তবে ভাল ভালাই খাওয়ার ব্যাপারে বেজায় লোভ ছিল মোতাহারের। বিয়ার পর পরই মান্নান মাওলানা তাকে ভিন্ন করে দিয়েছিলেন। পুব-উত্তর কোনার চৌচালা একখান ঘর, ঘরের পশ্চিমে একটুখানি উঠান, মাথার ওপর জঙে খেয়ে ফেলা তিনখান ঢেউটিন ফেলা, তিনদিকে হরমাইলের বেড়া, সামনের দিকটা খোলা এমন রান্নাচালা। রান্নাচালার পুবপাশে ছোট্ট আথাল, দুই-তিনখানে বেশি গোরু বাছুর আঁটবে না, এমন। আথালের মাথার উপর আমগাছ। সেই গাছের তলা দিয়ে চিকন রাস্তা উত্তর দিককার নামায় নেমে গেছে। ভিন্ন করে দেওয়ার পর একটা দুধেল গাই, একটা দামড়ি আর দুইটা কাহিল আবাল বড়ছেলেকে দিয়েছিলেন মান্নান মাওলানা। আথালের লগের রাস্তা দিয়া ভাঙনের দিকে নামলেই বাকাচোরা দুইখান হিজলগাছ, লম্বা খালের মতন সরু একখান ডোবা, ডোবায় তক্তা ফেলে বউ পোলাপানের জন্য ঘাটলা করেছিল মোতাহার। খরালিকালে ডোবার পানি তলায় গিয়ে ঠেকলে এদিককার ঘাটলা আর ব্যবহার করতে পারত না তারা। তখন যেতে হত বাড়ির সামনের দিককার পুকুরে। ওই পুকুরের খাই বেশি।
ডোবার ওপারে আড়াইকানি ধানের জমিন মান্নান মাওলানার। বাঁজা ধরনের জমি। বিলের জমিগুলির মতো পোম (উর্বরা শক্তি) নাই এই জমির। বছরভর খেটে ধান যা পাওয়া যায়, পড়তা পড়ে না গিরস্তের। চাষের জন্য এই জমিটুকুই মোতাহারকে দিয়েছিলেন মান্নান। মাওলানা। চাষবাসের দিনে আবালের কাঁধে লাঙল জোয়াল দিয়া সকাল থেকে দুপুর তরি মাথলা মাথায় জমি চষত মোতাহার, তারপর বাড়িতে এসে গোসল খাওয়া সেরে আবার যেত খেতে। একলা মানুষ বলে যে কাজ দশদিনে হওয়ার কথা, মোতাহারের লেগে যেত পনেরো-কুড়িদিন। তার উপর দুর্বল পেটরোগা লোক, আজ এটা কাল ওটা লেগে আছে। তবু ঘরগেরস্তিটা সে মন দিয়ে করত। খেত চষা শেষ করে ইটামুগুর দিয়া খুটখুট করে চাকা ভাঙত, মই দিত। মাথায় টুপি দিয়ে আগল ভরতি বীজধান নিয়ে খুবই মনোযোগ দিয়ে পাইট (পাট) করা জমিতে ছড়িয়ে দিত। বছরের প্রথম বৃষ্টি পেয়েই অঙ্কুরিত হতো বীজ।
পারুলের মনে আছে, মাথায় টুপি দিয়ে বীজ ছড়ানোর ব্যাপারে মোতাহার তাকে একবার বলেছিল, জমিনে ফসল ফলানো অইলো এবাদত বন্দেগির লাহান কাম, পাক পবিত্র কাম। এই কাম নাইয়া ধুইয়া, অজু কইরা, মাথায় টুপি দিয়া করতে অয়। নাইলে মাড়ি বেজার অয়, ফসল দেয় না।
এসব বিয়ার ছয়-সাত মাস পরের ঘটনা। স্বামী লোকটাকে ততদিনে অনেকখানি বুঝে ফেলছে পারুল। নির্বিরোধ স্বভাবের, অতিশান্ত, কারও সাতেপাচে না থাকা লোক। দুর্বল, পেটরোগা। রাতেরবেলা স্বামী-স্ত্রীর ভাব ভালবাসায় পারুল যখন মাত্র উত্তপ্ত হয় তখনই ফুরিয়ে যায় মোতাহার, মরার মতন ঘুমায়া পড়ে। আর পারুলের রাত কাটে ছটফট করে, শরীরের যন্ত্রণায়। কারণ পারুল স্বাস্থ্যবতী, একহারা সুন্দর গড়নের। শরীরে টগবগ করে ফুটছে যৌবন। এই ধরনের মানুষ সহজে বুড়া হয় না, শরীর ছেড়ে যৌবন তাদের সহজে যায় না।
