এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে গেল মোতাহার। পারুর কান্নাকাটি চিৎকারে বাড়ির লোকজন। জেগে উঠল। আতাহার আর মাকুন্দা কাশেম গিয়া করিম ডাক্তাররে নিয়া আসলো। ডাক্তার। এসে নাড়ি দেখলেন, বন্ধচোখ খুলে দেখলেন, পেট টিপে দেখলেন। তারপর হতাশ মুখে মাথা নাড়লেন। মোতাহার নাই। পেটে প্রচণ্ড গ্যাস হয়েছিল, গ্যাস থেকে হার্টঅ্যাটাক, অনেক আগেই চলে গেছে সে।
স্বপ্নে মোতাহারকে দেখার পর, ঘুম ভাঙার পর উঠানে খলফার ওপর শোয়া কাফন পরা ছেলেটিকে যেন দেখতে পেলেন তহুরা বেগম। পেট তখনও ভোজকোমড় হয়ে আছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি। তার কান্নার শব্দেই ঘুম ভাঙল মান্নান মাওলানার।
এসময় অবশ্য রোজই ঘুম ভাঙে তার। বহুদিনের অভ্যাস। ঘুম ভাঙার পর উঠানের কোণে বসে অজু করেন, আজান দেন, বড়ঘরে এসে স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই নামাজ পড়েন।
কিন্তু তহুরা বেগম আজ এসময় এভাবে কাঁদছেন কেন! শরীর কি বেশি খারাপ করল!
যদিও স্ত্রীকে নিয়া আগ্রহ নাই মান্নান মওলানার। তবু বিছানায় উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করলেন, কী অইছে? কান্দো ক্যা?
তহুরা বেগম কথা বললেন না। আঁচলে চোখ মুছলেন, নাক ঝাড়লেন। তয় কান্না থামল না। মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। বিছানা থেকে নামতে নামতে বললেন, উইট্টা নমজ কালাম পড়ো তারবাদে যতো ইচ্ছা কাইন্দো। আগে আল্লার নাম তারবাদে কান্দন।
দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
অজু সেরে আজান দিয়ে ঘরে ফিরে মান্নান মাওলানা দেখেন তহুরা বেগম তখনও। আগের মতোই শুয়ে আছেন, আগের মতোই কাঁদছেন। দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মান্নান মাওলানার। খেকুরে গলায় বললেন, কী অইলো, অহনতরি উড়ো নাই? নমজের সময় তো যাইতাছে গা!
আবার আঁচলে নাক ঝাড়লেন তহুরা বেগম। যাউক গা। নমজ পড়ুম না।
মান্নান মাওলানা থতমত খেলেন। তহুরা বেগমের মুখে এই ধরনের কথা কখনও শোনেননি তিনি। বহুকাল হল মানুষটি তার সংসারে। অতি নিরীহ, নরম নির্বিরোধ ধরনের মানুষ। স্বামীকে প্রচণ্ড ভয় পান। স্বামীর কত রকমের অনাচার চোখে দেখেও ভয়ে স্বামীর মুখামুখি হন নাই, ওই নিয়া কথা বলেন নাই। স্বামী যা বলেছেন বুঝিয়েছেন সারাটা জীবন মুখ বুজে তাই বুঝে গেছেন, তাই মেনে নিয়েছেন। কখনও স্বামীর মুখের উপর কথা বলেননি, মুখ ঝামটাননি। সাত-সাত সন্তান জন্ম দিয়েছেন তবু যেন স্বামীর মন পাননি। স্বামীর কাছ থেকে আদায় করতে পারেননি স্ত্রীর মর্যাদা, সম্মান। মান্নান মাওলানা চিরকালই বাড়ির ঝিয়ের মতো আচরণ করেছেন। এক অর্থে রহিমা আর তহুরা বেগমের মধ্যে তেমন কোনও ব্যবধান নাই। সেই মানুষ কিনা আজ স্বামীর মুখের উপর বলছেন নামাজ পড়বেন না!
কী ব্যাপার? কী হয়েছে?
