একথা শুনে অপলক চোখে আতাহারের মুখের দিকে তাকিয়েছিল পারু। তুমি জানো না ছোডমিয়া, পোলাপান তিনডা কেমতে অইছে!
সেই রাতটাও ছিল আজকের মতোই রাত দুপুর, আজকের মতোই ঘুটঘুইটা আন্ধাইরা রাত। ছেলেমেয়েদেরকে আজকের মতোই কেবিনে ঘুম পাড়িয়েছে পারু। গভীর ঘুমে যখন ছেলেমেয়ে তিনটা পুকুরতলার থিকথিকা কাদা তখন কেবিন থেকে পা টিপে টিপে বের হয়ে আসছে পারু। কেবিনের দরজার বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়েছে। হারিকেন নিবুনিবু করে পাটাতনের এক কোণে রেখে নিজে চুপচাপ বসে থেকেছে কেবিনের বাইরে, পুবদিককার জানালার লগে রাখা শক্ত ধরনের পালঙ্কে। সুগন্ধি দিয়ে সাজিয়েছিল দুইখান পান, নিজে একটা মুখে দিয়া আর একটা রেখে দিয়েছিল তার গভীর রাতে চুপি চুপি আসা শরীর ও মন মানুষটির জন্য। মুখে সারাদিন ধরে জমে থাকে তার সিগ্রেটের বদগন্ধ, কোনও কোনওরাতে মদ খেয়ে আসে। মদের গন্ধটা তেমন খারাপ লাগে না, লাগে সিগ্রেটেরটা। যে রাতেই পারুর কাছে আসে সে পারু তার জন্য পান সাজিয়ে বসে থাকে। নিজের মুখের সুগন্ধি পান, দয়িতের মুখের সুগন্ধি পানের সুবাসে শরীরের মিলন অন্যরকম এক আনন্দময়তা বয়ে আনে।
কিন্তু আজ এত দেরি করছে কেন সে? কোথায় বসে চাটামি (আচ্ছা অর্থে) করছে ইয়ার দোস্তদের লগে! নিশ্চয় আলী আমজাদের ছাপরা ঘরে! নিখিলদের বাড়িতেও যেতে পারে। কিছুদিন ধরে ঘনঘন যাচ্ছে নিখিলদের বাড়িতে। ফুলমতির দিকে নজর পড়েনি তো! এই বাড়িতেও তো মন্তাজদের ঘরে প্রায়ই যাচ্ছে আজকাল। মন্তাজের বুড়িমার দেখাশোনা করে যে ডাঙ্গর ছেমড়ি ফিরোজা, বাপে পোয়ে দু’জনেই কি নজর দিয়েছে ছেমড়ির দিকে! মাজায় কত জোর তার, এতদিন ধরে পারুরই লগে থেকেও কি তার শরীরের ঝাজ (তাপ) মিটছে না! পারু কি তাকে খুশি রাখতে পারছে না! কই এমন কথা তো সে কখনও বলে না! মিলিত হওয়ার সময় সেই শুরু থেকেই তো প্রতিবার কোনও না কোনওভাবে বলে, তুমি খুব ভাল! তোমার লগে থাইক্কা বহুত আরাম পাই। দুই-চাইরদিন পর পরঐ তোমার লগে না থাকলে শইল ফাইট্টা যাইতে চায়। দেহ না তোমার হায়েজের (মাসিক) সময়ও মানতে চাই না আমি।
আজ রাতে পালঙ্কে বসে নিবুনিবু হারিকেনের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে পারু। যদি সত্যি সত্যি এমন হয় তা হলে অন্য মেয়েছেলের কাছে কেন যাবে সে! পারুই বা তা সহ্য করবে কেন!
আজ কি এসব নিয়ে তার কথা বলবে পারু!
