এই পথে হাঙ্গামা একটু বেশি। তবু একটানা তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লঞ্চে বসে থাকার একঘেয়েমি নাই। আধঘণ্টা-পৌনে একঘণ্টা কখনও কখনও তার চেয়েও কম সময়ে এটা বদলে ওটায় ওঠো, পা থেকে স্পিডবোট, তারপর লঞ্চ, তারপর নৌকা, তারপর বাস, তারপর আবার নৌকা, তারপর রিকশা, তারও পরে বাড়ি। অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলি যানে চড়া, অদল বদল করা, সবমিলে ভাল রকমের ব্যস্ততা। কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। একঘেয়েমি বলতে কিছু নাই।
তবে ধৈর্য ধরে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লঞ্চে বসে থাকলে এত হাঙ্গামা করতে হয় না না। ফতুল্লায় নেমে নারায়ণগঞ্জ থেকে গুলিস্তান ফিরা বাসে চড়লে যাত্রাবাড়ির মোড়ে নেমে যাওয়া যায়। তারপর পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে বাড়ি।
সদরঘাটে নামলেও অসুবিধা নাই। সদরঘাট থেকে রিকশায় যাত্রাবাড়ি। ভাড়াটা একটু বেশি পড়ে এই আর কী!
বয়স বাড়ার ধৈর্য যেখানে বেড়ে যায় মানুষের, গণির ক্ষেত্রে হয়েছে উলটা। কমে গেছে। ধৈর্য বলতে গেলে এখন নাইই। সারাক্ষণ অস্থিরতার মধ্যে আছে সে। ছটফটানির মধ্যে আছে। আগে হাঁটাচলায়, কথা বলায় ধীর শান্ত ভাব ছিল। সেটা এখন নাই। গণি এখন আর হাঁটে না, দৌড়ায়। গণি এখন কথা বলে হড়বড় হড়বড় করে। যেন পলকেই জীবনের সব কথা বলে শেষ করবে। কয়েক বছরের মধ্যে এই বদলটা হয়েছে তার। দুই ছেলে জাপানে গিয়া দেদারছে টাকা পাঠাতে শুরু করবার পর থেকে এইভাবে বদলে গেল গণি। এখন যে চা খাচ্ছে সেই খাওয়ায়ও কেমন এক তাড়াহুড়ার ভাব। অতিরিক্ত গরম চা মুখে দিয়া জিবটা একটু পুড়ছেও। মতিমাস্টারের বউ এই দৃশ্য দেখে বলেছে, গরম চা আস্তেসুস্থে খান দাদা। হরতরাইস্যার লাহান খাইয়েন না। মোক পোড়বো।
তারপরও ঠিক একই কায়দায় চায়ে চুমুক দিতে গেছে গণি তখনই মান্নান মাওলানা এসে দাঁড়িয়েছেন তার বড়ঘরের সামনে, ওই কথা বলেছেন। শুনে গণি লাফিয়ে উঠতে গিয়েছিল। হাতের চা চলকে পড়ার ভয়ে ঠিক লাফিয়ে না উঠলেও অনেকটাই ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। মুখে বিগলিত হাসি ফুটিয়ে বলল, হ দাদা, গেছিলাম।
মান্নান মাওলানার হাতে তসবি। অবিরাম তসবিদানা টিপে যাচ্ছেন আর মনে মনে দোয়া পড়ছেন। সেই অবস্থায় গণির লগেও কথা বলতে শুরু করলেন। কীর লেইগা?
আহেন, ঘরে আইয়া বহেন। তারবাদে কই।
না অহন আর বমু না। বেইল উইট্টা গেছে। বাজার মিহি যামু। রহি কইলো তুই আমার লগে দেহা করতে গেছিলি, আমি তহন নমাজ শেষ কইরা কোরান শরিফ লইয়া বইছি এর লেইগা বলে না দেহা কইরাঐ আইয়া পড়ছস।
হ দাদা।
ক্যা? কীর লেইগা গেছিলি?
কথার কাম আছে।
ক।
তারপরই মান্নান মাওলানার মনে হল হয়তো গোপন কথা হবে। বললেন, বেশি দরকারি কথা? এহেনে কওন যাইবো না?
