানে আমি আটকাইয়া রাখছি। এইদিক দিয়া অগো টেকায় চাইরতালা বাড়ি করছি। দোতালায় আমরা থাইক্কা বাকি তিনহান তালা ভাড়া দিমু। এহেক তালায় দুইখান কইরা ফেলাট। এহেক ফেলাটের ভাড়া তিন হাজার। ভাড়া পামু আঠরো হাজার টেকা। আমি থাকুম দোতালায়। দোতালার দুইখান ফেলাট জোড়া দিয়া একখান বানাইছি। আপনে তো বোজেনঐ দাদা, আমার বড় সংসার। আটখান মাইয়া। বিয়া দিছি মাত্র তিনজনের। বাকি পাঁচজনের বিয়া বাকি। দুই পোলারে কইছি পাঁচ বইনের বিয়া দিয়া তারবাদে দেশে আবি। পোলারাও রাজি। কয় বইনগো লেইগা সমন্দ দেহেন। টেকা দিয়া পারেন পয়সা দিয়া পারেন বিদাই করেন এহেকজনরে। আমি দাদা ঘটকও লাগাই দিছি। ঢাকায় যহন নিজের বাইত্তে উইট্টা গেছি, মাইয়াগো বিয়া অহন অঐবোঐ। তিন জামাইও চেষ্টা করতাছে। তয় মাজে মাজে পোলা দুইডার লেইগাও দাদা মায়া লাগে। বিদেশের বাইত্তে খাইয়া না খাইয়া অডু অডু দুদের পোলারা লাক লাক টেকা পাডাইতাছে।
টাকার আওয়াজটা গণি কেন দিল বুঝলেন মান্নান মাওলানা। যাতে তিনি প্রশ্ন করেন গণির দুই ছেলে মাসে কত টাকা পাঠায়। যা পাঠায় গণি বলবে তার দ্বিগুণ। তারপর জানতে চাইবে আজাহার কত পাঠায়। মান্নান মাওলানা যে অঙ্কই বলবেন শুনে অযথা অবাক হয়ে বলবে, ক্যা মতো কম পাড়ায় ক্যা? আমার দুই পোলায় তো মাসে পাড়ায় তিনলাক। তয়। মনে অয় আজাহার ভাল কাম পায় নাই জাপানে। অর্থাৎ আজাহারের তুলনায় নিজের ছেলেদেরকে বড় করে তোলার চেষ্টা।
এই কারণে ওসব বিষয়ের ধার দিয়েই মান্নান মাওলানা গেলেন না। তুললেন অন্য কথা। আচমকা বললেন, ওই গণি, কী অইছে রে তর?
গণি থতমত খেল। কী অইবো?
তর মাথায় কোনও গন্ডগোল অইছেনি?
গণি আকাশ থেকে পড়ল। কন কী দাদা, কীয়ের গন্ডগোল?
তুই দিহি অহন ম্যালা প্যাচাইল পারচ! আগে তো এত প্যাচাইল পারতি না!
গণি কেলানো একখান হাসি দিল। হ দাদা, এইডা আপনে ঠিক কইছেন। প্যাচাইল আমি অহন ইট্টু বেশি পাড়ি। আর খালি ছটফট ছটফট করি। আমি চাই চোক্কের নিমিষে আমার এহেকখান কাম অইয়া যাউক। পাঁচদিনের মইদ্যে পাঁচ মাইয়ার বিয়া অইয়া যাউক। দুই পোলার লেইগা দুইহান দোকান কিনুম গাউছিয়া মার্কেটে, টেকাও জমছে, তয় হেই টেকায় কুলাইতাছে না। বাড়ি করনের পর ক্যাশ টেকা আইটকা গেছে ম্যালা। পোলারা কইতাছে আষ্ট-নয় মাস দেরি করেন আব্বা, অইয়া যাইবো নে। আমার সইজ্জ অয় না। বাড়ি বানানের সময়ও এমুন অইছে। মনে অয় বহুতদিন লাইগ্যা যাইতাছে তাও য্যান বাড়ির কাম শেষ অয় না। সব কিছুতে আমার একখান হরতরাইস্যা ভাব। এই বদলানডা আমি দাদা কুনসুম জানি বদলাইয়া গেছি। আমার খালি মনে অয় টাইম শ্যাষ অইয়া যাইতাছে, কামডি শেষ অইতাছে না।
এই লক্ষণডা ভাল না রে? এইডা মরণের লক্ষণ।
একথা বলেই পুব-দক্ষিণ কোনার ঘাটলার ওদিকে চোখ গেছে মান্নান মাওলানার, দেখেন মুকসেইদ্দা চোরার বাড়ির উত্তর ভিটির ঘরের পেছন দিকে অচেনা একজন লোক দাঁড়িয়ে এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। পরনে উঁচু করে পরা লুঙ্গি, খালি গা। হাতে বোধহয় সিগ্রেট জ্বলছে। মুখে মোচ দাড়ি নাই, কামানো মুখ।
লোকটা কে?
গণিকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, অরে চিনেন নাই দাদা? ঐত্তো মুকসেইদ্দা!
কচ কী?
হ। মাস দুয়েক নাকি তারও আগে জেল থিকা ছাড়া পাইছে।
আগে না মোকে দাড়িমোচ আছিল?
হ। কামাই হালাইছে।
মান্নান মাওলানা চিন্তিত হলেন। মুকসেইদ্দা ছাড়া পাইছে, এইডা তো চিন্তার কথা। গেরামে চুরিচামারি বাইড়া যাইবো।
না দাদা বাড়বো না।
কেমতে কচ?
মুকসেইদ্দার লগে আমার কথা অইছে।
কী কয় চোরায়?
কয় চুরিচামারি আর করবো না। দ্যাশ গেরামে থাকবো। গিরস্তি কইরা খাইবো। জেল খাটতে খাটতে অর বলে আর ভাল্লাগে না।
কথা যুদি সত্য অয় তয় তো ভালঐ।
আমার মনে অয় সত্য। কারণ অইলো দুই-আড়াই মাসে তো কোনও বাইত্তে চুরি অয় নাই। আর মানুষ তো দাদা বদলায়। মাইনষের বাইরের রূপ বদলায়, ভিতরের রূপ বদলায়। এই যে আমারে আপনে কইলেন আমি বদলাইয়া গেছি। এমুন বদলান কইলাম দাদা আপনেও বদলাইছেন। নাইলে গাছির মাইয়ায় আপনের লগে যেই অন্যায় করছে, অরে তো আপনে কব্বর দিয়া হালাইতেন! অর বাপ-মারে পিডাইয়া মাইরা হালাইতেন। কিন্তু আপনে দিলেন ছেমড়িরে মাপ কইরা। এতেঐ বুজা যায়, আপনেও বদলাইছেন।
