এইডা তো জানি। বাড়ির বেবাকতেঐ জানে।
তয়?
তয় আবার কী?
আরে ছেমড়ি ভাবিছাবেঐত্তো আমারে চোক্কে চোক্কে রাখে। আমি বাইত্তে আইলেঐ হের চকু দুইখান আমার মিহি, কান দুইডা আমার মিহি। হের লেইগা ফিরির কাছে আমি যাইতে পারি না।
একথা শুনে হাসু অবাক হল। ফিরির লগেও কাম অইছে নি আপনের?
না, অহনতরি পুরাপুরি অয় নাই। ইট্ট ইট্ট কথাবার্তা অয়। ভাবিছাবরে ফাঁকি দিয়া অগো ঘরে আমি কয়দিন ধইরা যাই। ফিরির ভাব চক্করে মনে অইতাছে দুই-চাইর দিনের মইদ্যেঐ অইয়া যাইবো।
আপনের।
কেমুন?
যারে চান তারেঐ পান। ভাবিছাবের লাহান একজনরে পাইছেন, অহন চেষ্টা করতাছেন ফিরিরে।
আরেকজনরেও চেষ্টা করতাছি।
কারে?
ফুলমতি।
ও নিখিলাদাদার রাঢ়ি বইন।
হ।
নিখিলাদাদায় না আপনের দোস্ত?
দোস্ত অইছে কী অইছে?
দোস্তের বইনের লগে এই কাম করবেন?
দোস্তের বইনের লগে তো করন যায়। আমার বাপে যে পোলার জিনিসের লগেও করতে চায়। অনেকদিন ধইরা ফিরির মিহি হের নজর। আমার মনেঅয় গাছির মাইয়ার মিহিও নজর দিছে চুতমারানির পোয়। নাইলে দারোগা পুলিশ আর গেরামের বেবাক মাইনষের সামনে ছেমড়ি হের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিল, হেয় কিছু কইলো না। এমুন নুলাম জিনিস তো আমার বাপে না। ছনুবুড়ির জানাজায় যাওনের লেইগা মাকুন্দারে চোর সাজাইয়া জেলে দিল যেই মানুষ হেয় এতবড় অপমান সইজ্জ করলো ক্যা হেইডা কেঐ না বোজলেও আমি বুজি। নূরজাহানির ব্যাপারে হের অন্যকোনও মতলব আছে।
হাসু বলল, যা ইচ্ছা থাউক। ময়মুরব্বিগো লইয়া কথা কইয়েন না।
আতাহার হাসল, তয় আয় তরে লইয়া কই।
কইতাছেনঐত্তো। আরও কন, হুনি।
তুই আমার লগে এমুন করচ ক্যা, ক তো?
কী করি?
বোজচ না কী করতাছ?
না।
আইজ সাত-আষ্ট বচ্ছর ধইরা দুই-চাইর মাস পর পরঐ আমগো বাইত্তে আহচ তুই। এতদিন ধইরা তর মিহি আমার নজর। বহুত কায়দামায়দা তর লেইগা আমি করছি, তুই আমারে দেচ না ক্যা?
কথাটা যেন বুঝতে পারল না হাসু। সরল গলায় বলল, কী দিমু?
বোজচ না?
না।
আতাহার থতমত খেল। এরচেয়ে সোজাসুজি আর কীভাবে বলা যায় জানে না সে। আমতা গলায় বলল, শইল্যে মইল্যে হাত দিতে দেচ না, যা কই হোনচ না। আইজ সাত আষ্ট বচ্ছর ধইরা কইতাছি, টেকাপয়সা লাগলেও দিমু। কত রাইত তর লেইগা জাইগ্না বইয়া রইছি, তরে কইছি তর ফুবু ঘুমাইয়া যাওনের পর তুই চুপ্পে চুপ্লে উইট্টা বাংলাঘরে আইয়া পড়িচ, তুই কোনওদিন আহচ নাই। আমি বিচনায় হুইয়া তর লেইগা খালি উসপিস উসপিস করছি।
এসব কথা শুনে শরীর শক্ত হয়ে গেল হাসুর। গলা শুকিয়ে এল। তয় আতাহারকে কিছুই বুঝতে দিল না সে। মুখটা হাসিহাসি করে ঢঙি গলায় বলল, আমার লাহান মাইয়ার লেইগা এইরকম আপনের হওন উচিত না।
ক্যা, কী অইছে তর?
আপনে আমার মোকের মিহি কোনওদিন চাইছেন, শইল্লের মিহি চাইছেন?
চামু না ক্যা?
