আতাহার নাম শুনে যেন সাপের ফণায় মন্ত্র পড়া ধুলা পড়ল এমন ভঙ্গিতে গুটিয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। বললেন, আতাহার, আমার পোলা আতাহার?
হ।
ও আহেনি এই ঘরে?
ফিরোজা আগের মতোই জড়সড় ভঙ্গিতে বলল, আহে। পেরায় পেরায়ঐ আহে।
কীর লেইগা?
আইয়া বুজির লগে প্যাচাইল পোচাইল পাড়ে।
একলাঐ আহে নাকি ইয়ার দোস্তগো লইয়া?
একলাঐ। দুই-তিনদিন খালি নিখিলদাদারে লইয়াইছিল।
চোখ তীক্ষ্ণ করে ফিরোজার দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। তর লগে কথাবার্তা কয় না?
ফিরোজা ভয়ার্ত গলায় বলল, কয়।
কী কয়?
এসময় বুড়ি আবার তার নিজের মতো করে কী কী বলল, মান্নান মাওলানা বুঝতে পারলেন না, ফিরোজা বুঝল কিন্তু কিছু বলল না। তার বুক এখন ঢিবঢিব করছে। আতাহার দাদায় যে এই ঘরে আসে একথা বলে নিশ্চয় সে বড় রকমের ভেজাল লাগিয়ে দিয়েছে। মাওলানা হুজুর এই নিয়ে নিশ্চয় আতাহার দাদার লগে কথাবার্তা বলবেন। সব শুনে আতাহার দাদা যাবে ফিরোজার উপর বিগড়ে।
ইস কেন যে কথাগুলি বলে ফেলল ফিরোজা! বুজি বলছিলেন বলছিলেন তার বলার দরকার কী! বুজির কথা তো হুজুর আর বুঝতে পারেননি, ফিরোজা চালাকি করে অন্যকথা বলে দিলেও পারত!
মান্নান মাওলানা বললেন, কইলি না আতাহার কী কয়?
ফিরোজা এবার কথা ঘুরাতে লাগল। যা বলবার আগে বলে ফেলেছে সেই কথা তো এখন আর ফিরত নেওয়া যাবে না, চালাকি যা করবার এখন করতে হবে। প্যাচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলে আগের কথা অন্যদিকে ঘুরাতে হবে।
ফিরোজা বলল, বুজির লগে আতাহার দাদার খুব খাতির। হের কথাবার্তাও ভাল বোজে আতাহার দাদায়। হের লগেঐ প্যাচাইল পোচাইল পাড়ে। আমি খালি এককাপ চা বানাইয়া খাওয়াই।
একটুখানি উৎসাহিত গলায় ফিরোজা বলল, আপনেরে এক কাপ চা বানাই দিমু? খাইবেন?
মান্নান মাওলানা অন্যমনস্ক হয়েছিলেন। বললেন, না।
তারপর মনমরা ভাব কাটাবার চেষ্টা করলেন। ফিরোজার দিকে আর ফিরেও তাকালেন, মন্তাজের মায়ের দিকে ঝুঁকে বললেন, আপনে তো গাছির মাইয়ার কথা জিগাইলেন চাচিআম্মা। গেরামের বেবাকতেঐ মনে রাখছে ছেমড়ির কথা। যেই কামডা ও করছে হেই কামের কথা মাইনষের ভোলনের কথা না। তয় আমি কইলাম চাচিআম্মা ভুইল্লা গেছি। নাদান পোলাপান, না বুইজ্জা একখান কাম কইরা হালাইছে, হেইডা মনে রাখন মাইনষের কাম না। আমি আল্লার খাসবান্দা, আমি অরে মাপ কইরা দিছি।
বুড়ি তার মতো করে আবার কী কী বলল, মান্নান মাওলানা বুঝতে পারলেন না, বুঝতে চাইলেনও না। দুইহাতে কেবিনের পাটাতনে ভর দিয়ে মোটা শরীর নিয়ে বেশ কষ্ট করেই। উঠে দাঁড়ালেন। যাইগা অহন। গইন্নাগো ঘরে ইট্টু যামু। এইমিহি আইছিলাম দেইক্কা আপনের লগে দেহা কইরা গেলাম।
