মাথায় মাওলানা সাহেবের জরির কাজ করা গোল টুপি। পায়ে টায়ারের দোয়াল (বেল্ট) দেওয়া পুরানা খড়ম। হাঁটার সময় চটর পটর শব্দ হচ্ছিল। দুপুরের ভাত খেয়ে ঘণ্টা দুয়েকের ঘুম দিয়েছেন। চোখ ফোলা ফোলা। নিজের সীমানা পেরিয়ে তিনি যখন মন্তাজের সীমানায় এলেন, মন্তাজদের বড়ঘরের কেবিনের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফিরোজা তাঁকে দেখল। মন্তাজের মায়ের মাথার কাছে বসে তার চুলে বিলি দিচ্ছিল ফিরোজা। বুড়ির তদারকি সারাদিনই করে মেয়েটি। ভয়ার্ত ধরনের, চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে। এক পলক মান্নান মাওলানাকে দেখেই চোখ সরিয়ে নিজের কাজে মন দিল। পরনের শাড়ি গোছগাছ। করে একটু যেন জড়সড় হল।
আড়চোখে ফিরোজার এই ভঙ্গিটা দেখলেন মান্নান মাওলানা। ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটল তার। খরালিকাল এসে পড়েছে বলে মোটা ফ্লানেলের পাঞ্জাবি তিনি আর পরছেন না। তার শরীরে শীত যেমন গরমও তেমন। কোনওটাই সহ্য করতে পারেন না। এজন্য খরালি আসতে না আসতেই গরম লাগতে শুরু করেছে তাঁর। পাতলা সুতি পাঞ্জাবি পরতে শুরু করেছেন। ফিরোজাকে কেবিনের জানালায় দেখার পর হঠাৎ করেই শরীরে অন্য রকমের একটুখানি গর্মিভাব দেখা দিল। বুকে ধাক্কা লাগল। মন্তাজদের বড়ঘরের কেবিনের জানালা বরাবর উঠানে দাঁড়ালেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সবুজ রঙের চিরুনি বের করে হাসিহাসি মুখ করে জানালার দিকে তাকিয়ে পরিপাটি করে দাড়ি আঁচড়াতে লাগলেন।
মান্নান মাওলানাকে দেখে সেই যে মুখ নিচু করে মন্তাজের মায়ের চুলে বিলি কাটার জোর বাড়িয়েছে ফিরোজা সেই জোর আর কমছেই না। খুবই মন দিয়ে কাজটা সে করছে। উঠানে দাঁড়িয়ে যে মান্নান মাওলানা দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন তা যেন তাকিয়ে দেখার সময় নাই ফিরোজার।
ফিরোজার এই ভঙ্গি দেখে বিরক্ত হওয়ার কথা মান্নান মাওলানার, বিরক্ত তিনি হলেন না। শান্ত ভঙ্গিতে দাড়ি আঁচড়ানো শেষ করলেন, চিরুনি পকেটে রাখলেন তারপর খড়মে চটর পটর শব্দ তুলে মন্তাজদের বড়ঘরে এসে ঢুকলেন। চাচিআম্মা, ও চাচিআম্মা! কেমুন আছেন?
মন্তাজের মা বহুবছর ধরে বিছানায় শোয়া। ওঠার ক্ষমতা নাই। চব্বিশঘণ্টা তদারকিতে আছে ফিরোজা। চোখে এখনও একটু একটু দেখতে পায় মন্তাজের মা, কানে কম শোনে। কথাও বলতে পারে তবে পষ্ট না, জড়িয়ে জড়িয়ে যায়। ফিরোজা ছাড়া তার কথা পরিষ্কার কেউ বুঝতে পারে না।
মান্নান মাওলানার গলা শুনে বুড়ি তার জড়ানো গলায় বলল, ওই ফিরি, কে আইলো? কেডা কথা কয়?