আমার মনে অয় চান নাই। চাইলে আমার লেইগা খায়েশ আপনের অইতো না। চান, আমার মিহি চান, চাইয়া দেহেন আমারে মাইয়াছেইলা মনে অয়নি?
আতাহর হাসিমুখে হাসুর দিকে তাকাল। ততক্ষণে ভর সন্ধ্যা। অন্ধকার হয়ে গেছে। চারদিক। খুব কাছে দাঁড়িয়েও পরিষ্কার দেখা যায় না মানুষের মুখ। হাসুর মুখও পরিষ্কার দেখতে পেল না আতাহার, শরীর দেখতে পেল না। বলল, শইলমইল ঠিকঐ আছে তর, খালি গলার আওয়াজখান বেড়াগো লাহান অইয়া গেছে। এমুন অইছে ক্যা? আগে তো এমুন আছিলো না!
বিরক্ত হল আতাহার। বাদ দে এই হগল। ম্যালা প্যাচাইল তর লগে এতুন পাড়ছি, আর প্যাচাইলের কাম নাই। ল অহনঐ কাম সারি। নাড়ার পালার পিছে যাই।
হাসুর একটা হাত ধরল আতাহার। লগে লগে হাসু যেন আর হাসু রইল না, হাসু যেন এক জোয়ানমর্দ পুরুষ হয়ে গেল। এমন ঝাড়া (ঝটকা) মারল, আতাহার ছিটকে পড়তে যাচ্ছিল, কোনওরকমে নিজেকে রক্ষা করল। তারপর হতভম্ব হয়ে গেল। কী রে, সত্যঐত্তো তরে আর মাইয়াছেইলা মনে অইলো না। হাতখান লোহার লাহান শক্ত, এক্কেরে বেড়াগো হাত। এমুন অইছে ক্যা তর? তর লগে হুইলে তো মনে অইবো বেড়ার লগে হুইছি। কাম নাই তর লগে হোওনের।
লুঙ্গির কোচড় থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ বের করে সিগ্রেট ধরাল আতাহার। দুই ঠোঁটে সিগ্রেট কায়দা করে আটকে প্যাকেট ম্যাচ আবার রাখল কেঁচড়ে, বাড়ির দিকে। উঠতে গেল, হাসু হাসতে হাসতে বলল, খায়েশ মিট্টা গেছে?
আতাহার সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, হ। যেই হাত তর আমি ধরছিলাম, ওই হাত যুদি কোনও ছেমড়ির অইয়া থাকে তাইলে ঐডা আর ছেমড়ি নাই, ওইডা বেডা অইয়া গেছে। বেডা অইয়া বেডাগ লগে আকাম কুকামের অব্বাস আমার নাই। আইজ থিকা তুই বাদ, তর মিহি জিন্দেগিতেও আর চাইয়া দেহুম না আমি। আমি ফিরির কাছে যাই।
বসে যাওয়া সন্ধ্যার অন্ধকারে সিগ্রেট টানতে টানতে আতাহার তারপর উঠানের দিকে উঠে যায়। পিছনে নাড়ার পালার সামনে তখনও দাঁড়িয়ে আছে হাসু। বুক জুড়ে তার গভীর স্বস্তি। অনেক বছর ধরে পুরুষমানুষ ফিরাতে ফিরাতে, নিজেকে রক্ষা করতে করতে সে যেন সত্যি আর মেয়েমানুষ নাই, সে যেন পুরুষমানুষ হয়ে গেছে।
২.৭ গণির হাতে চায়ের কাপ
কী রে গণি তুই বলে আমার লগে দেহা করতে গেছিলি?
গণির হাতে চায়ের কাপ। খানিক আগে এক ডালা মুড়িমিঠাই খেয়েছে। মুড়িমিঠাই খেয়ে পানি খেলে পেট ফুলে কোমড় (কুমড়া) হয়। হাঁটাচলা করলে পেটের ভিতর ঘটমট ঘটমট শব্দ হয়। কিন্তু খানিক পরই মেলা দিতে হবে গণির। কাঁধে রেকসিনের ব্যাগ নিয়ে সোজা হেঁটে যাবে শ্রীনগর। সেখান থেকে স্পিডবোটে মোলোঘর হয়ে আলমপুর। আলমপুর থেকে লঞ্চে ফতুলা সদরঘাট। কিন্তু এই দুই জায়গার আগেই সৈয়দপুরে নেমে যাবে গণি। নেমে নৌকা করে নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে বাসে চড়বে। সেই বাস সোজা। যাবে জিঞ্জিরা। জিঞ্জিরা থেকে পার হতে হবে বুড়িগঙ্গা। ওপারে বাদামতলি ঘাট। সেখান থেকে রিকশা করে সোজা যাত্রাবাড়ি।