কেবিন থেকে নামলেন মান্নান মাওলানা। ফিরোজাও এল তাঁর পিছন পিছন। মান্নান মাওলানার ব্যাপারে এখন যেন সাহস অনেক বেড়ে গেছে তার, এখন যেন তাঁকে আর ভয় পায় না ফিরোজা। এই বাড়িতে আসার পর থেকে যেভাবে তার দিকে চোখ ফেলেছিলেন মান্নান মাওলানা, কোনও না কোনও অছিলায় গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করতেন, আভাসে ইঙ্গিতে ইতর সম্পর্ক তৈরি করতে চাইতেন, আতাহার এই ঘরে আসে। শুনে, ফিরোজা তাকে চা তৈরি করে খাওয়ায় শুনে সেই ভাব উধাও হয়ে গেছে তাঁর। আজ ওই ধরনের কোনও ইঙ্গিত তিনি আর দেননি, ফিরোজার গায়েও হাত দেওয়ার চেষ্টাও করেননি। এইসব কারণেই বোধহয় তার ব্যাপারে আড়ষ্টতা, ডর ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকা একেবারেই কেটে গেছে ফিরোজার। মান্নান মাওলানার ব্যাপারে বুকে চাপ ধরে থাকা ভাবটা উধাও হয়েছে। বুকটা এখন পরিষ্কার। স্বচ্ছন্দে শ্বাস নিতে পারছে ফিরোজা।
আর একটা কথা ভেবেও ফিরোজা খুব খুশি। আতাহার দাদার কথা শুনেই যেহেতু নিভে গেছেন মান্নান মাওলানা, ফিরোজার ব্যাপারে আর কোনওদিনও তা হলে জ্বলে উঠবেন না। ছেলে যেখানে যাতায়াত করে সেখানকার ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন না। ঘামাতে গেলে অস্ত্র তো হাতে একটা পেয়েছেই ফিরোজা, আতাহার দাদার নাম, চট করে বলে দিবে।
এসব ভেবে খুশিতে ফেটে পড়ছিল ফিরোজা।
মান্নান মাওলানা তখন কেবিন থেকে নেমে গম্ভীর মুখে খড়ম পায়ে দিচ্ছেন। ফিরোজা দাঁড়িয়ে আছে কেবিনের দরজায়। খড়ম পরা শেষ করে বললেন, চাচিআম্মার সামনে তো সত্য কথা কইতে পারি নাই, তরে কইয়া যাই। গাছির মাইয়ারে কইলাম মাপ আমি করি নাই। কব্বরে যাওনের আগ তরি অর কথা আমি মনে রাখুম। যেই ছ্যাপ ও আমার মোকে ছিডাইছে হেই ছ্যাপ দিয়া অরে আমি…
কথা শেষ করলেন না মান্নান মাওলানা, খড়মে চটর পটর শব্দ তুলে উঠানে নেমে গেলেন।
কেবিনের দরজায় তখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফিরোজা। ঘরের ভিতর জমতে শুরু করেছে বিকাল শেষের অন্ধকার। বাইরের উঠান থেকে রোদ চলে গেছে দক্ষিণের পুকুর পাড়ে। খানিকপর এই রোদও উধাও হবে।
.
মোতাহার ছিল ঘর গেরস্তি করা লোক।
একটু নরমসরম, দুর্বল ধরনের, পেটরোগা। ভাল ভালাই খেয়ে হজম করতে পারত না। বিয়াশাদির বাড়িতে মেজবানি খেতে গিয়ে স্বাদ করে মোটা চাউলের ভাত আর তেলচর্বিতে গলে গলে যাওয়া গোরুর গোস্ত, লগে আলাম (আস্ত) দুইয়েকখান গোলালু, মাঝারি ধরনের ঘন মুগের ডাল তারপর মেজবানি উপলক্ষে দুইদিন ধরে বাড়িতে পেতে রাখা দই নয়তো খাঁটি দুধের ঘন ফিরনি ভরপেট খেলেই পেট ফুলে ঢোল হয়ে যেত তার। ঘনঘন চুকা ঢেউক (চোয়া ঢেকুর) উঠত, ধরে রাখার চেষ্টা করেও পারত না বলে বাড়ির ময়মুরব্বির সামনে, পোলাপানের সামনে যখন তখন ফুটফাট শব্দে বায়ু ত্যাগ করত। রাতভর বুক গলা জ্বলত, ঘুমাতে পারত না, বিছানায় শুয়ে উসপিস উসপিস করত। কাজির পাগলা বাজারের করিম ডাক্তারকে নিয়মিত দেখাত মোতাহার। ডাক্তার বলেছিলেন রোগটার নাম গ্যাস্ট্রিক। বাছবিচার করে খেতে হবে, নিয়ম করে চলতে হবে। শিশিতে ভরা ঘন দুধের মতন অষুদ দিতেন। খাওয়ার আগে অনেকক্ষণ ধরে ঝাঁকিয়ে চা চামচের দুইচামচ অষুদ আর দুইচামচ পানি মিশিয়ে খেতে হত। লগে সাদা ছোট্ট একখানা ট্যাবলেট। এসব খেয়ে ভালই থাকত মোতাহার। কিন্তু নিয়ম করে অষুদটা সে খেত না। দুই-চারবেলা অষুদ খেয়ে যখনই দেখত পেটের আরাম হচ্ছে তখনই বন্ধ করে দিত। ছয়-সাত বছরের পুরানা বউ পারুল অষুদ খাওয়ার কথা বললেই উদাস হয়ে যেত। কখনও কখনও বিরক্ত হয়ে বলত, পেডে অহন কোনও গোলমাল নাই। খামাখা অষইদ খামু ক্যা?
