কও কী?
হ। অরে পাডাই ছিলাম মাওয়ার বাজারে।
তোমরা কি আইজ কনটেকদার সাবের ঘরে আছিলা?
হ।
কে কে?
আমি, কনটেকদার সাবে, আলম সুরুজ। নিখিলারে বাজারে পাইছিলাম বতল আনতে, লগে তোমার জিনিসখানও আনতে। বতল পায় নাই আইজ। কুটুমিয়া ডাক্তারের ফারমেসি থিকা তোমার জিনিসটা কিন্না আনছে।
তোমার দোস্তরা দেহে নাই?
পারুর পিঠের দিকটায় হাত বুলাতে বুলাতে আতাহার বলল, আরে না। দোস্ত অইলেও নিখিলা আমার খাসলোক। খালি ওঐ তোমার-আমার সমন্দের কথা জানে। অরে দিয়া অনেকদিন ধইরা এই হগল জিনিস কিনাই আমি। আমার নিজের কিনতে শরম করে।
আতাহারের খোলা বুকে ছোট্ট করে একটা কামড় দিয়ে পারু বলল, আমার লগে যহন থাক তহন শরম করে না?
পারুর ব্লাউজের বোতাম খুলতে খুলতে আতাহার বলল, হ করে। এর লেইগাঐত্তো তহন চক্কু বুইজ্জা থাকি। তোমার মিহি চাই না।
পারুর শরীর জুড়ে ভয়ংকর উষ্ণতা মাথা চাড়া দিচ্ছে। গোঙানোর মতন বলল, আইজ সকাল থিকাঐ মাথা বেদনা শুরু অইছে। ডাইন মিহির হাত পাওয়ে ঝিমঝিমাইন্না বেদনা। বোজতাছিলাম আইজ তোমার লগে দেহা না অইলে রাইত্রে ঘুমাইতে পারুম না। মাথা বেদনায় মইরা যামু। বিয়ানে এর লেইগাঐ বাংলাঘরের মিহি চাইয়া দুয়ারে খাড়ই রইছিলাম। তুমি আহনের ইশারা না করলে আমিঐ করতাম। আমি আর টিকতে পারতাছিলাম না।
আতাহারের শরীরেও তখন একই ধরনের উষ্ণতা। পারুর মতো জড়ানো গলায় বলল, দূর থিকা তোমার মিহি চাইয়াঐ এইডা বুজছিলাম। আমারও বহুত ইচ্ছা করছিল।
এই যে তুমি আইলা, অহন আবার কয়দিন ভাল থাকুম।
বাইরের অন্ধকার রাত গম্ভীর হচ্ছে। ঝিঁঝি ডাক প্রবল হয়েছে। কামারবাড়ির ওদিককার গাছে বসে গলা ছেড়ে ডেকে যাচ্ছিল এক কোকিল।। কুহু কুহু।
.
