এসব কথা শুনতে ভাল লাগছিল না হাসুর। বলল, হুনতে চাইলাম এক কথা তুমি আর করলা অন্য প্যাচাইল। এত আগিলা দিনের কথা আমি হুইন্না কী করুম! আমারে খালি বাবার কানা অওনের কথা কও। আমি হুনছি কানিবগের কথা তুমি লাগাইছো ডাউকের প্যাচাইল!
মুখে পানের ছোবা এখনও আছে রহিমার। এক গাল থেকে সেই স্বাদের জিনিস আরেক গালে নিয়ে হাসল সে। হোন। ডাউকের কথা না কইলে বগের কথা বুজবি না। একবার পাড়ইন পাইত্তা একখান কানিবগ ধরলো বাবায়।
একথা শুনে ভুরু কোঁচকাল হাসু। পাড়ইনে বগ ধরবো কেমতে? বগে তো ধান খায় না! কীয়ের লোভে পাড়ইনে হানবো?
হোনঐ। কামডা করছিলো বাবায়ঐ। পাড়ইনে ধানের ছড়া না দিয়া দুই তিনডা থোকল টাকি (এক ধরনের ছোট ছোট লালচে ধরনের টাকিমাছ) ঝুলাইয়া দিয়াইছিলো একদিন। ওই য়োকল টাকির লোবে একখান কানিবগ গিয়া হানছে পাড়ইনে। পরদিন বাবায় হেইডারে ধইরা বাইত্তে লইয়াইছে।
হাসু স্বস্তির শ্বাস ফেলল। হ, এইবার বুজলাম। তার বাদে?
মুখের পানে দুই-তিনটা চাবান দিয়া রহিমা বলল, কানিবগ দেইক্কা বাড়ির পোলাপানে তো ফালাইতে (লাফাতে) লাগলো। এতদিন খালি ডাউক দেকছে আর আইজ দেকতাছে। কানিবগ! বাবায় করলো কী, কানিবগটারেও ডাউকের লাহান পলোর মইদ্যে আটকাইয়া থুইলো৷ থুইয়া হাত-পাও ধুইতে গেছে ঘাডে। অহন সকাইল্লা নাস্তা করবো। এক টুপইর (টোপর) মুড়ি, একদলা খাজুইরা মিডাই লইয়া ঘচর মচর কইরা খাইবো ছনছায় বইয়া। আমরা বেবাকতে দূর থিকা পলোয় আটকাইন্না কানিবগ দেকতাছি। দইল্যাদায় আছিলো কই জানি, কানিবগের কথা হুইন্না হাদাইতে হাদাইতে (হাঁপাতে হাঁপাতে) আইলো। আইয়াঐ করলো কী পলোর উপরের মিহি যেই চুঙ্গাডা (চোঙা) আছে হেইডার মইদ্যে চউকু লাগাইয়া ভিতরের মিহি চাইছে। এইয়া দেইক্কা বগটা কেমুন জানি লইড়া চইড়া উটলো। তারবাদে ঠোঁডদুইহান উপরের মিহি উড়াইয়া দইল্যাদার ডাইন দিককার চোক্কে একখান ঠোকর দিল, দিয়া পানির তল থিকা ঠোকর দিয়া বগে যেমতে ছোড মাছ ধইরা ঠোডে উডায় ঠিক অমুন কইরা চডারে দুই ঠোডে ইট্টু ধইরা রাখল তারবাদে কোঁত কইরা মাছের লাহান গিলা হালাইলো।
হায় হায় কও কী?
হ। আসলে অইছে কী, পলোর উপরে দইল্যাদার চকু দেইক্কা, চক্কর লড়ন চড়ন দেইক্কা বকটায় মনে করছে পানির তলে কোনও চেলামাছ লড়তাছে। ঠোকর এর লেইগাঐ দিছিলো।
তারবাদে?
