বিছানা থেকে নামলেন তহুরা বেগম। পালঙ্কের তলায় রাখা স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরলেন। হার্টের অসুখ দেখা দেওয়ার পর থেকে চলাচল ধীর হয়েছে তার। আজ সকালে হঠাৎ করেই যেন সেই ধীর চলাচল উধাও হয়ে গেল। প্রথম জীবনে এই সংসারে এসেই যেমন চটপটা ভঙ্গিতে চলাফেরা করতেন, আজ তার চলাচল হল তেমন।
স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে এই জীবনে প্রথম তহুরা বেগমকে খুবই তেজি ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলেন মান্নান মওলানা। দেখে বুকটা একটু কাঁপল তাঁর।
.
সন্ধ্যার দিকে নাড়ার পালায় শুকাতে দেওয়া কাপড় তুলতে এসেছে হাসু। তার আর রহিমার কাপড় তুলছে। হঠাৎ করে ডানদিককার কাঁধে কে হাত দিল। আচমকা সাপের লেজে পাড়া দিলে যেমন করে লাফিয়ে উঠে ফণা তোলে বিষাক্ত সাপ ঠিক তেমন করে লাফিয়ে উঠল হাসু। রাগ ক্রোধে ফেটে পড়া চোখে যে তার কাঁধে হাত দিয়েছে সেই মানুষটার মুখ দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। লগে লগে রাগী মুখ মোলায়েম হল, দৃষ্টি নরম হল। হাসিহাসি মুখ করে হাসু বলল, ও আতাহার দাদায়! আমি ডরাই গেছিলাম।
নীল লুঙ্গির উপর সাদা হাফহাতা গেঞ্জি পরা আতাহার। পায়ে স্যান্ডেল নাই হাতে সিগ্রেট আছে। অর্ধেক শেষ হওয়া সিগ্রেট। সেই সিগ্রেটে বড় করে টান দিল সে। তুই কী মনে করছ? কে হাত দিছে তর কান্দে?
হেইডা বুজি নাই।
আমি বুজছি।
কী, কন তো?
তুই মনে করছচ পিছ থিকা আইয়া আমার বাপে তর কান্দে হাত দিছে।
হাসু বেশ একখান ঢং করল। আউ ছি। হেয় মুরব্বি মানুষ, পরহেজগার লোক, হেয়। ক্যান আমার কান্দে হাত দিবো?
আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল। এই হগল আল্লাইদ্যা প্যাচাইল পারি না। আমার বাপে কী জিনিস হেইডা বেবাকতে জানে। তুই আমগো বাইত্তে আহচ ম্যালা দিন ধইরা, তুইও জানচ। যুদি না জাইন্না থাকচ তয় তর ফুধু রহিরে জিগাইচ। রহি খুব ভাল কইরাঐ জানে আমার বাপে জিনিসহান কী?
আবার সিগ্রেটে টান দিল আতাহার। হাসল। আমিও কইলাম হেই বাপের পোলা। আতাহারকে হাসতে দেখে হাসুও হাসল। রহিমার শাড়িটা টেনে নামাল নাড়ার পালা। থেকে। শাড়ি ভাঁজ করতে করতে বলল, আপনের খবর আমার কাছে আছে।
কী খবর ক তো!
কমু?
হ ক।
হুইন্না আবার চেইত্তা যাইবেন না তো?
না চেতুম না।
সত্য?
হ সত্য।
আল্লার কিরা?
এত কিরামিরা কাডন যাইবো না। তুই ক, আমি চেতুম না।
একপলক আতাহারের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল হাসু। আপনে বহুত মাইয়াছেইলা ঘেঁষা মানুষ। মাইয়াছেইলা ছাড়া থাকতে পারেন না।
আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল। সন্ধ্যাবেলার হাওয়ায় সিগ্রেটের ধুমা উড়ায়া বলল, এই কথা হুইন্না আমি চেতুম ক্যা রে? এইডাঐত্তো আসল কথা। হ আমি বহুত মাইয়াছেইলা ঘেঁষা মানুষ। মাইয়াছেইলা ছাড়া থাকতে পারি না।
থাকতে যহন পারেন না তয় বিয়া কইরা লন না ক্যা?