পারুরও যায়নি। বেশ কয়েক বছর স্বামীর ঘর করেছে সে, তারপর স্বামী মরেছে আজ চার বছর। তিন ছেলেমেয়ে নিয়া বিধবা জীবন। তবু যেন সেই প্রথম যৌবনের মতনই রয়ে গেছে পারু। সংসারের দুর্বিপাক একটুও কাবু করতে পারেনি তাকে। একটুও ম্লান করতে পারেনি তার সৌন্দর্য। এখনও যখন দিনের কাজ শেষ করে বিকালের মুখে মুখে মাথায় একটু নারকেল তেল দেয়, মাথা সুন্দর করে আঁচড়ায়া মাথাভরতি ঘন কালো পিঠ ছাপানো চুল গ্রীবার কাছে আলগা খোঁপা করে রাখে, চোখে দেয় একটুখানি কাজল, এই সামান্য প্রসাধনেই তাকে সদ্য যৌবন পাওয়া বালিকার মতন মনে হয়। শ্যামলবরণ মুখ শিশুর ত্বকের মতো লাবণ্যময়। পুঁটিমাছ আকৃতির চোখ দুটিতে সরল সুন্দর দৃষ্টি। পেটে জমেনি এক ফোঁটাও মেদ, পারুর বুক এখনও অবিবাহিতা যুবতীর মতো, শক্ত ধরনের, হাঁটাচলায় তেমন দোল খায় না। পিছন দিক কখনও তেমন ভারী নয়, ছিপছিপা শরীরের লগে মানানসই। এখনও হঠাৎ হঠাৎ কেউ কেউ তাকে দেখে অবিবাহিতা মনে করে। এই তো গেল বছরও কী যেন কী কাজের ব্যাপারে কথা বলতে এসে কে একজন তার ছেলের জন্য পারুর বিয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। লোকটা ভেবেছে পারু মান্নান মাওলানার মেয়ে। আচমকাই ভিতর বাড়ির দিকে পারুকে এক পলক দেখেছিল। অবিবাহিতা ভেবে বিয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এই নিয়ে বাড়িতে কী হাসাহাসি! পারুকে কথাটা বলেছিল রহিমা। অবশ্য আতাহারও বলেছিল। বলেছিল খুবই গম্ভীর গলায়। তার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলেছিল পারু।
কথায় কথায় প্রাণ খুলে খিলখিল করে হাসার স্বভাব আছে তার। যে-কোনও বিষয়ে ঠাট্টা মশকরা করার, মজা করার স্বভাব আছে। আতাহারের মুখে বিয়ার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলেছিল, আব্বায় কইলেঐ পারত, হ আমি তার ছোড মাইয়া। অহনও বিয়া অয় নাই। বিয়া দিয়া দিলেঐ পারত আমারে!
শুনে আতাহার বলেছিল, মনে হয় বিয়া বহনের খুব শক।
দুইহাতে আতাহারের গলা জড়িয়ে ধরে পারু বলেছিল, হ, খুব শক। খুব।
একবার বিয়া বইয়া সাদ মিটে নাই?
না গো, না। যেই বিয়া আমার অইছিলো হেইডা কোনও বিয়ার জাতঐ না। তোমার ভাইয়েও জামাইয়ের কোনও জাত আছিলো না।
ভাইয়ে যুদি জামাইয়ের জাত না অয় তাইলে তিনডা পোলাপান তোমার অইলো কেমতে?