তারবাদে আর কী! দইল্যাদায় কানা অইয়া গেল। দিনে দিনে নাম অইলো কানা দইল্যা।
হাসু স্তব্ধ। চৌকিতে কাত হওয়া রহিমা নড়েচড়ে উঠল। মুখের পানে ঘচর মচর করে আবার কয়েকটা চাবান দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহা রে, কত সুখের দিন আছিলো হেইডি। কত মানুষজন বাইত্তে, কত পোলাপান! দইল্যাদার চক্কু বগে খাইয়া হালাইছে দেইক্কা কী চিকরা চিকরি। কেরাই নাও ভাড়া কইরা দইল্যাদারে বাপ চাচারা ফুবারা লইয়া গেল ছিন্নগর। বাজারের নন্দী ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারে দেইক্কা কইলো চকু তো আর হাতের চাড়ি না যে কেঐ টাইন্না উড়াইয়া হালাইলে আবার হইব! যেই চকু গেছে হেইডা গেছে। তয় পোলার তেমুন ক্ষতি অইবো না, হারাজীবন খালি কানা হইয়া থাকবো। ব্যথা বেদনা যাতে না অয়। হেরলেইগা অষইদ দিতাছি।
তখন চৈত্রের বিকাল প্রসারিত হচ্ছিল। বাড়ির উঠান পালানে ছায়া হচ্ছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। তেঁতুলগাছে একটানা ডাকতে থাকা কাকটা কখন উড়ে গেছে। বাংলাঘরের ছেমায়। তখনও সাচ্চারা খেলছে শিরিন আর নসু। ঘুম ভেঙে নূরিও এসে দাঁড়িয়েছে ভাইবোনের পাশে। হাতে টিনের চলটা ওঠা বাটিতে একমুঠ মুড়ি দিয়েছে মোতাহারের বিধবা বউ পারুল। শালিক পাখির মতো খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে নূরি আর ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে ভাইবোনের খেলা দেখছে।
ঘরের আবজানো দরজার ফাঁক দিয়ে নূরির দিকে একবার তাকাল হাসু। বলল, অহন তাইলে আরেকখান কথা জিগাই?
বাইরের বিকাল ঘরের ভিতর তৈরি করেছে পাতলা ছায়া। হঠাৎ করেই যেন এই অবস্থাটা দেখতে পেল রহিমা। দেখে ধড়ফড় করে উঠে বসল। চৌকি থেকে নামতে নামতে বলল, অহন আর কোনও কথা জিগাইচ না লো মা। কইতে পারুম না। বিয়াল অইয়া গেছে। বহুত কাম অহন। ল বাইর অই, কাম কাইজ সারি। কথা জিগাইতে অইলে রাইত্রে জিগাইচ। হুইয়া হুইয়া কমুনে।
ফুফুকে চৌকি থেকে নামতে দেখে হাসুও উঠে দাঁড়িয়েছে। হাতের কাকুই জায়গা মতো রেখে ঘর থেকে বেরুতে যাবে, রহিমা বলল, তয় তর লগেও আমার কথা আছে। আমারে তুই সব কথা খোলসা কইরা একদিন কবি। কীর লেইগা তুই ওই বাইত্তে থাকতে চাচ না, কোন ব্যাডারা তরে জ্বালায়, বেবাক আমারে কবি। তার বাদে আমি হুজুরের লগে কথা কইয়া দেহুম এই বাইত্তে তরে রাখন যায় কি না!
একটুক্ষণ থম ধরে থেকে কী ভাবল হাসু, তারপর গম্ভীর গলায় বলল, আইচ্ছা, একদিন তোমারে আমি বেবাক কথা কমু।
.
আছরের নামাজ পড়ে মন্তাজের সীমানায় এলেন মান্নান মাওলানা। পরনের সাদা পাঞ্জাবি, পেটের কাছটা যথারীতি টাইট হয়ে আছে। নীল রঙের লুঙ্গি গোড়ালির উপর পর্যন্ত পড়েছে। লুঙ্গি তিনি এভাবেই পরেন যাতে গোড়ালি ছাড়িয়ে নীচে নামতে না পারে। পাঞ্জাবির তলায় পেটের কাছটায় গিঁটটু দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রেখেছেন লুঙ্গি। প্রতিদিনই একটু একটু করে বাড়ছে ভূঁড়ি, গিটটু দিয়ে না বাঁধলে হাঁটাচলার সময় ভুড়ির কাঁপনে আলগা করে প্যাঁচ দিয়ে রাখা লুঙ্গির খুলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
