মাটির শরীর মাটিতে মিশে যাওয়ার পরও সেই মানুষটি থেকে যায় প্রিয় মানুষের মনে, চোখের ভিতরে, স্মৃতিতে, স্বপ্নে। ঘুরে ফিরে সেই মানুষটির মুখ কারণে অকারণে দেখতে পায় মানুষ। তহুরা বেগম যেমন গত চার বছর ধরে যখন তখনই দেখছেন তার ছেলেটির মুখ। দুপুরবেলা নিরিবিলি ঘরে শুয়ে আছেন, হঠাৎ করেই তার মনে হয়, মোতাহার যেন এসে দাঁড়িয়েছে দুয়ারের সামনে। মা মাগো বলে যেন তাকে একবার ডাকল। হয়তো তখন তন্দ্রামতন এসেছিল চোখে, সেই ডাকে ধড়ফড় করে ওঠেন তিনি। তারপর আর ঘুম হয় না। শুধুই মোতাহারের মুখটা ভেসে থাকে চোখের সামনে। বিকালের দিকে উঠান পালানে, বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালাটির ওদিকে কখনও কখনও পায়চারি করেন তিনি। হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পান বিলের দিক থেকে যেন ফিরে আসছে তাঁর ছেলে। আস্তে ধীরে হেঁটে এসেও যেন খুবই ক্লান্ত হয়েছে। তবু বাড়ি ঢোকার মুখে বারবাড়ির কাছে মা’কে দেখে যেন তার মুখে ফুটে উঠেছে মোহময় এক হাসি।
দুপুরে খেতে বসেও ছেলের কথা মনে পড়ে তহুরা বেগমের। সকালের নাস্তা খাওয়ার সময় মনে পড়ে, রাতের খাবার সময় মনে পড়ে। রাতেরবেলা দুধভাত খাওয়ার অভ্যাস। তহুরা বেগমের। আধ থাল ভাতের লগে থালভরতি দুধ আর একটুখানি খাজুরিমিঠাই বা। একখানা কবরিকলা অতিযত্নে মাখিয়ে মাখিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খান তিনি। বিয়ার পর, পোলাপানের বাপ হয়ে যাওয়ার পরও, সেই ছেলেবেলার মতো করেই যখন তখন মায়ের রাতের খাবারের সময় মোতাহার এসে সামনে বসত কোনও কোনও রাতে। নিজের ভিন্ন। সংসার হয়েছে, সেই সংসারে রাতের খাবার সে হয়তো সেরেও নিয়েছে, তবু মায়ের দুধভাত খাওয়া দেখে তার সামনে বসে শিশুর মতো হাঁ করেছে। আমারে এক লোকমা দেও মা।
ওই সময় তহুরা বেগম দেখেছেন তার বড় হয়ে যাওয়া, ভিন্ন সংসারের মালিক হয়ে যাওয়া ছেলেটি তার সামনে বসা নাই, আছে বহুকাল আগের ন্যাওটা একটা শিশু। দুই মেয়ের পর সংসারে আসছে যে, মায়ের নয়নের মণি যে। শিশুকে ভাত খাওয়াবার ভঙ্গিতে হাত উঠে গেছে তার। শিশুদেরকে খাওয়াবার সময় কোনও কোনও মায়ের মুখে যেমন ঠোঁটের বিশেষ একটা ভঙ্গি ফুটে ওঠে, তেমন হয়েছে। একবার খেয়েই হয়তো মুখ সরিয়ে নিয়েছে মোতাহার, তহুরা বেগম আরেক লোকমা তুলে বলেছেন, একবার খাওন ভাল না বাজান। একবার খাইলে পাইনতে পইড়া মরে!
এই সংসারে মৃত্যুর থাবা প্রথমে এসে পড়ল মোতাহারের উপরই। এত লোকজন সংসারে, এত পোলাপান সবাই সবার মতো ঠিক থাকল, আজরাইল এসে শুধু জান কবচ করল মোতাহারের। এইভাবেও মৃত্যু হয় ওই বয়সি ছেলের! কত বয়স হয়েছিল তার, তিরিশ-বত্রিশ। এই বয়সে ছেলেরা তো বিয়াশাদিও করে না আজকাল!
