দেলোয়ারা বিড়বিড় করে বললেন, সোবহানআল্লাহ।
মান্নান মাওলানার জন্য আদা চা বানিয়ে, পুরানা আমলের বড় একটা কাপে করে নিয়া আসছে রাবি। দরজার কাছে এসে শোনে ওয়াজ করছেন তিনি। ভয়ে তাঁকে আর ডাকেনি সে। ওয়াজরত মাওলানার মনোযোগ নষ্ট করলে আল্লাহ ব্যাজার হবেন। তবে ওয়াজ শেষ হওয়ার লগে লগে অত্যন্ত বিনীতভাবে চায়ের কাপটা সে মান্নান মাওলানার হাতে দিল। নেন হুজুর। মুখেদা দেহেন ঠিক আছেনি!
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিলেন। বেশ গরম চা তবে সেই গরম চা তার ঠোঁট জিভে তেমন কোনও আলোড়ন তুলতে পারল না। শব্দ করে চা পান তিনি। চুমুকে চুমুকে লুইপস লুইপস করে শব্দ হতে লাগল। এই ধরনের শব্দ দেলোয়ারা অপছন্দ করেন। বনেদী বংশের মেয়ে। জন্মের পর থেকেই নানাবিধ সহবত তাদের শিখানো হয়েছে। সেইসব সহবতের একটা হচ্ছে পানি, দুধ চা যাই খাবে ঠোঁটে গলায় শব্দ হবে না। দুধভাত ডালভাত যাই খাবে, প্লেটে চুমুক দিয়ে খাবে ঠিকই শব্দ হবে না। ফলে ছোটবেলা থেকেই এই ধরনের শব্দ শুনলে গা রি রি করে দেলোয়ারার।
এখনও করছিল। অন্য কেউ হলে বেশ একটা ধমক তাকে দিতেন দেলোয়ারা। মান্নান মাওলানা মরুব্বি মানুষ, তাকে তো আর ধমক দেওয়া যায় না!
বিরক্তি চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন দেলোয়ারা।
রাবির হয়েছে অন্য অবস্থা। গভীর আগ্রহ নিয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। চা ঠিক হয়েছে কী না বুঝতে পারছে না। ঠিক না হলে মাওলানা সাহেবের অদিশাপ (অভিশাপ) এসে লাগবে তার ওপর। জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে।
চা শেষ করে কাপটা রাবির হাতে ফিরত দিলেন মান্নান মাওলানা।
রাবি ভয়ে ভয়ে বলল, কিছু দিহি কইলেন না?
মান্নান মাওলানা রাবির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। কী কমু?
চা কেমুন অইছে? খাইয়া আরাম পাইছেননি?
ভাল অইছে। আরাম পাইছি।
লগে লগে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল রাবির। তাইলে আমার পোলাডারে একটা ফুঁ দিয়া দেন।
কী অইছে তোমার পোলার?
হারাদিন খালি বানরামি (বাদড়ামো) করে।
কো?
চুলারপাড় বইয়া চা খাইতাছে।
ভুরু কুঁচকে রাবির দিকে তাকালেন দেলোয়ারা। চা খাইতাছে।
হ। বাডিতে কইরা এই এতডু চা লইছে, লইয়া ফুঁ দিয়া ফুঁ দিয়া খাইতাছে।
পোলাপানের চা খাওন ভাল না। শইল কইষা (কষে) যাইবো। আদা চা শইল কষাইয়া হালায়।
রাবি একথা পাত্তা দিল না। পিছনের দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকল। ঐ বাদলা হবিরে (তাড়াতাড়ি) আয়। হবিরে।
চোখের পলকে ছুটে এল বাদলা। কীর লেইগা বোলাও (ডাক)!
আয়।
বাদলার হাত ধরে মান্নান মাওলানার সামনে এনে দাঁড় করাল রাবি। দেন, ফুঁ দেন। ও যেন আর কইতর দেকতে যাইতে না পারে, মোতালেইব্বা যেন অরে আর না মারতে পারে আর চা যেন ও আর কোনওদিন না খাইতে চায়।
রাবির কথা শুনে বেদম হাসি পাচ্ছিল দেলোয়ারার। অন্যদিকে তাকিয়ে হাসি চাপছিলেন তিনি। তবে মান্নান মাওলানা নির্বিকার। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছেন। পড়ে ফুস ফুস করে তিনটা ফুঁ দিলেন বাদলার মাথায়। যা।
রাবির দিকে তাকিয়ে বললেন, কোনও অসুবিদা অইলে আমার বাইত্তে লইয়া যাইয়ো। ফুঁ দিয়া দিমুনে। লাগলে পানি পড়াও দিমুনে।
আইচ্ছা।
রাবি গদগদ হয়ে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেল।
রাবি বেরিয়ে যাওয়ার পর মান্নান মাওলানা বললেন, বইনপোরে তুমি খবর দেও বইন, আমি নিজে হের লগে কথা কই। তুমি তো কইবা, লগে যুদি আমিও কই, কথাডায় জোর অইবো।
দেলোয়ারা বললেন, আইচ্ছা খবর পাডামুনে।
কাম কাইজ শুরু করনের পর হের কোনও চিন্তা ভাবনা করন লাগবো না। মজজিদের বেবাক কাম আমি কইরা দিমু। দিনরাইত খাইট্টা মজজিদ বানাই দিমু। ইমামতিও করুম। বইনপোর কোনও ব্যাপারে চিন্তা করন লাগবে না।
মজজিদটা করবেন কই?
ক্যা তোমগো ছাড়ায়!
ঐ ডা তো আমার বাপের জাগা।
বাপের জাগা অইছে কী অইছে। অহন মালিক তুমি আর তোমার বইনে।
হ।
বেরাদারি হক (যে লোকের ছেলে সন্তান না থাকে, শুধু মেয়ে থাকে তার জায়গা সম্পত্তির সামান্য একটি অংশ ওই লোকের ভাই বোনরা পায়। এই ব্যাপারটিকে বোঝানো হচ্ছে) তো তোমার চাচা ফুবুগো কাছ থিকা তোমরা কিন্না লইছো!
হ অনেক আগেঐ লইছি।
তাইলে আর কোনও ঝামেলা নাই। তোমগো কাছ থনে তোমার বইনপোয় ঐ বাড়ি কিন্না লইবো।
এইডা ঠিক অইব না। যেই বইনপোরডা খাইয়া বাচতাছি তার কাছে কেমতে কমু আমগো ছাড়াবাড়ি কিন্না মজজিদ বানা।
তাইলে বইনপোর নামে বাড়িডা লেইক্কা দেও। আর নাইলে মজজিদের নামে ওয়াকফা কইরা দেও।
ঠিক আছে। এনামুলরে খবর দেই, আহুক, তারবাদে যা করনের করুম।
তয় আমি মনে করি মজজিদটা তোমগো করন উচিত।
আপনে চিন্তা কইরেন না। করুম।
এ কথায় আনন্দে একেবারে দিশাহারা হয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। কাঁচাপাকা দাঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখ হাসিতে ভরে গেল। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। আমি জানতাম তুমি আমার কথা না হুইন্না পারবা না। বড় ঘরের মাইয়া তোমরা, বড়। বংশের মাইয়া, তোমগো আদব লেহাজঐ অন্যরকম। ময়মুরুব্বিগ মানতে শিখছো। আল্লায় তোমার বইনপোরে আরও বড় করুক।
একটু থেমে বললেন, তাইলে আমি অহন যাই বইন। বইনপোয় আইলে খবর দিও।
দেলোয়ারাও তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, আইচ্ছা।
