এই তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতেই দরজা খুলল পারু। যেমন নিঃশব্দে দরজা খুলল ঠিক সেই ভঙ্গিতেই ঘরে ঢুকল আতাহার। পায়ের চাপে পাটাতনের তক্তায় মৃদু কাঁপন লাগল। উত্তর দিককার জোড়া হিজলগাছের পাশের পায়েচলা পথে চক থেকে আজ উঠে আসছে সে। ওদিক দিয়ে আসছে বলেই ঘরের পিছন দিককার দরজায় আলো ফেলেছে। অন্যকোনও সীমানা দিয়ে উঠলে সামনের দরজায় আলো ফেলত।
ঘরে ঢুকেই ক্লান্তির শ্বাস ফেলল আতাহার। পরনে সাদার উপর নীল ডোরাকাটা লুঙ্গি আর খয়েরি রঙের ফুলহাতা শার্ট। শার্টের হাতা বগল তরি গুটানো। বুকপকেটে ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট, ম্যাচ। পায়ে বাটা কোম্পানির স্যান্ডেল। পারু যখন নিঃশব্দে দরজার ডাসা লাগাচ্ছে তখন স্যান্ডেল খুলে পালঙ্কে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছে আতাহার। মাথার কাছে বালিশের পাশে রেখেছে টর্চ।
পারু এসে তার পাশে বসল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে আতাহার এলে তার গলার স্বর এমন একটা স্তরে নামে, না একেবারেই ফিসফিসা না তেমন কোনও শব্দ, শুধু দুইজন শুনতে পায় দুইজনার কথা। এমনকী এই ঘরের বাইরে বেড়ার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বা বেড়ায় কান লাগালেও কেউ শুনতে পাবে না তাদের কথা। অদূরে কেবিনে শুয়ে থাকা কোনও শিশুর যদি কোনওক্রমে ঘুম ভেঙে যায় সেও শুনতে পাবে না কিছু, বুঝতে পারবে না। মা’কে হাতের কাছে শুয়ে থাকতে না দেখে ভাববে নিশ্চয় বাইরে (প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাওয়া অর্থে) গেছে মা।
আজ রাতে আতাহারের পাশে বসেই শার্টের উপর দিয়ে তার বুকে ডানহাতটা রাখল পারু। রঙ্গিনী গলায় বলল, এত রাইত করলা ক্যা?
আতাহার ক্লান্ত গলায় বলল, কাম আছিল।
কী কাম?
যেই হগল কাম করি রোজ, ঐহগলঐ।
করো তো খালি চাডামি।
আর কী করুম কও। দোস্তগো লগে চাডামি আর তোমার লগে বদামি এই দুইডা ছাড়া আমার কোনও কামঐ নাই।
সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল আতাহার, ম্যাচ জ্বেলে সিগ্রেট ধরাল।
পারু আহ্লাদী গলায় বলল, অহন আবার সিকরেট ধরাইলা?
হ ধরাইলাম।
তয় আমি যে তোমার লেইগা পান সাজাইয়া রাকছি!
দেও, পানও খাই।
শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখা পান বের করল পারু। দেখে পানের জন্য হাত বাড়িয়েছে আতাহার, হাতটা সরিয়ে দিল। ক্যা আমি খাওয়াইয়া দিতে পারি না?
সিগ্রেটের ধোয়া ছেড়ে হাসল আতাহার। পারবা না ক্যা? দেও খাওয়াঐ দেও।
আতাহার হাঁ করল, তার মুখে পান গুঁজে দিল পারু। ঘচর মচর করে সেই পান মুখের আয়ত্তে এনে আতাহার বলল, আসলে আমার মিজাজটা বহুত খারাপ।
ক্যা গো?