কপাল, সব কপালের দোষ। নিজেরা পছন্দ করে তহুরা বেগম আর মান্নান মাওলানা আত্মীয়ের মেয়ে আনলেন ছেলের জন্য। নরম শান্ত লাজুক স্বভাবের মিষ্টি মেয়ে পারুল। শ্বশুরবাড়িতে এসে স্বামী রেখে স্বামীর ভাইর লগে সম্পর্ক করল। তার ওপর মান্নান মাওলানা দিলেন ভিন্ন করে। দুই-আড়াই কানি বাজা জমি, ম্যারা ম্যারা দুই-তিনখান গাই গোরু, সবমিলে বছরের ভাত জোগাড় করা মুশকিল। একদিকে বউ আর ছোট ভাইয়ের ঘটনা টের পেয়ে গেল মোতাহার, বউর গর্ভে ভাইয়ের সন্তান আসছে দেড়-দুই বছর পর পর, বাড়ির লোকে ভালই টের পাচ্ছে সব, পারু-আতাহারকে রাতবিরাতে দেখেছে কেউ কেউ, বাড়ির ঝি-চাকরদের কান থেকে গেছে অন্যবাড়ির ঝি-চাকরদের কানে, ছড়িয়েছে ঘটনা। হয়তো মান্নান মাওলানার ভয়ে মুখ খোলেনি কেউ, তয় জানে তো সবাই। একদিকে এই লজ্জায় নিজের ভিতর গুটিয়ে থাকত মোতাহার, অন্যদিকে ভাতকাপড়ের ভয়। নিজের বাপকে ভালই চিনত সে। মোতাহারকে দেখতেই পারতেন না তিনি। শরীরস্বাস্থ্য খারাপ, নরম সরম দুর্বল স্বভাবের পেটরোগা ছেলেটার লগে সব সময়ই পিসপিস করতেন, কাজির পাগলা স্কুলে দুই-তিনবার ফেল করে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ওঠার পর মোতাহারকে আর তিনি পড়ালেনই না। গিরস্তি কাজে লাগিয়ে দিলেন। বিয়া করে ভিন্ন করে দিয়া বললেন, নিজেরডা নিজে কইরা খাবি। আমি আর দুই পয়সাও দিমু না, একসের চাউলও দিমু না।
মোতাহার জানত বাবায় যা বলেন তাই করেন। এই কারণে ওই রোগা শরীরে পরিশ্রম তাকে ম্যালাই করতে হত। একদিকে পেটের আহার জোটাতে হিমশিম, অন্যদিকে বউ ভাইয়ের গোপন সম্পর্ক, এসব নিয়া কখন কে কোন কথা বলে ফেলে, মানসম্মান থাকে না যায়, সবমিলে গ্যাস্ট্রিক রোগটা হল। এই রোগীর বউদের স্বামীর খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে নজরদারি করতে হয়। ডাক্তার কী কী খেতে মানা করেছেন সেসব খাবার চোখের সামনে নাআনাই ভাল। তয় পারু বোধহয় সেসব মনে রাখত না। এক রাতে সেচিশাক আর ছোট ছোট তিতপুঁটি চচ্চড়ি করছে। গ্যাস্ট্রিক রোগীদের শাক খাওয়া নিষেধ। পারু মানাও করেছিল স্বামীকে, বলেছিল, আপনে দুধ দা ভাত খান। শাকশোক খাইয়েন না। আমি আর পোলাপানে খামু নে।
মোতাহার শোনেনি। একটু শাকপাতা, একটু ঝালঝোল তরকারির প্রতি লোভ ছিল। আয়েশ করে সেচিশাক আর পুঁটিমাছের চচ্চড়ি খেল, তারপর দুধভাতও খেল কবরিকলা দিয়ে। রাত দুপুরে পেট ফুলতে লাগল। উসপিস উসপিস শুরু করল। দুধের মতো অষুদটা খেল, ট্যাবলেট খেল তয় কোনও কাজই হল না। মনে হচ্ছে পেট যেন বেলুন, ভিতর থেকে ফুঁ দিয়া দিয়া কেউ যেন তা শুধু ফুলিয়েই যাচ্ছে।
