সংসারের বড়ছেলে মোতাহার, তার আগে দুইটা মেয়ে, হাজেরা আর মদিনা, মোতাহারের পর আয়শা, তারপর আতাহার, আতাহারের পর আরেক মেয়ে ফাতেমা, সবার ছোট আজাহার। চার মেয়েরই বিয়াশাদি হয়ে গেছে অনেক আগে। গ্রামে থাকে শুধু মাজারো মেয়ে মদিনা। সাতঘরিয়ায় শ্বশুরবাড়ি। হাজেরা থাকে নারানগঞ্জে, আয়শা আর ফাতেমা ঢাকায়। আয়শা গোপীবাগে আর ফাতেমার বাসা গেন্ডারিয়ায়। আজাহার অনেক বছর ধরে জাপানে। তার টাকায়ই চলছে মান্নান মাওলানার সংসার। অবশ্য জায়গাজমিন আছে ম্যালা। বিলের জমিতে যে পরিমাণ ধান হয়, আর আট-দশটা গোরুর দুধ বেচে যে। নগদ টাকা সব মিলিয়ে মান্নান মাওলানা বেশ অবস্থাপন্ন। চিন্তার মধ্যে চিন্তা তাঁর এখন একটাই, মাজারো পোলা আতাহার। বয়স হয়ে যাওয়ার পরও বিয়াশাদি করছে না ছেলে, সংসারী হচ্ছে না। বাদাইরা (বাউন্ডুলে, বেহিসেবি অর্থে) হয়ে গেছে।
আতাহারের বিয়াশাদি না করার কারণটা অবশ্য বাড়ির সবাই জানে, আত্মীয়স্বজনরাও জানে কিছু কিছু, গ্রামের লোকেও জানে। ভাইর বউর লগে ভাব। ভাইর বউ পারুই নাকি বিয়া করতে দেয় না আতাহারকে।
ওদিকে আজাহার ফিরে আসি আসি করছে জাপান থেকে। জাপান সরকারও নাকি বাংলাদেশিদের আর থাকতে দেবে না তাদের দেশে। অবশ্য টাকাপয়সা যা জমেছে আজাহারের দেশে ফিরে ঢাকার গাউছিয়া মার্কেটে দোকান দিতে পারবে সে। ওই মার্কেটে দোকান নিয়ে বসতে পারলে সারাজীবনের জন্য নিশ্চিন্ত।
বিয়ার বয়স আজাহারেরও হয়ে গেছে অনেক আগে। মাঝেমাঝেই চিঠিতে সে আতাহারের বিয়ার কথা লেখে। সব জেনেশুনেও লিখছে কেন সে বিয়া করছে না। বুঝাতে চাইছে, আতাহার বিয়া না করলে দেশে এসে বড়ভাইকে রেখে ছোটভাই বিয়া করে কী করে? আর এই সমস্যা না মিটলে তাদের সংসারের দুর্নামও তো ঘুচছে না! যতদিন আতাহার বিয়া না করবে ততদিনই লোকে বিশ্বাস করবে ঠিকই বড়ভাইর বউর লগে তার সম্পর্ক। একবার তো সরাসরি তহুরা বেগমকে আজাহার লিখেছিল ভাবির লগে আতাহারের বিয়াশাদির ব্যাপারে কথা বলতে। তহুরা বেগম বলেও ছিলেন। শুনে পারু সরল গলায় বলেছিল, আমি তারে বিয়া করতে না করছিনি? হেয় করে না ক্যা?
শাশুড়িকে অবশ্য সত্য কথাটা বলেনি পারু। সে-ই আসলে আটকে রেখেছে আতাহারের বিয়া। আতাহারকে বলেছে, যতদিন আমি তোমারে খুশি রাকতে পারুম হেতদিন তুমি বিয়া করবা ক্যা? আমি ফুরাইয়া গেলে করবা। যহন আমার শইল ঠান্ডা অইয়া যাইবো, তহন আমি তোমারে কিছু কমু না।
শুনে আতাহার হেসেছে। মোকে কইবা না, তয় অন্তরে তো জ্বলবা।
না জ্বলুম না।
যহন আমি তোমার চোক্কের সামনে বউ লইয়া ঘরে দুয়ার দিমু তহন তোমার কেমুন লাগবো? তহন তুমি জ্বলবা না?