বিয়া করলে অসুবিদা আছে।
কীয়ের অসুবিদা?
তহন খালি বউর লগেঐ থাকন লাগবো। বারো মিহি যাওন যাইবো না।
বারো মিহি যাওনের কাম কী?
কাম আছে। তুই বুজবি না।
বুজাইয়া কন আমারে, হুনি।
একজন মাইয়াছেইলার লগে রোজ রোজ আমি থাকতে পারি না। আমার ভাল্লাগে না। মনে হয় এক তরকারি দিয়া রোজ ভাত খাইতাছি।
একথা শুনে আবার একটু ঢঙি হল হাসু। খিলখিল করে হাসল। এখন বারবাড়ির দিকে কেউ আসবে না। মান্নান মাওলানা আর তহুরা বেগম নামাজ পড়ছেন বড়ঘরে বসে। হাফিজদ্দি আছে গোয়ালে, ধূপ দিচ্ছে। রহিমা পাকেরঘরে রাতের ভাত চড়িয়েছে। বারবাড়ির দিকটা একেবারেই নিটাল। এই অবস্থায়, এই সময়ে হাসু কল্পনাই করেনি আতাহার বাড়ি ফিরতে পারে, তার কাছে এসে দাঁড়াতে পারে। প্রথমে সে ভয় পেয়েছে, তারপর বহুদিনের অভ্যাসের ফলে কোন পুরুষকে কীভাবে ফিরাতে হবে জানে বলে ঢঙি ভাব ধরছে। যেসব কথা বললে আতাহারের মতো পুরুষরা খুশি হয় সেই লাইনেই কথা বলতে শুরু করছে।
সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে দুই আঙুলের টোকায় ছুঁড়ে ফেলল আতাহার। সাবধানি চোখে একবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আস্তে হাস ছেমড়ি, মাইনষে হোনবো।
কথা বলার ফাঁকে তার আর ফুফুর শাড়ি ভাজ করে বুকের কাছে সাবধানি ভঙ্গিতে ধরেছে। হাসু। এমনভাবে আড়াল করেছে বুক যেন একটুখানি অন্যমনস্কতার সুযোগেও আচমকা বুকে হাত দিতে না পারে আতাহার। আতাহারের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে হাসু। তয় মুখের কথায় আর আচরণে এমন ঢঙিভাব ফুটিয়েছে যেন আতাহার তার হাত ধরে টানলেই এই নাড়ার পালার পিছনে গিয়ে আতাহারের সঙ্গে সে শুয়ে পড়বে।
আতাহারের সাবধানি ভাব দেখে হাসু বলল, কেঐ হোনবো না। বাড়ির মাইনষে যে যার কামে আছে। এইমিহি কেঐ আইবো না।
না আইলেও একজন আবার সবমিহি কান রাখে, সবমিহি হের চোখ। হেইডা খালি আমার লেইগাঐ। চব্বিশঘণ্টা হেয় আমারে চোক্কে চোক্তে রাখে।
যেন কিছুই জানে না এমন মুখ করে হাসু বলল, হেইডা আবার কেডা? কে আপনেরে চোকে চোক্তে রাখে?
তুই জানচ না?
না।
এই ছেমড়ি, ফাইজলামি করিচ না আমার লগে।
না দাদা, আমি ফাইজলামি করতাছি না। আমি সত্যঐ জানি না।
চোখ সরু করে হাসুর মুখের দিকে তাকাল আতাহার। ভাবিছাবের কথা জান না?
হাসু সরল মুখ করে বলল, না তো! ভাবিছাবে আবার কী করছে?
হের লগে আমার ইটিস পিটিস (প্রেমপিরিতি অর্থে) তুই জান না?