এখনও সে আসছে না কেন? মুখের পান যে ফুরিয়ে যেতে বসল পারুর! তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে বুঝি মুখের সুগন্ধও মিলিয়ে যাবে।
আথালের পিছনকার আমগাছে বুঝি আজ আশ্রয় নিয়েছে কোনও কাক। এক-দুইবার ডানা ঝাঁপটাল সেই পাখি। সন্ধ্যার আগ থেকেই কামারবাড়ির ওদিকে ডাকছে একটা। কোকিল। রাতদুপুরে কোকিলের এরকম ডাকে বুকের ভিতর কেমন করে মন মানুষের জন্য অপেক্ষা করা মানুষের। পারুরও করছিল। এই ভাব আচমকাই উধাও হল গণি মিয়ার সীমানায় তাদের কালোপানা নেড়িকুত্তাটা যখন ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তা হলে কি ওদিককার সীমানা দিয়ে বাড়িতে এসে উঠেছে সে! রাতদুপুরে নিজেদের সীমানায় মানুষ দেখে ঘেউ দিচ্ছে প্রভুভক্ত কুকুর! তারপর সেই মানুষের গায়ে চেনাগন্ধ দেখে নিরস্ত হয়েছে!
তার পরও অপেক্ষার পালা শেষ হয় না পারুর। সময় বয়ে যায়, তার মানুষটা আসে না।
আতাহারের জন্য এই অপেক্ষা পারুর তৈরি হয়েছিল বিয়ার কিছুদিন পর থেকেই। বয়সে তারা দুইজন কাছাকাছি। পারু হয়তো বছরখানেকের বড় হতে পারে। আত্মীয়ের মধ্যে সমন্দ হয়েছিল, মান্নান মাওলানার সম্মায়ের দিককার মামাতো ভাইয়ের মেজোমেয়ে পারু, ছোটবেলা থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে আসাযাওয়া ছিল। পারুর বাপের বাড়ি বহুদূরের দিঘিরপারের ওদিককার গ্রাম বেসনাল আর আতাহারদের বাড়ি মেদিনীমণ্ডল, তবু দুই-চার বছরে বিয়াশাদির অনুষ্ঠানে আসাযাওয়াটা ছিল। লতায় পাতায় হলেও ভাইবোনের। সম্পর্কটা তাদের ছিল। এই কারণেই বাড়ির বউ হয়ে আসার পরও বউ আসলে হতে পারেনি পারু, আত্মীয়ের মেয়ে হয়েই ছিল। এই বাড়িতে এসেই সমবয়সি আতাহারের লগে। খুনসুটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বাড়ির কেউ কিছু মনে করত না। মোতাহারও না। কারণ এরকম খুনসুটির সম্পর্ক যে অন্যদিকে গড়াতে পারে এমন ভাবনা ভাবার মতন মন তার ছিলই না। সে ছিল তার রোগা পেট নিয়া ব্যস্ত। পেট একটু ভুটভাট করলেও বউকে কিছু না বলে মা-ন্যাওটা শিশুর মতো তহুরা বেগমের কাছে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করত। ও মা, কাইল। রাইত থিকা আমার পেটটা জানি কেমুন ফাঁইপপা (ফেঁপে) রইছে। পায়খানাডাও ঠিক মতন অয় নাই। গলাডা জ্বলতাছে, চুমা ঢেউক (এক প্রকারের ঢেকুর) উটতাছে।
পেটরোগা ছেলেটির জন্য অন্যরকমের একখান টান বড় হয়ে যাওয়ায় পরও, বিয়াশাদি করে আলাদা সংসারের মালিক হয়ে যাওয়ার পরও তহুরা বেগমের রয়ে গিয়েছিল। ছেলে যখনই গিয়া মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করত, মা তাকে নিয়া ব্যতিব্যস্ত হতেন। রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকলেও সেসব ফেলে উঠে আসতেন। অমুকটা কর বাজান, তমুকটা কর বলে ছেলেকে সান্ত্বনা দিতেন। পেটে পিঠে, গলায় বুকে হাত বুলিয়ে দিতেন। যেন মোতাহার সংসারী ছেলে নয়, যেন এখনও সে ছোট্ট শিশুটি। মা হাত বুলিয়ে দিলেই যেন পেটের যন্ত্রণা মিটে যাবে, আরাম পাবে সে। কখনও কখনও পেটের যন্ত্রণায় শিশুর মতো মায়ের পাশে গিয়ে শুয়েও থাকত সে। মা তার পেটে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন।