গণি বলল, হ দরকারিঐ। তয় গোপন না। সবহানেঐ কওন যাইবো।
উঠানের পুবকোণে একখান আমগাছ। বউল আর গোটায় ভরে গেছে গাছ। সকালবেলার রোদ পড়েছে গাছে। বাতাসে ভাসছে বোলের ঝাঝালো গন্ধ। অজস্র মধুপোকা এসে জমেছে মধু নিতে। তাদের সূক্ষ্ম গুনগুনানিতে মুখর হয়ে আছে গাছ। এই গাছের পুবপাশে গণির বড়সড় রান্নাঘর। ঢেউটিনের দোচালা, চারপাশে বাঁশের বেড়া। ঘরটা রান্না আর চেঁকি দুই ঘরই। একপাশে মাটির দুইমুখী চুলা অন্যপাশে ঢেঁকি, চেঁকির লোট। ঢেঁকির একপাশ দিয়ে কারে ওঠার জন্য চার-পাঁচখান কাঠ গজাল দিয়ে খামের লগে গেঁথে মইয়ের মতো সিঁড়ি করা হয়েছে। কারে রাখা হয় সারা বছরের লাকড়িখড়ি, দুই-তিন হাঁড়ি মুড়ি ভাজার বালি, ঝাঁঝড়। কাহাইল ছিয়াও আছে চিড়া কোটার জন্য। পিঠা বানাবার জন্য চাউল গুড়া করবার কাজেও লাগে কাহাইল ছিয়া। অনেক সময় বেঁকিতেও কাজটা সারে কেউ কেউ। এই ঘরের সামনে, দরজার দক্ষিণপাশে আমগাছটার তলায় মাটিতে লেছড়ে পেছড়ে বসে আছে মতিমাস্টারের প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে হিরা-মানিক। হিরা মেয়ে, সে বড়। মোলো সতেরো বছর বয়েস হবে। মোটাসোটা নড়বড়ে শরীর, মুখটা গোলগাল, চোখ টানা টানা, গায়ের রং মতিমাস্টারের বউর মতোই ফরসা। নীল রঙের পাজামা আর ছিট কাপড়ের ফ্রক পরা হিরা হাঁটাচলা করতে পারে না, পরিষ্কার করে কথা বলতে পারে না। সারাক্ষণ মুখ দিয়ে ছেবড়ি উটছে। মানিকের অবস্থাও একই রকম। তয় অতিকষ্টে হাঁটাচলা সে করতে পারে। পা দুইখান বেঁকা, হাত দুইখান বেঁকা, মুখও স্বাভাবিক না। দুইজনেই কথা বলে হাউমাউ করে। হিরার স্বভাব হচ্ছে যে কাউকে দেখলেই মাটিতে লেছড়ে ছেড়ে তার পায়ের কাছে চলে আসে। গোঙানির মতো শব্দ করে হাসতে থাকে। আসলে মানুষ দেখে আমোদ পায়।
আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে এই দুই প্রতিবন্ধী ভাইবোনের একে অপরের জন্য অপরিসীম টান, অপরিসীম মায়া। কেউ কাউকে এক পলক না দেখে থাকতে পারে না। এক লগে খাওয়া ঘুমানো তাদের, এক লগে দিনরাত্রি কাটানো।
এখন এই সকালবেলা দুইজনেই তারা অসহায় ভঙ্গিতে জবুথবু হয়ে বসে আছে আমগাছটার তলায়। মান্নান মাওলানাকে দেখে হিরা তার স্বভাব অনুযায়ী লেছড়ে ছেড়ে পায়ের কাছে আসতে চাইছে, কিন্তু মানিক তাকে আসতে দিচ্ছে না। যতবারই আসার চেষ্টা করে ততবারই মানিক তার ফ্রক টেনে ধরে আর ঠিক ততবারই খলখল করে হেসে ওঠে হিরা। যেন খুবই মজার খেলা খেলছে দুই ভাইবোনে। অদূরে বাড়ির নেড়িকুত্তাটা খামোশ হয়ে বসে আছে।