ফিরোজা গলা নিচু করে বলল, আতাহার দাদার বাপে।
ফিরোজার এই ধরনের নিচু গলা শুনতে পেল বুড়ি তবে বুঝতে পারল না। বলল, কেডা?
মান্নান মাওলানা খেয়াল করলেন বুড়ি বেশ জোরে জোরে, অনেকটা চিৎকার করে কথা বলে। বোধহয় কানে কম শোনে বলে তার মনে হয় সে আস্তে বললে তার কথা কেউ শুনতে পাবে না। মানুষ সব সময় নিজের অবস্থা দিয়ে অন্যকে ভাবে, অন্যকে বোঝার চেষ্টা করে।
ঘরে ঢুকে মান্নান মাওলানা তখন মাটির মেঝেতে কেবিনের দরজা বরাবর দাঁড়িয়েছেন। শুনলেন মন্তাজের মা বুড়িকে বেশ শব্দ করেই ফিরোজা বলছে, আতাহার দাদার বাপে আইছে। মাওলানা হুজুরে।
মান্নান মাওলানার কথা শুনে বুড়ির আগ্রহ হল। তড়বড়ে গলায় বলল, কো? আইতে ক, আমার কাছে আইতে ক।
কেবিনের দরজার দিকে তাকিয়ে ফিরোজা বলল, আহেন। বুজি আইতে কয়।
খড়ম জোড়া কেবিনে ওঠার সিঁড়ির সামনে রেখে শক্ত পায়ে সিঁড়ি ভাঙলেন মান্নান মাওলানা, কেবিনে বুড়ির যে পাশে ফিরোজা বসে আছে তার উলটা পাশে বসলেন। তিনি কেবিনে ঢোকার লগে লগে, হাঁটা চলার তালে তালে মটমট করছিল কেবিনের পাটাতন, এখন বসার ফলেও তেমন শব্দ হল। এই শব্দে ফিরোজা একটু ভয় পেল। যেই ওজনদার শইল হুজুরের, কেফিনের পাড়াতন ভাইঙ্গা যাইবো না তো!
তার এই ভাবনা এলোমেলো করে দিল বুড়ি। একটা হাত তুলে কোনওরকমে মান্নান। মাওলানার একটা হাত ধরল সে, তারপর হড়বড় হড়বড় করে কী যেন বলল তার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলেন না মান্নান মাওলানা। ফিরোজার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী কয় রে? কিছুই তো বুজি না।
মান্নান মাওলানার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল ফিরোজা। বুকে আঁচল টেনে জড়সড় হল। যা কয় হেইডা হোননের কাম নাই।
ক্যা? হোনলে কী অইবো?
আপনে হোনতে চাইলে আমি কইতে পারি।
ক।
বুজি কইলো গাছির মাইয়ার কথা।
নূরজাহানের কথা বলেছে মন্তাজের বুড়ি মা শুনেই শক্ত হয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। কাঁচাপাকা ঘন চাপদাড়ির আড়ালে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তাঁর, চোখ ধকধক করতে লাগল। তবে এসবই কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপরই নিজেকে সামলালেন তিনি। গম্ভীর গলায় বললেন, গাছির মাইয়ার কথা কী কইলো?
ওই যে আপনেরে ছ্যাপ ছিডাইছে হেই কথা।
এই কথা হেয় হোনলো কই? তুই কইছচ?
না।
তয়?
ফিরোজা কথা বলল না, চুপ করে রইল।
বুড়ি তখন আবার হড়বড় হড়বড় করে কী কী বলছে। মুখ ঘুরিয়ে কোনওরকমে মান্নান। মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়েছে, মান্নান মাওলানা আর ফিরেও তাকাচ্ছেন না বুড়ির দিকে। ফিরোজার দিকে তাকিয়ে বললেন, কথা কচ না ক্যা? ক কে কইছে?
ফিরোজা মাথা নিচু করে বলল, আতাহার দাদায়।