এইসব সময়ে অনেক সময়েই গো কথাটা বলে পারু। আতাহারের খুব ভাল লাগে কথাটা। এখনও লাগল। মন ভাল করা গলায় পান চাবাতে চাবাতে, সিগ্রেটে টান দিতে দিতে বলল, খালি আইজঐ খারাপ না, অনেকদিন ধইরাঐ খারাপ।
কবে থিকা, আমি জানি।
কও তো কবে থিকা?
ওই যে নূরজাহানি যেদিন আব্বার মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছে।
হ। হেদিন থিকা শইলডা জ্বইল্যা যাইতাছে। মনে অইতাছে চুতমারানির ঝিরে ধইরা…।
আতাহারের কথা শেষ হওয়ার আগেই গম্ভীর গলায় পারু বলল, আমার সামনে আকথা কুকথা কইবা না।
আতাহার থমকাল। না আকথা আমি তোমার সামনে কোনওদিনও কই না। আমি জানি ওই হগল কথা তুমি বহুত ঘিন্না করো।
হ। তোমার লগে আমার সব পদের সম্বন্ধঐ আছে, কিন্তু আমার মোকে আইজ তরি তুমি কোনওদিন কোনও অসইভ্য কথা হোনো নাই।
হ, আমার মোকেও তুমি হোনো নাই।
পয়লা পয়লা দুই চাইরবার হুনছি। তারবাদে আমি যহন কইছি অসইভ্য কথা হোনতে আমার ঘিন্না লাগে তহন তুমি ওই হগল কথা কওন বন্ধ করছে।
সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে পালঙ্কের মাথার দিকে ডলে ডলে নিভাল আতাহার, তারপর। ছুঁড়ে ফেলে ঘচর মচর করে মুখের পানে কয়েকটি চাবান দিয়া বলল, তোমার এই সবাবখান আমার বহুত ভাল লাগে। তোমার সব কিছুর মইদ্যে ভারী একখান সইনদর্য আছে। তয় আমি কইলাম নূরজাহানিরে লইয়া বদকথা কইতে চাই নাই। তুমি আগে চেইত্তা গেলা।
আতাহারের কথা শুনে গম্ভীর ভাব কেটে গেল পারুর। বলল, বাদ দেও অন্য মাইনষের কথা। আহো নিজেগো কথা কই।
আতাহারের শার্টের বোতাম খুলতে লাগল পারু। যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, আমার জিনিসটা আনছো?
আতাহার হাসল। না আনলে উপায় আছে?
আছে।
কী উপায়?
তুমি আবার বাপ অইবা!
সব্বনাশ। হেইডা আর অইবো না। দাদায় বাঁইচ্চা থাকতে তিনবার বাপ অইছি, বুজছি খালি তুমি আর আমি। মাইনষে বোজে নাই। মাইনষে মনে করছে দাদারঐ পোলাপান। অহন কিছু অইলে আর উপায় নাই।
লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বড়ির প্যাকেট বের করে পারুর হাতে দিল আতাহার। অতিযত্নে জিনিসটা আঁচলে গিঁট দিয়া বাইন্দা রাখল পারু।
পারুর হাতে বোতাম খোেলা শার্ট শরীর আলগা করে পুরাপুরি খুলে ফেলল আতাহার। মুখ থেকে চিড়িক করে পানের পিক আর ছোবড়া ফেলল পালঙ্কের মাঝবরাবর পাটাতনের উপর। ধুৎ পান চাবাইতে আর ভাল্লাগে না।
পারু হাসল। আর না চাইলেও অসুবিদা নাই। আমার কাম অইয়া গেছে।
হ অহন আর মাকে গন্ধ নাই।
আতাহারের বুকের কাছে মুখ রেখে শুয়ে পড়ল পারু। দু’হাতে আতাহার তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
পারু বলল, কাজির পাগলা বাজারে গেছিলা?
আতাহার চমকাল। না তো!
তাইলে জিনিস কিনলা কই থিকা?
আমি কিনি নাই।
পারু অবাক হল। তয়?
কিনছে নিখিলা।