মান্নান মাওলানার যা স্বভাব, তিনি কখনও না শুনে অভ্যস্ত নন। যাকে যা বলবেন তা তাকে শুনতে হবে। না শুনলে জাতসাপের মতো ফুঁসে উঠবেন, ফণা তুলবেন। কোনও না কোনওভাবে দংশাবেন তাকে। মাকুন্দা কাশেমকে যেমন ভাবে দংশে ছিলেন। দংশাবেন নূরজাহানকেও। কীভাবে দংশাবেন সেই চিন্তা মনের ভিতর সেদিনের পর থেকে ঘুরপাক খাচ্ছে। সময় নিচ্ছেন দংশাবার পথ বের করবার জন্য। উপরে উপরে সবাইকে বোঝাচ্ছেন, নূরজাহান পোলাপান মানুষ, নাদান মাইয়া, না বুইজ্জা কামডা করছে, আমি আল্লার ন্যাকবান্দা, এর লেইগা অরে আমি মাপ কইরা দিছি। আসলে তো মনের ভিতর চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন।
কিন্তু তহুরা বেগমের আজ কী হয়েছে! এতদিনকার চিনা মানুষটা আজ ভোররাতে হঠাৎ করে এমন বদলে গেছেন কেন! কাঁদছেনই বা কেন!
মান্নান মওলানা বুঝে গেলেন শান্ত মানুষরা রাগলে দিকপাশ ভুলে যায়। তহুরা বেগমও আজ ভুলতে পারেন। এজন্য তার লগে এখন রাগারাগি করা ঠিক হবে না। নরম সুরে কথা বলে বুঝে নিতে হবে ব্যাপারটা কী! হঠাৎ এমন অচেনা আচরণ তিনি কেন করছেন!
ধীর শান্ত নরম গলায়, হাসিহাসিমুখে মান্নান মাওলানা তারপর বললেন, আমি বুজছি কোনও কারণে তোমার মিজাজ বিগড়াইছে। এর লেইগা বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা কানতাছো। কী অইছে হেইডা আমি পরে হুনুমনে। অহন ওডো, অজু কইরা নমজ পড়ো। তাইলে মনডাও শান্ত অইবো।
বাইরে ভাতের পাতলা ফ্যানের মতো ট্যালট্যালে আলো ফুটেছে। কাক শালিকরা ডাকতে শুরু করেছে। গোয়ালের ওদিকে থেকে থেকে ডাকছে দোয়েল পাখি। ঘরের আনাচ কানাচ থেকে উধাও হবে রাতভর ঘাপটি মেরে থাকা অন্ধকার। আলো অন্ধকারের খেলা চলছে আল্লাহতালার দুনিয়ায়।
কী ভেবে তহুরা বেগম তারপর উঠে বসলেন। স্বামীর চোখের দিকে তাকালেন। তয় ঘরের আলো অন্ধকারের মিশেলে চোখ পরিষ্কার দেখতে পেলেন না তার। তবু অপলক চোখে খানিক তাকিয়ে থেকে জীবনে এই প্রথমবারের মতো দৃঢ় গলায় বললেন, নমজ আমি নিজের গরজেই পড়ুম অহন। আপনের কথায় না। আউজকার পর যতদিন বাইচ্চা থাকুম আপনের কোনও কথা আমি আর হুনুম না। আর আপনের সংসারে আহনের পর থিকা। হারাডা জীবন মনের মইদ্যে আমার যেই হগল দুঃখ ব্যাদনা জমছে, রাগ ঘিন্না জমছে বেবাক আপনেরে আমি হুনাইয়া যামু। আপনে মনে করছেন আপনের কিরতি কলাপের অনেক কিছুই আমি বুজি নাই, বুজছি, হগলই আমি বুজছি। কোনওদিন মোক ফুইট্টা কিছু কই নাই। মরণের আগে বেবাক কইয়া যামু। আইজ আমি আমার পোলাডারে আবার সপনে দেকছি। ও আইয়া আমারে ডাক পাড়ছে। পোলার ডাকে আমি বুজছি আমার মরণ ঘনাইছে। মরণের ডরে কইলাম আমি কান্দি নাই। আমি কানছি আমার পোলাডার লেইগা। আমার পোলাডা মরছে আপনের লেইগা। কেমতে অরে আপনে মারছেন হেই হগল আপনেরে আমি কইয়া যামু।
