মান্নান মাওলানাকে দেখেই মতিমাস্টারের বউ আছিয়া মাথায় ঘোমটা দিয়ে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চায়ের কাপ হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে গণি তাকে বলল, এক কাম করো, আগে দুইখান চের দেও উড়ানে। দাদায় আমি বহি, বইয়া বইয়া কথা কই। এই ফাঁকে দাদার লেইগা তুমি এককাপ চা বানাও।
মান্নান মাওলানা বললেন, নারে অহন আর চা খামু না। বিয়ানে খাইছি। বেশি চা খাই না।
তয় ঠিক আছে। আমি তাইলে দুই চুমুকে চা-ডা খাইয়া লই।
হুস হুস করে দুই-তিন চুমুকে কাপের পুরা চা শেষ করল গণি। আছিয়া চেয়ার এনে রেখেছে উঠানে। মান্নান মাওলানা বসেও পড়েছেন। বসার আগে গণি তার হাতের কাপ আছিয়ার হাতে দিল। নেও, ধুইয়া রাখো। দাদার লেইগা চা বানানের কাম নাই। হেয় খাইবো না।
মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল গণি। সে কথা বলবার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, ওই গণি, তগো বাড়ির মানুষজন কো? বউ পোলাপান?
গণি হাসল। ঢাকা গেছে গা!
কবে?
সাত-আষ্ট দিন অইলো।
তর বাড়ির কাম শেষ অইছে?
হ। গত শুক্কুরবার বাইত্তে মলুদশরিপ (মিলাদ) পড়াইছি।
কচ কী?
হ।
এর লেইগাঐ তর বাইত্তে নতুন মানুষজন দেকতাছি?
হ দাদা। আমার এক দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই অইলো মতি, মতিমাস্টার। ওই যে মতির বউ আছিয়া, আর ওই যে দুইখান লুলা আতুর পোলাপান, হিরা-মানিক। মতি গরিব মানুষ। মেট্রিক পাশ। আগে জশিলদা প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করতো। চাকরিডা অহন নাই। নিজের বাড়িঘরও নাই। এক সময় আছিলো। গ্রামের নাম উয়ারি। জাগাজমিন বাড়িঘর বেবাকঐ আছিলো। কিছু নিছে গাঙ্গে বাদবাকি গেছে পোলাপান দুইডার চিকিস্যায়। অহন পথের ফকির। এই গেরাম হেই গেরাম ঘুইরা ছাত্র পড়ায়। রোজগারপাতি খুব কম। পেরায় পেরায় আমার কাছে আহে সাহাইয্যের লেইগা। কইলাম, আমি তো আর দ্যাশ গেরামে থাকুম না, তরা আইয়া আমার বাইত্তে থাক। বাড়ি পইর দিবি আর থাকবি। দরকার অইলে টেকাপয়সা দিয়াও সাহাইয্য করুম। দুইদিন অইলো আইছে অরা।
আর এর লেইগাঐ তুই গেছিলি আমার লগে দেহা করতে?