মোতাহারের পেট ফুলে ভোজকোমড় (অতিকায় মিষ্টি কুমড়া) হয়ে গেছে।
কোথায় কোন বাড়িতে মেজবানি খেতে গিয়েছিল। গোরুর গোস্ত, মুগের ডাল আর দই খেয়েছে পেট ভরে। তারপরই পেট ফুলে ভোজকোমড়। সেই ফোলা পেটে শুকনা মুখে তহুরা বেগমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ও মা, দেহ আমার পেটটা কেমুন ফুইল্লা গেছে। বুকটা কেমন করতাছে, গলাডা জ্বলে। খালি চুমা ঢেউক উটতাছে।
তহুরা বেগম যেন শুয়ে আছেন বড়ঘরের পালঙ্কে। পায়ের কাছে বসে যেন রহিমা তার পা টিপে দিচ্ছে। এই অবস্থায় ছেলের কথা শুনে যেন দিশাহারা হলেন। বুকের ধড়ফড়ানি যেন বাড়ল। উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, আয় বাজান, আমার কাছে আয়। আমার বুকের কাছে। আইয়া হো। আমি তর পেট দোয়াইয়া দেই, বুক গলা দোয়াইয়া দেই। দেকবি আরাম লাগবো। ফাপা পেট ভাল অইয়া যাইবো।
তারপর যেন রহিমার দিকে তাকিয়েছেন তহুরা বেগম। ওই রহি, তুই অহন যা। আমার পোলায় হুইবো আমার কাছে।
রহিমা বেরিয়ে যাওয়ার লগে লগে যেন তহুরা বেগমের বুকের কাছে শিশুর মতো শুয়ে পড়েছে মোতাহার। আর নিজের অজান্তেই যেন ছেলের পেটে বুকে গলার কাছটায় হাত বুলাতে শুরু করেছেন তহুরা বেগম। আধো আধো গলায় ছেলেকে বলছেন, দেহিচনে বাজান অহনঐ পেট ফাঁপা কইম্যা যাইবো। আরাম লাগব।
একটুক্ষণ চুপ থেকে মোতাহার যেন বলছে, হ মা, আমার অহন বহুত আরাম লাগতাছে। পেটফুলা কইম্যা গেছে, বুকখানও ভাল, গলাডা আর জ্বলে না।
তারপর মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে যেন মুখটা গুঁজে দিয়েছে তহুরা বেগমের বুকে, একহাতে জড়িয়ে ধরেছে মায়ের গলা। আমি তোমার কাছে থাকুম মা। তোমার লগে থাকুম। তুমি যে আমারে ভিন্ন কইরা দিছো, আমি যে একলা একলা অহন অন্য একখান ঘরে হুইয়া থাকি, মা, ওমা আমার কথা তোমার মনে অয় না? আমার লেইগা তোমার মায়া লাগে না মা? মনডা কান্দে না? আমারে ছাইড়া তুমি কেমতে থাকো?
ছেলের কথা শুনে তহুরা বেগমও যেন তার মাথাটা গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরেছেন। বুকে। ছেলের মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলছেন, হ বাজান, তর লেইগা আমার বহুত মায়া লাগে, মনডা বহুত কান্দে। তরে আমি আর একলা ঘরে হালাইয়া রাখুম না। আমিও আইয়া থাকুম তর লগে। কয়ডা দিন সবুর কর বাজান।
ফজরের আজানের আগে আগে এই স্বপ্নটা দেখলেন তহুরা বেগম। তারপরই ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙার পর বুকটা একটু ধড়ফড় করে তার, অস্থির অস্থির লাগে। আজ আর তেমন হল না। আজ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতোই লাগছে। তয় মনটা কেমন হয়ে আছে। জেগে ওঠার পরও যেন মোতাহারকে বুকের কাছে শুয়ে থাকতে দেখছেন। ছেলের শরীরের স্পর্শ যেন পাচ্ছেন। আর কেমন যেন ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। সত্যি তো ছেলেটি তার কোথাকার কোন একলা ঘরে গিয়ে শুয়ে আছে! কবর তো আসলে এক প্রকারের ঘরই! সেই ঘরে আজ চার বছর কেমন আছে তার বুকের মানিক! কবরের অন্ধকারে চার বছরে মানুষের শরীর কি আর শরীর থাকে! শরীর থেকে আস্তে ধীরে খসে যায় ছাল চামড়া মাংস, গলে গলে মাটির শরীর মাটিতে মিশে। চোখ গলতে থাকে পানির তলায় দিনের পর দিন পড়ে থেকে যেমন করে গলে রোয়াইল ফল। থাকে শুধু শরীরের খাঁচা, হাড়, দাঁত নখ চুল। দিনে দিনে এসবও মিশে মাটিতে।
চার বছরে কি শরীরের হাড়ও মাটিতে মিশে গেছে মোতাহারের! দাঁত নখ চুল সব মিশে গেছে! দুনিয়াতে এসে কিছুদিন কাটাল একজন মানুষ, তারপর চলে গেল কবরে। চোখ থেকে চোখের আড়ালে। তারপর কবরের ভিতর থেকেও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একদিন, উধাও হয়ে গেল! এই তো মানুষ, এই তো মানুষের জীবন।
