হাসুর কথা শুনে মুখের পান গালের একপাশে আনল রহিমা। জড়ানো গলায় বলল, কী কথা জিগাবি?
ধানের গোলার পাশে কাজির পাগলা বাজারের চাউলকল থেকে ভাঙিয়ে আনা তিনবস্তা চাউল একটার উপর আরেকটা করে রাখা। সেই বস্তাগুলিতে ঢেলান দিয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসেছে হাসু। চোয়া হয়ে আসা মাথায় বাচ্চা ঘোড়ার লেজের মতো যা কিছু চুল সেইগুলিতে কোন ফাঁকে চলেছে একখাবলা তেল। ফলে মাথায় লেপটে বসা চুল আরও পাতলা দেখাচ্ছে। মেয়েমানুষ হওয়ার পরও যে তার মাথায় দ্রুত পড়ছে টাক তা এই এতটা দূর থেকেও পরিষ্কার দেখতে পেল রহিমা। এই চুলে আধাবিঘত পরিমাণ কালো ভাঙাচোরা একখান কাকুই মনোযোগ দিয়ে চালাচ্ছে হাসু। ঘচঘচ করে খানিকক্ষণ মাথা আঁচড়েই চোখের সামনে কাকুই তুলে দেখছে কাকুইয়ের দাঁতের ফাঁকে উকুন আটকা পড়েছে কি না। পিছার চিকন দাঁড়ার ছোট্ট এক টুকরা রেখেছে হাতের কাছে। কাঁকুইয়ের ফাঁকে উকুন পেলে ওই দাঁড়া দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করছে। বুড়ো আঙুলের এক নখে উকুন রেখে অন্য নখে পুটুস করে চাপ দিয়ে মারছে। পুরা মনোযোগ উকুনের দিকে। রহিমাকে যে একটা কথা বলেছে, রহিমা যে সে কথার পিঠে আরেকখান কথা বলেছে সেদিকে যেন তার মনই নাই।
খানিক অপেক্ষা করে রহিমা বলল, কী রে, কচ না কী কথা?
হ কই কই।
বলেই কাকুইয়ের দাঁত থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একটা লিক বের করল হাসু। কাকুই মাটিতে রেখে লিকটা মেরেই রহিমার দিকে তাকাল। অনেকদিন ধইরা মনে করতাছি কথাডা তোমারে জিগামু। এত আহি যাই এই বাইত্তে, কোনহানদা যে দিন জায়গা, কথাডা আর মনেও থাকে না। ফিরত যাওনের পর আবার মনে অয়।
রহিমা আবার বলল, কী কথা?
ছোডকালে আমি আবছা আবছা হুনছি কানিবগে ঠোকর দিয়া বলে আমার বাপের একখান চকু কানা কইরা দিছে। হের লেইগাঐ বলে আমার বাপ দলিলরে মাইনষে কয় কানা দলিল। আসলে ঘটনাডা কী ফুবু? সত্যঐ বগে ঠোকর দিয়া কানা করছে আমার বাপ রে?
হ সত্যঐ।
কেমতে অইছিল এই কাম? কানিবগে পাইলো কই তারে? কেমতে ঠোকর দিলো?
আর কইচ না। এইডা একখান অবিশ্বাসের ঘটনা। আমরা তহন খুব ছোড। আমি হমু এই বাড়ির নূরির লাহান আর দইল্যাদায় (দলিল দাদায়) নসুর লাহান। আমগো গেরামের নাম তো জানচঐ, ষোলঘর (ষোলোঘর)।
বলেই যেন একটু লজ্জা পেল রহিমা। হায় হায় কেমুন কথা কই আমি! খালি আমগো গেরাম কইলাম ক্যা! তর গেরামও তো! তুইও তো ওই গেরামেরঐ মাইয়া, আমগো বাড়ির মাইয়া।
হাসু উদাস গলায় বলল, না আমি ওই গেরামের মাইয়া না। আমি তোমগো বাড়ির মাইয়া না। আমার কোনও গেরাম নাই, কোনও ঘরবাড়ি নাই, মা-বাপ কিছু নাই।
রহিমা টের পেল হাসুর গলায় গভীর অভিমান। অভিমানের কারণটা সে জানে। দ্বিতীয় বিয়ের পর কানা দলিল তার আগের ঘরের একটা মাত্র সন্তানের দিকে ফিরেও তাকায়নি। সত্মায়ের নানারকম অত্যাচার থেকে মেয়েটাকে রক্ষা করেছিল ফুফু রহিমা। মৌছামান্দ্রার এক বাড়িতে এনে তাকে ঝিয়ের কাজে লাগিয়েছে। আজ কত কত বছর কানা দলিল একবারও খবর নিতে আসেনি মেয়ের। মেয়েকে নিয়ে যায়নি বাড়িতে। একওক্ত ভালমন্দ খাওয়ায়নি। যে বাপ মেয়েকে ভুলে গেছে এইভাবে সেই বাপকে মনে রাখবে কোন মেয়ে!