হ জ্বলুম। তয় তহন একখান সান্ত্বনাও আমার থাকবো যে আমি ফুরাইয়া গেছি। আমার তো তোমারে দেওনের লাহান আর কিছু নাই। পুরুষপোলাগো আগে মাইয়ামানুষরা ফুরাইয়া যায়। আমি ফুরামু, তুমি ফুরাইবা না। তোমার শইল চাইবোঐ আরেকজনের শইল।
আতাহারের লগে কবে শুরু হয়েছিল শরীরের খেলা! কতকাল আগে!
দিনটির কথা স্পষ্ট মনে আছে পারুর। সেটা ছিল বসন্তকালের এক মনোরম বিকাল। বসন্তকালের বিকালে ফুরফুর করে বয় চমৎকার এক হাওয়া। গাছের পাতায় আর আকাশে কী যেন এক পরিবর্তন! সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া যেন এসে লেগেছিল পারুর শরীরে আর মনে। বিকালবেলা সেদিন আকাশ রঙের শাড়ি পরেছিল সে। বিয়ার মাস সাতেক পরের ঘটনা।
সেই ঘটনার কথা মাত্র মনে পড়েছে পারুর ঠিক তখনই পাটাতন ঘরের উত্তর দিককার দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে একবার জ্বলে উঠেই নিভে গেল টর্চের আলো। দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল পারু, অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে শরীরের প্রতিটি রোমকূপ যেন আলোড়িত হল। ওই তার মানুষটি আসছে। রাতদুপুরে পারুর লগে মিলিত হতে এসে কখনও সে দরজায় শব্দ করে না, কখনও ফিসফিস করেও নাম ধরে ডাকে না পারুকে। রাতবিরাত চলাফেরা করার স্বভাব বলে টর্চ তার হাতে থাকেই। টর্চের আলো দরজার পায়ের কাছে একবার মাত্র ফেলে। পাটাতনের ফাঁক দিয়ে আলোটা একবার মাত্র ঝিলিক দিয়ে যায় অন্ধকারে। তাতেই পারু বুঝে যায়, মানুষটা তার আসছে। আজ বহুবছর ধরে চলছে এই কায়দা।
তবে প্রতিরাতেই তো আর পারুর কাছে আসছে না সে। সপ্তাহ দশদিনে একবার। মোতাহার মারা যাওয়ার পর অতিকষ্টে চল্লিশটা দিন কাটিয়েছিল তারা। একজনের ভাই। আর আরেকজনের স্বামী মারা গেছে, শরীরের কষ্ট যতই হোক চল্লিশটা দিন অন্তত অপেক্ষা করতে হয়। তারা তা করেছিল। তারপর কয়েকদিন বেশ ঘনঘন দেখা হল। দুই-একদিন পর পরই। তারপর কমে এল। এখন সপ্তাহ দশদিনে একবার আসে আতাহার। যেদিন আসবে সেদিন অদ্ভুত এক কায়দায় সে কথা জানিয়ে দেয় পারুকে। দিনের কোনও না কোনও এক সময় দূর থেকে হোক বা পারুর ঘরের কাছে এসে হোক, সরাসরি পারুর চোখের দিকে তাকাবে। শব্দ না করে ঠোঁট নেড়ে বলবে, আইজ রাইতে আমু।
আতাহারের এই ঠোঁট নাড়া দেখলেও রোমাঞ্চে আলোড়িত হয় পারুর রোমকূপ। ঠোঁট টিপে সামান্য হেসে সেও ঠিক একই কায়দায় বলবে, আইচ্ছা।
মাসিকের সময় কোনও কোনওদিন না করে সে। আবার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী ওই অবস্থায়ও কখনও কখনও রাজি হয়ে যায়। এ এক আশ্চর্য শরীরী তৃষ্ণা দুইজন মানুষের।