গণি হাসল। হ দাদা। আমি আর মন্তাজ এই বাড়ির দুই শরিক অইলেও বাড়ির আসল মালিক অইলেন আপনে। আমগো সীমানায় যেঐ থাউক, তাগো কথা তো আপনেরে না কইয়া পারুম না। তাগো দেখাশুনা ভালমন্দ সবকিছু নির্ভর করবো আপনের উপরে। আপনের কথা মতন চলবো সবাই। আপনে যা কইবেন হেইডাঐ হোনবো। অর্থাৎ কিনা আপনে অইলেন মুরব্বি। ইংরেজিতে যারে বলে গার্জিয়ান। আগে আমি পরিবার লইয়া থাকতাম বাইত্তে, তহন আপনে আছিলেন আমার গার্জিয়ান, অহন অইবেন মতিমাস্টারের গার্জিয়ান, মতির বউ আর আতুড় লুলা পোলাপানের গার্জিয়ান।
গণির কথায় খুবই খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। এতটা তোয়াজ আজকের আগে কখনও তাঁকে করেনি গণি। আজ কেন করছে তাও বুঝলেন। নিজে এখন থেকে বউ পোলাপান নিয়ে থাকবে ঢাকায় আর বাড়িতে থাকবে মতিমাস্টার আর তার বউ-পোলাপান, আগেভাগেই যদি মতির বউর সামনে মান্নান মাওলানাকে অতিরিক্ত তোয়াজ করে পটিয়ে ফেলা যায় তা হলে এই বাড়িতে তারা থাকবে রাজার হালে। মান্নান মাওলানা ঠিক তো পুরা বাড়ি ঠিক। কায়দাটা গণি ভালই ধরেছে।
এসব কথা তো আর গণির মুখের ওপর বলা যায় না! তোয়াজ শুনে খুশি হওয়ার ব্যাপারটাও চেপে থাকার নিয়ম। এসব দিক বিবেচনা করে অন্য লাইন ধরলেন মান্নান মাওলানা। আমগাছ তলায় জবুথবু হয়ে বসা মতি মাস্টারের অথর্ব ছেলেমেয়ে দুইটির দিকে তাকিয়ে বললেন, পোলাপান দুইডারে আতুড় লুলা কইচ না গণি। আল্লায় ব্যাজার অইবো। আল্লার ইশারা ছাড়া গাছের পাতা লড়ে না। অরা দুইজন যে এমুন অইছে এইডাও আল্লার ইশারায়ঐ অইছে। এই দুইন্নাইতে অরা নাইলে আজাব পাইতাছে পরকালে অরা থাকবো তর আমার থিকা বেশি আরামে।
গণি বলল, হ দাদা, এইডা দামি কথা কইছেন।
গণির পরনে আজ কালো রঙের ফুলপ্যান্ট, পায়ে দোয়ালাঅলা রঙের চামড়ার স্যান্ডেল। গায়ে সাদার ওপর সূক্ষ্ম নীল ডোরাকাটা হাফহাতা শার্ট। বাঁ হাতের কবজিতে সাদা। নিকেলের চেনআলা ঘড়ি। দেখে বোঝা যায় এই ঘড়ি ঢাকা থেকে কিনে নাই গণি, এই ঘড়ি আসছে জাপান থেকে। দুই দুইটা পোলা জাপানে পাঠিয়ে হাড়হাভাতে গণি হয়ে গেছে বড়লোক, তিন কাঠার ওপর চারতলা বাড়ি করে ফেলেছে যাত্রাবাড়িতে। বউ পোলাপান নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছে ঢাকায়। এখন বাড়ি দেখাশোনার জন্য মতিমাস্টারের পরিবারকে রেখে যাচ্ছে। দুই পোলার কারণে কোথাকার মানুষ কোথায় গেছে!
তাঁর ছোট ছেলেটাও আছে জাপানে, আজাহার। টাকা যে পরিমাণ এতদিনে পাঠাবার কথা সেই পরিমাণ পাঠায় নাই। ছেলেটা একটু বেশি স্বার্থপর। হয়তো নিজের কামাই রোজগারের বেশির ভাগটাই নিজের কাছে রেখে দিচ্ছে। হয়তো ভাবছে দেশে যা পাঠাবে তাই চলে যাবে বাপের পেটে। বাপের উপর ভরসা কম। ভাবছে দেশে ফিরে দেখবে তার পাঠানো টাকার একটাও নাই। আর আজকালকার বাজারে নগদ টাকা না থাকলে তার কোনও দাম নাই। এইসব কারণেই হয়তো টাকাপয়সা আজকাল সে ঠিকঠাক মতো পাঠাচ্ছে না। দুই-তিন মাস পর পর কিছু পাঠায়।
মান্নান মাওলানা আনমনা হয়ে আছেন দেখে গণি বলল, কী চিন্তা করেন দাদা?
মান্নান মাওলানা চমকালেন। না কিছু চিন্তা করি না।