তবু ভাইঝিকে সান্ত্বনা দিল রহিমা। এমুন কথা কইচ না মা। বাপ যত দূরেই থাউক, বাপ তো! জন্মদাতা। তারে তুই অস্বীকার করতে পারবি না!
হাসু মুখ ঝামটে বলল, হইছে, বুজছি। ভাইয়ের পক্ষ লইয়া কথা কওনের কাম নাই। যা কইতা ছিলা হেইডা কও।
হ কই। ষোলঘরের পশ্চিমে একখান খাল আছে, খালের পাড়ে একখান চিতাখোলা। হেই চিতাখোলার পশ্চিমে অইলো আড়ইল বিল। বচ্ছরভর ধানে মাছে ভরা থাকে বিল। আমার বাপে আছিল গরিব গিরস্ত। বিলে দেড়-দুইকানি জমিন আছিল আমগো। হেই জমিনের ধানেঐ দিন যাইতো। কাতি আগন মাসে ধানকাডা লাগতো। ধান কাটতে গিয়া বিলের পানিতে ম্যালা মাছও পাইতো গিরস্তে। মতো বড় বড় কই, পুরানা কই, বুকখান লাল টকটইক্কা। আড়ইল বিলের শীতকাইল্যা কই হোনলেঐ গিরস্তের মোক দিয়া লোল পড়তো। বাবার আছিলো অন্য একখান শক। পাড়ইন (ডাহুক ধরার এক ধরনের খাঁচা) পাইত্তা ডাউক ধরতো। ধান কাডা অইয়া যাওনের পর চোয়া খেতের কোনায়, এই ধর কাতি আগন মাসে পাড়ইন পাইত্তা রাইক্কাইতো। পাড়ইনের ভিতরে ঝুলাইয়া দিতো একছড়া পাকাধান। হেই ধানের লোভে ডাউক গিয়া হানতে পাড়ইনে। হানের লগে লগেঐ পাড়ইনের দুয়ার বন্ধ। বিল বাঐরে ডাউকের তো আকাল নাই। দুই-চাইর দিন পর পরঐ এউক্কা-দুগ্ন (একটা-দুটো) কইরা ডাউক ধইরা লইয়াইতো বাবায়। উড়ানে পলোতে আটকাইয়া থুইতো। জবো কইরা কইরা হেই ডাউকের গোস্ত খাইতাম আমরা। ছোডকালে হারা বচ্ছর ডাউকের গোস্ত খাইতাম আমরা। কুঁকড়া কোনওদিন খাওন লাগতো না। আর বাবার আছিলো ভাল ভালাই খাওনের লোব। ধান কাডা অইয়া গেলে, হেই ধান পাড়াইয়া পোড়াইয়া গোলায় উড়ানের পর মাস দেড়মাস বাবায় কোনও কাম কাইজ করতো না। খালি খাইতো আর হুইয়া থাকতো। কামের মইদ্যে কাম করতে দুইখান। দুইফইরা ভাত খাইয়া পাড়ইন লইয়া যাইতো বিলে, পাইত্তা থুইয়াইতো। বিয়াইন্না রাইত্রে, আন্ধার থাকতে থাকতে গিয়া পাড়ইন লইয়াইতো বাইত্তে। পাড়ইনে রোজঐ দেকতাম একখান দুইখান ডাউক। পলোতে হেই ডাউক আটকাইয়া থুইতো আর আমি দইল্যাদায়, বাড়ির অন্য শরিকের পোলাপান বেবাকতে মিলা ডাউক দেকতাম। মা’র তহন হারাদিন কাম। ইট্টুও আজাইর নাই। হারাদিন চাচি ফুবুগো লগে ঢেঁকি পাড়াইতাছে। আলা চাউলের বউয়া চিতইপিডা আর মউলকা বাবায় খুব সাদ কইরা খাইতো। ডাউকের গোস্ত দিয়া চিতইপিডা নাইলে চাউলের রুডি, ছিটরুডি কাতি আগন মাসে দুই একদিন পর পরঐ খাইতো বাবায়। হারাদিন চেঁকি বাইন্নাও বাবার লেইগা এই হগল রান্দন রানতে অইতো মা’র।
